চৌধুরী মশাই বললেন–চলে যাচ্ছ কেন?
সদানন্দ বললে–চলে যাবো না তো কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই ন্যাকামী দেখবো? আমি আর দাঁড়াবো না এখানে। যা করতে পারেন আপনি করুন গে
বলে ঘর থেকে চলে যাচ্ছিল, কিন্তু তখনই প্রকাশ মামা ঘরে ঢুকে পড়েছে। ঢুকে পড়ে সব দেখেশুনে অবাক। সদানন্দের দিকে চেয়ে বললে–কী রে, কী করছিস এখানে!
চৌধুরী মশাই জিজ্ঞেস করলেন–ও-দিকের খবর সব ভালো তো প্রকাশ? বেয়াই মশাইকে কেমন দেখলে?
প্রকাশ মামা বললে–খুবই মুষড়ে পড়েছেন বেয়াই মশাই। আমি সান্ত্বনা দিলুম তাঁকে। বললুম-মৃত্যু কি কারো হাত-ধরা! জীবন-মৃত্যু সবই ভগবানের দেওয়া, সবই মাথা পেতে নেওয়া ছাড়া মানুষের আর কোনও উপায় নেই।
–আর বউমা?
–বউমা খুব কান্নাকাটি করছিলেন। তাঁকেও বুঝিয়ে-সুঝিয়ে এলুম।
–বউমাকে আবার কবে এখানে পাঠাবেন?
প্রকাশ মামা বললে–বলেছি তো তাড়াতাড়ি পাঠাতে। বলেছি যত শিগগির পারেন পাঠিয়ে দেবেন, আমরা বউমার জন্যে পথ চেয়ে বসে থাকবো।
তারপর সদানন্দর হাত ধরে তাকে বাইরে নিয়ে এল। বাইরে নিয়ে এসেই বললে– কী রে, তুই নাকি ফুলশয্যের রাত্তিরে বউমার সঙ্গে শুসনি? তুই নাকি বউমাকে একলা ঘরে ফেলে বাইরে পালিয়ে গিয়েছিলি?
সদানন্দ কোনও কথা বললে না।
–কী রে, কথার জবাব দিচ্ছিস না যে? অমন সুন্দরী বউ এনে দিলুম, আর তুই কিনা তার কাছেই শুলিনে? ব্যাপার কী বল্ তো? দিদির কথা শুনে আমি তো অবাক! দিদি তো আমাকেই বকছে। আমারই দোষ দিচ্ছে দিদি। বলছে–তুই কী রকম বউ এনে দিলি যে আমার ছেলেকে ঘরে আটকে রাখতে পারলে না? কী ব্যাপার বল দিকিনি? তুই তো আমাকে কিছুই বলিস নি। আমি ভেবেছি তুই আয়েস করে নতুন বউ নিয়ে রাত কাটিয়েছিস, আর এদিকে এই কাণ্ড? কী হলোটা কী? তোর বউ তোকে কিছু বলেছে? না তোর বউ পছন্দ হয় নি? ব্যাপারটা কী? আমি অত খুঁজে খুঁজে ডানাকাটা-পরী এনে দিলুম তোকে আর তুই কিনা তাকে অপগেরাহ্যি করছিস এমনি করে?
সদানন্দ তবু সে কথার কোন জবাব দিলে না। ভেতর বাড়ি থেকে কে একজন লোক আসছিল, তাকে দেখেই প্রকাশ মামা কথা বলতে বলতে থেমে গেল। বললে–আয়, ইদিকে আয়, তোর সঙ্গে সিরিয়াস কথা আছে আমার, একটা নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে জিনিসটার ফয়সালা করতে হবে
বলে সদানন্দকে পুকুরপাড়ের দিকে টেনে নিয়ে গেল।
চণ্ডীমণ্ডপের ভেতরে বাবাজী তখন ভৃগু ঋষির মাহাত্ম্য বর্ণনা করছিলেন। ত্রিকালজ্ঞ ঋষি। অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ যাঁর ছিল নখদর্পণে। একদিন তিনিই দিব্যচক্ষে দেখতে পেলেন কলিযুগে তিনি নবাবগঞ্জের হরনারায়ণ চৌধুরীর ঔরসে আবার সংসার-ধর্ম পালন করবার জন্যে জন্মগ্রহণ করবেন।
চৌধুরী মশাই একসময়ে বললেন–আচ্ছা বাবাজী, আমার ছেলের আসল রোগের কথাটা বলি–
–রোগ? কী রোগ?
চৌধুরী মশাই বললেন–আপনি জানেন তো আমার এত জমিদারি এত সম্পত্তি, কিন্তু মাত্র ওই একটি ছেলে। এই ছেলের আমি সবে বিয়ে দিয়েছি। কিন্তু ছেলে ফুলশয্যার রাত্তিরে বউ-এর সঙ্গে শোয়নি। কখন সকলের চোখের আড়ালে ঘর থেকে পালিয়ে গিয়েছে—
বাবাজী চোখ বুজিয়ে কথাগুলো শুনছিলেন। আর মৃদু মৃদু হাসছিলেন। তেমনি হাসতে হাসতেই বললেন–তারপর?
–তারপর আর কী। সকালের দিকে ওর মা ওকে জিজ্ঞেস করলে কেন ও ঘর থেকে পালিয়ে গিয়েছিল, জবাবে ও বললে–বউ-এর সঙ্গে ও শোবে না।
বাবাজী বললেন– কেন? শোবে না কেন?
–ওই কথা বলে কে? আপনিই বলুন, আমার যদি বংশরক্ষে না হয় তাহলে আমার এত সম্পত্তি খাবে কে? কেন তাহলে আমি আমার ছেলের বিয়ে দিলুম? অথচ রূপে গুণে একেবারে জগদ্ধাত্রীর মত রূপ দেখে আমার পুত্রবধূ করেছি।
কথা বলতে বলতে চৌধুরী মশাই-এর যেন হঠাৎ খেয়াল হলো। জিজ্ঞেস করলেন–আজকে রাত্রে আপনার আহারের কী বন্দোবস্ত করবো বাবা?
বাবাজী বললেন–আমি আহার করি না রে, আমি সেবা করি। সন্ন্যাস গ্রহণ করবার পর থেকে আহার করা আমি ছেড়ে দিয়েছি–
চোধুরী মশাই শশব্যস্ত হয়ে বললেন–ঠিক আছে, আপনি বসুন, আমি আপনার সেবার ব্যবস্থাটা আগে করে ফেলি–
ভেতর বাড়িতে গিয়ে চৌধুরী মশাই একেবারে সোজা গৃহিণীর সঙ্গে দেখা করলেন। বাবাজী যে আহার করেন না, শুধু সেবা করেন সেটা বুঝিয়ে বললেন।
প্রীতি বললে–আর কী বললেন উনি?
চৌধুরী মশাই বললেন–বললেন তো অনেক ভালো কথা। এত ভালো ভালো কথা বললেন, যে সে-সব বিশ্বাস করতেও ভয় হয়।
–কী রকম?
বললেন–খোকা নাকি আগের জন্মে ভৃগু ঋষি ছিলেন, এ জন্মে তোমার ছেলে হয়ে এসেছে। ওকে বকাবকি করতে বারণ করলেন।
প্রীতি কথাগুলো শুনে খানিকক্ষণ চৌধুরী মশাই এর মুখের দিকে হতবাক হয়ে চেয়ে রইল। তারপর বললে–সত্যি?
চৌধুরী মশাই বললেন–সত্যি মিথ্যে বুঝি না। উনি যা বললেন তা যদি সত্যি হয় তাহলেই ভালো। ওঁর কথা শুনে মনটা একটু ভালো হলো। কিন্তু তোমার ছেলে যেরকম বেয়াড়া, বললাম যে বাবাজীকে একবার প্রণাম করো, তা কিছুতেই করলে না। বললে কী জানো? বললে, বুজরুক!
–বুজরুক বললে?
–হ্যাঁ, মুখের ওপর ওঁকে বুজরুক বলে উঠলো। তা আমি আর কী করব! ছেলের হয়ে আমিই ক্ষমা চেয়ে নিলুম। এখন ভালো করে ওঁর সেবার ব্যবস্থা করে দাও। ছানা, দুধ, ফল মিষ্টি যা আছে তাই দিয়ে ওঁর সেবা করো–
তা সেই রকম ব্যবস্থাই হলো। বাবাজী সেদিন থেকেই বাড়িতে রয়ে গেলেন। বাবাজী মহাশক্তিধর পুরুষ। নিজের কথা বেশি বলতে চান না। যত না কথা বলেন তার চেয়ে বেশি অনুভব করেন। চৌধুরী মশাই বাবাজীর ব্যবহারে একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। চৌধুরী মশাই-এর গৃহিণীও এল। এসে প্রণাম করলে।
