বাবাজী আশীর্বাদ করলেন।
বললেন–তোর ভালো হবে মা, আমি সব জানি। তোর কিছু ভয় নেই। এবার তো আমি এসে পড়েছি।
প্রীতি বললে–আমার ওই ছেলেকে নিয়েই যত ভাবনা বাবা। ও সংসারী হবে তো?
বাবাজী বললেন–আমি তো আছি রে, আমাকে তুই বকলমা দিয়ে দে, তোর ভাবনাটা আমি ভাববো।
এ রকম করে আগে কখনও ভরসা দেয়নি কেউ। প্রীতি গলে গেল। তার মনে হলো এত কিছু ঝঞ্ঝাট-ঝামেলা সব বুঝি তার দূর হয়ে গেল। বললে–আমার ওই ছেলেই সব চেয়ে বড় ঝামেলা বাবা। লোকের মেয়ে নিয়ে ঝঞ্ঝাট হয়, আমার ঝঞ্ঝাট হয়েছে ছেলে নিয়ে।
একবার কথা বলতে আরম্ভ করলে মেয়েদের পেটে আর কোনও কথা বাকি থাকে না। সমস্ত কথা বলে যেন প্রীতি তৃপ্তি পেলে।
হঠাৎ প্রকাশ ঘরে ঢুকলো। বাবাজী তার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন–এ কে?
প্রীতি বললে–-সম্পর্কে আমার ভাই হয় বাবা—
বাবাজী এবার আরো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে চাইলেন তার দিকে।
চৌধুরী মশাই বললেন–প্রকাশ, তুমি এঁকে প্রণাম করো–
প্রকাশ মামা শুধু প্রণামই করলে না। একেবারে বাবাজীর পায়ের ধুলো নিয়ে জিভে ঠেকালে। তারপর হাত জোড় করে সামনে বসলো। ততক্ষণে বাবাজীর সেবা হয়ে গেছে। সমস্ত বাড়িতে তখন আর কোনও কাজ নেই, কোনও সমস্যাও নেই। সমস্ত শক্তি সমস্ত সামর্থ্য যেন বাবাজীর সেবায় ন্যস্ত করেই এ বংশের কর্তা গিন্নী পরিত্রাণ পেতে চাইছে। বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে সবাই যেন এই বাবাজীকে আশ্রয় করেই বেঁচে থাকতে চাইছে। বলছে–আমাদের সব দুঃখ দূর করো বাবা, আমাদের শান্তি দাও, সুখ দাও, ঐশ্বর্য দাও, সমৃদ্ধি দাও। আমাদের একমাত্র সন্তানকে সুমতি দাও সে যেন সংসারী হয়, সহজ হয়, স্বাভাবিক হয়, সাধারণ হয়। আর কিছু আমরা চাই না–
কিন্তু সুখ শান্তি সৌভাগ্য দেবার বিধাতা বোধ হয় মনে মনে হাসলেন। হাসলেন কিংবা হয়ত কটাক্ষ করলেন। সদানন্দ সবই শুনলো। সব কথাই কানে গেল তার। সে বুঝতে পারলে তার জন্যেই এত আয়োজন, এত সেবা, এত পরিশ্রম।
তা পরিশ্রমও কি কম! সেদিন থেকেই বাড়ির অন্য চেহারা। প্রকাশ মামা আবার একটা কাজ পেয়ে গেল। কর্তাবাবু ওপরের ঘরে একলা পড়ে থাকেন। কৈলাস গোমস্তা খাতা নিয়ে হিসেব লেখে, আদায়পত্রের খবরাখবর দেয়। তার ওপর দীনু আছে।
কাজ করতে করতে হঠাৎ কর্তাবাবু জিজ্ঞেস করেন–নিচে শাঁখ বাজাচ্ছে কে কৈলাস?
কৈলাস সব জেনেও বলে–আজ্ঞে ও শাঁখ তো আমাদের বাড়িতে বাজছে না, পালেদের বাড়িতে বাজছে
–এমন অসময়ে শাঁখ বাজাচ্ছে কেন?
কৈলাস গোমস্তা বলে–কোনও পুজোটুজো হচ্ছে বোধ হয়। বেহারি পাল তো খুব ভক্তমানুষ।
তা হবে। এর পরে আর কোনও প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু পরের দিনও তেমনি।
কর্তাবাবু বলেন–বেহারি পালের পয়সা হয়েছে, বুঝলে, কৈলাস! বেনে-মশলার দোকান করে দুটো পয়সা হয়েছে বলে দেব-দ্বিজে ভক্তি বেড়ে গেছে। ও সব ভড়ং আমরা বুঝি।
কৈলাস বলে–আজ্ঞে ভক্তি-টক্তি সব বাজে কথা, আসল হচ্ছে টাকা
কর্তবাবু বলেন–বেহারি পাল টাকা ছাড়া আর কিছুকেই পুজো করে না, বুঝলে কৈলাস! টাকাই ওর কাছে ঠাকুর দেবতা যা-কিছু সব–
ক’দিন ধরে খুবই কাঁসরঘণ্টার আওয়াজ আসতে লাগল কর্তাবাবুর কানে। আসুক। কর্তাবাবুর তাতে আর কোনও ক্ষোভ নেই। হোক, সকলেরই টাকা হোক। আমার আর কোনও ভয় নেই। আমার মত এত সম্পত্তি, এত ঐশ্বর্য, এতখানি কারো না হলেই হলো। তা হলেই অমি নিশ্চিন্ত।
–আচ্ছা কৈলাস, তুমি তো অনেক বাড়ির বউ দেখেছ, এমন রূপে গুণে আলো করা বউ আর কারো দেখেছ? বলো তুমি, দেখেছ কখনও?
কৈলাস বললে–আজ্ঞে, আপনার বউমার সঙ্গে কার তুলনা! এ লক্ষতে একটা হয়।
–আর আমার নাতি? সদানন্দ? অমন নাতি কারো আছে? গাঁয়ে তো কত ছেলেই রয়েছে, এমন ছেলে কজনের আছে শুনি? ও বেহারি পাল যতই পূজো করুক আর কাঁসর ঘণ্টা বাজাক আমার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে?
কৈলাস বলে–কী যে বলেন! আপনি হাসালেন কর্তাবাবু। আপনার সঙ্গে বেহারি পালের তুলনা?
কর্তাবাবু বলেন–না না, আমি কথার কথা বলছি। কাঁসর-ঘণ্টার শব্দ কানে আসে কিনা রোজ, তাই কথাটা বললুম–
কৈলাস বলে–আজ্ঞে বেহারি পাল কি মানুষ? বেহারি পাল সুদে টাকা খাটায়। সুদখোর। সুদখোরকে কখনও কেউ ভক্তি-শ্রদ্ধা করে? অথচ আপনাকে? আপনাকে তো সবাই ভক্তি করে শ্রদ্ধা করে।
কর্তাবাবুর জানতে আগ্রহ হয়। জিজ্ঞেস করেন–ভক্তি-শ্রদ্ধা করে নাকি আমাকে?
–তা করে না? আপনার সামনে যেমন শ্রদ্ধা করে তেমনি আবার আপনার আড়ালেও আপনাকে শ্রদ্ধা করে। আর করবে না-ই বা কেন? আপনার মত মানুষ তো হয় না।
–লোকে তা–ও বলে নাকি?
কৈলাস বলে-বলে বইকি।
–কী বলে?
কৈলাস বলে–বলি কর্তাবাবুর মত মানুষ হয় না।
কথাটা শুনে কর্তাবাবুর মনটা খুশী হয়। কর্তাবাবু খুশী হলে তা সবাই বুঝতে পারে। তখন তাঁর গোঁফ-জোড়া একটু কাঁপতে থাকে, চোখ দুটো একটু কুঁচকে যায়। সবাই বুঝতে পারে। কর্তাবাবুর কাছে তখন যদি কিছু আর্জি করা যায় তো চটপট মঞ্জুর হয়ে যাবে। তখনই সবাই যা চাইবার তা চেয়ে নেয়। কেউ জমি-জমা চায় কেউ টাকা হাওলাত চায়। কেউ বা ঝাড় থেকে দু’খানা বাঁশ। আবার কেউ বা নগদ টাকা পয়সা।
নাতির বিয়ের পর থেকেই কর্তাবাবুর মেজাজটার মধ্যে যেন বেশ একটা খুশী-খুশী ভাব ছিল। ফুলশয্যার পরদিন যেদিন তিনি শুনলেন যে তাঁর নাতি বউ-এর সঙ্গে এক ঘরে এক বিছানায় রাত কাটিয়েছে, তখন থেকেই একেবারে অন্য মানুষ হয়ে গেছেন। তাঁর আসল শত্রু ছিল কালীগঞ্জের বউ, তার জীবনের রাহু। সেই রাহুই যখন চিরকালের মত বিদায় নিয়েছে তখন আর কাকে পরোয়া! যখন মানুষের শত্রু থাকে না তখনই উদার হতে পারে। তখনই তার মুখে হাসি ফোটে। তখন সবাই তার উদারতার প্রশংসা করে। কিন্তু উদার যে হবো তার উপাদান কে দেবে? কে আমার অভাব ঘোচাবে, কে আমার শত্রু নিপাত করবে, কে আমার মাথা উঁচু করে দেবে? তুমি আমার অভাব ঘোচাও, তুমি আমার শত্রু নিপাত করো, তুমি আমার মাথা উঁচু করো, আমি তখন সৎ হবো, সাধু হবো, মহৎ হবো, দাতা হবো। আরো কত কী হবো। রেলবাজারের দারোগা টাকা নিয়েছে বটে, তা নিক। ন্যায্য পাওনা নিলে কর্তাবাবুর কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু বংশী ঢালীরা বড্ড বেশি টাকা নিয়ে ফেলেছে। তা নিক। বৃহৎ কাজে অমন অপব্যয় একটু হয়েছে, তার জন্যে মেজাজ খারাপ করলে কি চলে?
