তা সেই বিধু কয়ালই একদিন হঠাৎ মারা গেল।
সে এক কাণ্ড বটে! একদিন হঠাৎ হই-হই পড়ে গেল চৌধুরীবাড়িতে। কী হয়েছে, না বিধু কয়ালকে সাপে কামড়েছে। সবাই ছুটলো বিধু কয়ালের বাড়িতে। বিধু কয়ালের বাড়িতে কখনও আগে যায় নি সদানন্দ। গিয়ে দেখলে মাটির দাওয়ার ওপর বিধু কয়াল চিৎ হয়ে শুয়ে আছে আর একজন বুড়ো ওঝা মন্তর পড়ছে। ঝাড়-ফুঁক করছে। মনে আছে সদানন্দ একদৃষ্টে সেই বিধু কাকার দিকে চেয়ে দেখছিল। সে কী বীভৎস মৃত্যু! কপিল পায়রাপোড়ার মৃত্যু একরকম, সেও বীভৎস। সে–ও এক রকমের অপমৃত্যু। কিন্তু বিধু কয়ালের অপমৃত্যু যেন অন্য রকম। বিধু কাকার অপমৃত্যুর জন্যে সে যে কাকে দায়ী করবে তা সেদিন ঠিক করতে পারে নি। সকলকে জিজ্ঞেস করেছিল সদানন্দ। বাবাকে জিজ্ঞেস করেছে, মাকে জিজ্ঞেস করেছে। গৌরী পিসীকে জিজ্ঞেস করেছে। এমন কি প্রকাশ মামাকেও জিজ্ঞেস করেছে। প্রকাশ মামা ভাগ্নের কথা শুনে অবাক। বলেছে–আরে, সাপে কামড়ালে মানুষ মরবে না? আবার তেমনি বাগে পেলে যে মানুষও আবার সাপকে মেরে ফেলে। যে-যাকে বাগে পায় তাকেই মারে, বুঝলি না?
সদানন্দ তবু বুঝতে পারে নি। বলেছে–তার মানে?
–তার মানে সবাই সবার শত্রু। সবাই সবাইকে বাগে পাবার চেষ্টা করছে। এই যেমন দ্যাখ না, তোর দাদু কপিল পায়রাপোড়াকে বাগে পেয়েছিল তাই সে মরলো, আবার কপিল পায়রাপোড়া যদি তোর দাদুকে বাগে পেত তো তোর দাদুকেও তাহলে মরতে হতো। এই-ই তো নিয়ম রে। এই নিয়মেই তো দুনিয়া চলছে–
কথাটা অনেক দিন ধরে সদানন্দকে খুব ভাবিয়েছিল। সদানন্দ মাঝে মাঝে বিধু কয়ালের কথা ভাবতো। তারপর সেই বিধু কয়ালের জায়গায় একদিন তার ছেলে শশী কয়াল এল। তখন থেকে শশী কয়ালই তাদের বাড়িতে কাজ করতো। শশী কয়ালও ঠিক তার বাবার মত ধান মাপতো, পাট মাপতো, সরষে মাপতো। সদানন্দ তাকে দেখতো আর ভাবতো, দাদু কবে তাকেও হয়ত বাগে পাবে।
একদিন শশীকেও সদানন্দ জিজ্ঞেস করেছিল–আচ্ছা শশী, তুমি কাকে বাগে পাবার চেষ্টা করছো বলো তো?
শশী কয়াল তো অবাক! বললে–তার মানে?
সদানন্দ বললে–তার মানে জানো না?
–না।
সদানন্দ বললে–নিশ্চয় মানে জানো তুমি, আমার কাছে বলছো না শুধু। তুমি নিশ্চয়ই কাউকে খুন করবার চেষ্ট করছে। সবাই সেই চেষ্টাই করে। এই-ই নিয়ম। এই নিয়মেই দুনিয়া চলছে–
শশী তার হাতের কাজ থামিয়ে অবাক হয়ে চেয়ে রইল সদানন্দর দিকে। খোকাবাবু বলছে কী!
কাছ দিয়ে চৌধুরী মশাই যাচ্ছিলেন। জিজ্ঞেস করলেন–কী শশী, কী কথা হচ্ছে তোমাদের?
শশী বললে–আজ্ঞে, দেখুন না খোকাবাবু কী বলছে, আমি নাকি কাকে খুন করার মতলব করছি!
–তার মানে?
চৌধুরী মশাইও অবাক। সদানন্দর দিকে চেয়ে চৌধুরী মশাই বললেন–কে তোমাকে এ-সব কথা বললে? শশী কাকে খুন করবে?
সদানন্দ বললো, আমি জানি—
–জানি মানে? কী জানো তুমি?
সদানন্দ বললে–সবাই সবাইকে খুন করবার মতলব করছে!
চৌধুরী মশাই আরো অবাক। বললেন–এসব বাজে কথা কে তোমাকে শেখালে?
সদানন্দ বললে–প্রকাশ মামা।
–প্রকাশ মামা?
–হ্যাঁ, প্রকাশ মামা বলেছে। কেন, বিধু কাকাকে সাপে কাটে নি? কপিল পায়রাপোড়াকে দাদু খুন করে নি?
এরপর আর কথা বলেন নি চৌধুরী মশাই। তখনই ছেলেকে নিয়ে চণ্ডীমণ্ডপে চলে গিয়েছিলেন, তারপর অনেক জেরা করতে লাগলেন ছেলেকে। কে তাকে এ-সব কথা বলেছে। কে শিখিয়েছে তাকে এ-সব প্রশ্ন। সব কথার উত্তরেই সদানন্দ বললে–প্রকাশ মামা।
প্রকাশ মামাকেও ডাকা হলো, চৌধুরী মশাই তাকেও জেরা করলেন–এই সব কথা তুমি শিখিয়েছ সদানন্দকে?
প্রকাশ মামা বললে–আমি? আমি কেন শেখাতে যাবো জামাইবাবু? আমার দায় পড়েছে। সদা কি ভাবছেন সোজা ছেলে? ও আমাকে সব শেখাতে পারে, তা জানেন?
রাত্রে গৃহিণীকে গিয়ে চৌধুরী মশাই সব কথা বললেন–তোমার ভাই কিন্তু খোকাকে খারাপ করে দিচ্ছে, ওর সঙ্গে খোকাকে বেশি মিশতে দিও না–
গৃহিণী বললে–কী যে তুমি বলো তার ঠিক নেই। ছেলেমানুষ কী বলেছে তাই নিয়েই তুমি মাথা ঘামাচ্ছো? তুমি তোমার নিজের কাজকম্মো নিয়ে থাকো না, ছেলেমানুষদের কথায় অত কান দিতে গেলে চলে?
এরপর আর কোনও কথা হয় নি এ-সম্বন্ধে। সদানন্দ নিঃশব্দে বড় হয়েছে। সে যা দেখবার তা দেখেছে যা শেখবার তা শিখেছে। কী দেখেছে আর কী শিখেছে তা জানবার সুযোগ হয় নি কারো। চৌধুরী মশাই ব্যস্ত ছিলেন তাঁর সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে আর প্রীতি জড়িয়ে পড়েছিল সংসারের বেড়াজালে। প্রীতির তখন রোজ নতুন করে গয়না গড়ানো হতো আর দুদিন পরেই তা কাঞ্চন স্যাকরাকে দিয়ে ভেঙে আবার অন্য প্যাটার্নের গয়না গড়ানো হতো। তখন ছেলে ছোট। মা বাবা ভেবেছে ছেলে যেমন ছেলেমানুষ আছে, তেমনি বরাবর ছেলেমানুষই থাকবে, কিন্তু সেই রবারের বেলুন কেনা থেকে শুরু করে কপিল পায়রাপোড়া, মানিক ঘোষ, আর ফটিক প্রামাণিকের হয়রানির ঘটনাগুলো যে সে এতদিন ধরে মনের ভেতর পুষে রাখবে তা কে কল্পনা করতে পারবে? শশী কয়ালকেই বা কেন সে তার বাবা বিধু কয়ালের কথা জিজ্ঞাসা করবে? আর কালীগঞ্জের বউ?
পরের দিন যথারীতি সকাল হলো।
সদানন্দ সকালবেলাই খেয়ে-দেয়ে কোথায় বেরিয়ে গেল। আগের দিনের লোকজনের আনাগোনাও আর নেই। হট্টগোলও তেমনি বন্ধ হয়ে গেছে। প্রকাশ মামা নেই, গৌরী নেই। দুটো লোকের অনুপস্থিতিতে সমস্ত বাড়িটাই যেন তখনও খাঁ-খাঁ করছে।
