সদানন্দ বললে–আমার কী ভালো করবেন?
চৌধুরী মশাই বললেন–তুমি তো বড় তর্ক করো দেখছি। আমি যা বলছি তাই করো। প্রণাম করলে তোমার ক্ষতিটা কী?
সদানন্দ বললে–আমার ভালোর দরকার নেই, আমি প্রণাম করবো না। যাকে-তাকে আমি প্রণাম করবো কেন?
চৌধুরী মশাই আর থাকতে পারলেন না। হঠাৎ রাগের ঝোঁকে একেবারে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন–তোমার এত বড় সাহস, তুমি আমার মুখের ওপর কথা বলো? আমি বলছি ওঁকে প্রণাম করো।
সদানন্দ তবু নির্বিকার। বললে–আমি তো বলেছি আমি প্রণাম করবো না, আবার কতবার বলবো?
–প্রণাম করবে না?
–না।
এর পর চৌধুরী মশাই ঝোঁকের মাথায় কী করে ফেলতেন বলা যায় না, কিন্তু সেই সন্ন্যাসী উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে হাত বাড়িয়ে বাধা দিলেন। বললেন–থাম, তুই থাম–
সামান্য কথা, সঙ্গে সঙ্গে চৌধুরী মশাই জল হয়ে গেলেন। যেন মন্ত্রের মত কাজ হলো।
চৌধুরী মশাই সন্ন্যাসীর দিকে চেয়ে বললেন–দেখলেন তো বাবা, আমার ছেলে কী রকম বাপের অবাধ্য! কেমন মুখের ওপর আমার কথার জবাব দিচ্ছে! আমি কোথায় ছেলের ভালোর জন্যে ভাবছি, আর ছেলে কী রকম ব্যবহার করছে আমার সঙ্গে, দেখলেন তো?
সন্ন্যাসী বললেন–তুই শান্ত হ, মাথা গরম করিস নি, সব ঠিক হয়ে যাবে
–ঠিক হবে বাবা? সব ঠিক হবে?
সন্ন্যাসী ভদ্রলোক বললেন–হ্যাঁ রে, সব ঠিক হয়ে যাবে।
চৌধুরী মশাই তখন আবার নিজের জায়গায় বসে পড়েছেন বটে, কিন্তু উত্তেজনায় তখনও হাঁফাচ্ছেন। বললেন–জানেন বাবা, এই ছেলের জন্যেই আমি কী করেছি জানেন? হাজার হাজার টাকা খরচ করেছি ওর পেছনে। যাতে ও মানুষ হয়, যাতে ও দশজনের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে তার জন্যেই তো খরচ করেছি। নইলে আমার আর কী স্বার্থ? আমি আর কদিন? আমি যা কিছু রেখে যাবো একদিন ও-ই তো তার মালিক হবে। কিন্তু এ এমনই নেমকহারাম যে আমার মুখের ওপর কথা বলে! এত বড় ওর আস্পর্ধা!
সন্ন্যাসী ভদ্রলোক কিন্তু এত কথার পরও বিচলিত হলেন না। হাসতে হাসতেই বলতে লাগলেন–সব ঠিক হয়ে যাবে রে, তুই কিছু ভাবিস নি। আমি যখন এসে পড়েছি তখন তোর আর কিছুছু ভাবনা নেই–
চৌধুরী মশাই যেন বিগলিত হয়ে গেলেন। বললেন–সেই জন্যেই আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছি বাবাজী! এখন আপনিই আমার ভরসা–
বাবাজী বললেন–তোর ভাগ্য খুব ভালো যে ঠিক সময়েই আমার দেখা পেয়েছিস—
তারপর সদানন্দর দিকে চেয়ে বললেন–তোর নাম কী রে বেটা?
সদানন্দ ক্ষেপে উঠলো। বললে–আমাকে বেটা বলছো কেন?
বাবাজী সদানন্দর কথা শুনে কোথায় রেগে উঠবেন তা নয়, হো-হো করে একেবারে ঘর ফাটিয়ে হেসে উঠলেন। বললেন–এখনও রক্ত গরম আছে তো, তাই গরম গরম কথা বেরোচ্ছে মুখ দিয়ে। এখনও ষড়ৈশ্বর্যের জাঁক যায় নি।
তারপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে সদানন্দের কপালের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে দেখলেন।
বললেন–আরে, তোর কপালে যে ভৃগুপদচিহ্ন রয়েছে রে! কী আশ্চর্য, আগে তো দেখি নি–
চৌধুরী মশাই বললেন–ভৃগুপদচিহ্ন? তার মানে? তার মানে কী বাবাজী?
বাবাজী বললেন–তোর ছেলে আসলে কে জানিস?
–কে?
–স্বয়ং ভৃগু ঋষি এ-জন্মে তোর ছেলে হয়ে তোর ঘরে জন্মেছে। ভৃগু ঋষির খুব সংসার করবার ইচ্ছে হয়েছিল একবার। গেল জন্মে সংসার করার শখ মেটেনি তো, তাই এ জন্মে তোর ছেলে হয়ে এই নবাবগঞ্জে এসেছে। তোর বংশের খুব সুসার হবে রে। তোর বংশে দেশ-আলো করা বংশধর জন্মাবে। তোর বংশের যশ-খ্যাতি সারা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়বে
সদানন্দ এতক্ষণ সব শুনছিল। এবার বললে–ও সব বুজরুকি ছাড়ো, ওই বলে বাবার কাছ থেকে টাকা হাতাবার জন্যে চেষ্টা করছো…..
-খোকা!
চৌধুরী মশাই আবার গর্জন করে উঠলেন ছেলের দিকে চেয়ে।
বাবাজী চৌধুরী মশাইকে আবার ধমক দিলেন। বললেন–আবার তুই ছেলের ওপর রাগ করছিস! ঠিক আগেকার জন্মের মত রাগী মেজাজ নিয়ে যে ও জন্মেছে। ঋষি মানুষের রাগ, ও আর কতক্ষণ! ও রাগতেও যতক্ষণ, আবার ওরাগ জল হতেও ততক্ষণ। ভৃগু ঋষি যে এই রকমই রাগী মানুষ ছিলেন রে, তা জানিস না?
চৌধুরী মশাই জীবনে কখনও ভৃগু ঋষির নামই শোনেন নি। শুধু ভৃগু ঋষি কেন, কোন ঋষিরই নাম শোনেন নি তিনি। মুনি-ঋষিদের ধারকাছ দিয়েও কখনও যাবার দরকার হয় নি তাঁর। বরাবর জমি-জমা-টাকা কড়ি-সুদ-আড়তদার-উকিল-মুহুরি জজ নিয়েই কেবল মাথা ঘামিয়েছেন। উকিল কিম্বা জজের জীবনী জানতে চাইলে তবু তিনি কিছু বলতে পারতেন। কোন্ জজ রাগী, কোন্ জজ অমায়িক, কোন্ জজ সৎ, কোন্ জজ অসৎ তা তাঁর মুখস্থ। হঠাৎ বাবাজীর মুখে মুনি-ঋষির কথা শুনে নির্বাক হয়ে রইলেন। সত্যি সত্যিই যদি ভৃগু ঋষি তাঁর ছেলে হয়ে এসে থাকে তাহলে তাঁর যে আরো সম্পত্তি হবে সেই সহজ কথাটা সহজেই বুঝতে পারলেন। তাই ছেলের বেয়াদপির জবাবে কিছু বলতে গিয়েও তিনি থেমে গেলেন।
বাবাজী হঠাৎ তখন এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসলেন। সদানন্দর দুটো পা ছুঁয়ে মাথায় ঠেকাতেই সদানন্দ তিন হাত পেছিয়ে এল।
বললে–রাখো রাখো, বুজরুকি রাখো তোমার!
বাবাজী কিন্তু রাগলেন না। বললেন তুমি রাগ করছো কেন বাবা? আমি তো তোমাকে প্রণাম করছি না, আমি ঋষিশ্রেষ্ঠ ভৃগুকে প্রণাম করছি
সদানন্দ অনেকক্ষণ বুজরুকি সহ্য করেছে। কিন্তু এবার আর পারল না।
বললে–ওসব বুজরুকি আমি অনেক দেখেছি, আর দেখতে চাই না, আমি যাই–
