চৌধুরী মশাই দুপুরবেলা ভেতর বাড়িতে খেতে এসেছিল। খেয়ে উঠে নিজের শোবার ঘরে শুয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। খানিক পরে প্রীতিও এল।
চৌধুরী মশাই জিজ্ঞেস করলেন–খোকা কোথায়? সে খেয়েছে?
প্রীতি বললে–হ্যাঁ, খেয়েই বেরিয়ে গেল।
–কোথায় গেল?
প্রীতি বললে–তা আমি কী করে বলব? সে কি কখনও আমাকে বলে যায়?
–কালকে রাত্তিরে তো নিজের ঘরেই শুয়েছিল? বউমা এলেও ওই ঘরেই শোবে তো এবার থেকে?
প্রীতি বললে–আমি তো সে-কথা জিজ্ঞেস করেছিলুম। তা কিছু জবাব দিলে না।
–কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা কেলেঙ্কারি কাণ্ড না বাধিয়ে বসে! ও যা ছেলে, ও সব পারে, কেন শুচ্ছে না তার কারণটা কিছু বলেছে ও তোমাকে?
প্রীতি বললে–ওর কথা আমি কিছুই বুঝতে পারি নে। ওকে বললে ও কোথাকার কে কপিল পায়রাপোড়া, মানিক ঘোষ, কোন্ ফটিক প্রামাণিক, কালীগঞ্জের বউ তাদের কথা তোলে। তা আমি তাই ওসব কথা আর জিজ্ঞেসও করি না, ওসব বুঝিও না।
চৌধুরী মশাই যেন নিজের মনেই বলে উঠলেন–পাগল, একেবারে আস্ত পাগল! কই, দেশে-গাঁয়ে তো এত ছেলে আছে, এত ছেলে বিয়ে করছে, কেউ তো এমন পাগলামি কখনও করে নি!
প্রীতি বললে–তা যাদের নাম করছে ও, তারা কারা? তারা ওর কী করেছে?
চৌধুরী মশাই বললেন–ভগবান জানে! কে যে ওর মাথায় ওই সব কথা ঢোকালে তাই-ই ভেবে পাচ্ছি না। ও নিশ্চয়ই প্রকাশের কাণ্ড!
প্রীতি বললে–প্রকাশ? প্রকাশের নামে কেন দোষ চাপাচ্ছো শুনি? দোষ করলো তোমার ছেলে আর দায়ী হলো প্রকাশ–তুমি সব ব্যাপারে প্রকাশকে দায়ী করো কেন বলো তো?
চৌধুরী মশাই বললেন–তা ছোটবেলা থেকে প্রকাশই তো ওকে নিয়ে ঘুরছে। কোথায় রাণাঘাটে নিয়ে গিয়েছে যাত্রা শুনতে। কোথায় ঢপ কীর্তন হচ্ছে সেখানে নিয়ে গেছে। আমি তো তখন থেকেই তোমাকে বারণ করেছিলুম ওর সঙ্গে মিশতে দিও না তুমি আমার কথা শুনতে না–এখন যা হবার তাই হয়েছে–
প্রীতি বললে–এখন যত দোষ সেই আমার ঘাড়েই পড়লো। তোমার ছেলে, তুমি সব সময় নিজের কাছে রেখে দিলেই তো পারতে৷
চৌধুরী মশাই বললেন–তা আমার কি আর কোনও কাজকর্ম নেই? ছেলে ঘাড়ে করে নিয়ে থাকলে আমার চলবে? নানান ঝঞ্ঝাটের মধ্যে আমাকে থাকতে হয়, আমি কখন খোকাকে দেখি বলো দিকিনি? তুমি বাড়ির মধ্যে থাকো, তুমি দেখবে না তো কে দেখবে?
প্রীতিরও রাগ হয়ে গেল। বললে–তা তোমার একলারই বুঝি কাজ আছে, আর আমি ঝাড়া হাত-পা, না? আমার কোনও কাজ নেই বুঝি? এই যে এতগুলো লোক বাড়িতে পুষেছ তাদের তদারকি কে করে শুনি? তার বুঝি কোনও মেহনৎ নেই?
চৌধুরী মশাই দেখলেন কথাগুলো ঝগড়ার দিকে মোড় নিচ্ছে। আর বিশ্রাম নেওয়া হলো না। আর একটু হলে একেবারে কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে যাবে। তিনি উঠলেন।
বললেন–একবার চণ্ডীমণ্ডপের দিকে যাই। প্রকাশ বোধ হয় এবার আসবে, তাদের আসবার টাইম হলো!
বলে বাইরের দিকে চলে যাচ্ছিলেন। তারপর হঠাৎ কী যেন মনে পড়ে গেল। আবার ফিরে এলেন।
বললেন–একটা কথা, একজন বলছিল নানা রকম দৈব ওষুধ নাকি দেয় একজন সাধু–
–দৈব ওষুধ?
–হ্যাঁ, সবাই নাকি ফল পেয়েছে। হাঙ্গামা কিছু নেই, শুধু হাতে পরলেই কাজ হয়।
প্রীতি বললে–মাদুলি?
চৌধুরী মশাই বললেন–মাদুলিও দেয়, খাবার ওষুধও দেয়। ব্যাপারটা আমি ঠিক পুরোপুরি জানি না। আমি তাকে ডেকে পাঠিয়েছি
প্রীতি বললে–তোমার ছেলে যা, ও কি মাদুলি-টাদুলি পরবে?
–ছেলে না পরে বউমা পরবে! বশীকরণ-টশীকরণ কত রকম জিনিস তো থাকে ওদের। কাল রাত্তিরে শুয়ে শুয়ে আমি তাই ভাবছিলুম।
প্রীতি বললে–-ছেলে পরবে না। বউমা পরলে যদি কাজ হয় তো না হয় চেষ্টা করে দেখতে পারি। কিন্তু খাবার ওষুধ আমি খাওয়াতে পারবো না, শেষকালে কী হতে কী হয়ে যাবে তার ঠিক নেই। তখন উল্টে উৎপত্তি হয়ে যাবে হয়ত–
–দেখি, সে লোকটার এখনি আসবার কথা আছে—
বলে চৌধুরী মশাই চণ্ডীমণ্ডপের দিকে এগোতে লাগলেন।
.
বিকেল বেলার দিকেই হই-হই করে প্রকাশ মামা আর গৌরী পিসী এসে হাজির হলো। তারা কেষ্টনগরে বউমাকে পৌঁছিয়ে দিয়ে এক রাত সেখানে কাটিয়ে ভোরের ট্রেনে আবার এসেছে। এসব কাজে প্রকাশ মামার জুড়ি নেই। শুধু তাকে মাতব্বরী করতে দিতে হবে। অর্থাৎ মোড়লী। মোড়লী করতে পেলে আর কিছু চায় না প্রকাশ মামা।
গৌরী এসেই সোজা ভেতরবাড়িতে ঢুকেছে। কিন্তু সদানন্দ যখন বাড়ি ঢুকলো তখন সন্ধ্যে পেরিয়ে গিয়েছে। সকালে খেয়ে দেয়ে সেই যে বেরিয়েছিল তখন থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত বাড়িতে কী ঘটেছে তা তার জানা ছিল না। চণ্ডীমণ্ডপের কাছে আসতেই চৌধুরী মশাই ভেতর থেকে দেখতে পেয়েছেন।
ডাকলেন–শোন–
সদানন্দ ভেতরে ঢুকতেই দেখলে চৌধুরী মশাই-এর সামনে কে একজন বসে তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। লোকটার মাথায় ঝাঁকড়া-ঝাঁকড়া চুল। তেল-চকচকে মুখের চামড়া। গায়ে একটা নামাবলী। আর দুটো ভুরুর মধ্যে কপালে একটা মস্ত বড় সিঁদুরের টিপ।
চৌধুরী মশাই ছেলের দিকে চেয়ে বললেন–এঁকে প্রণাম করো–
সদানন্দ কী করবে বুঝতে পারলে না। কে এ, কেন এখানে এসেছে! চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সাধু-সন্ন্যাসী মানুষের মত।
–করো, প্রণাম করো। কী, দেখছো কী চেয়ে?
সদানন্দ বললে–কেন, প্রণাম করবো কেন?
চৌধুরী মশাই বললেন–ইনি তোমার ভালো করবেন, এঁকে প্রণাম করলে তোমার ভালো হবে।
