আলোটা নিবিয়ে আবার সে বিছানায় গিয়ে শুলে। আবার সব অন্ধকার। আবার ঘুমোবার চেষ্টা করলে একটু। মনে হলো আর কোনও ভয় নেই। ট্রেন তারা ফেল করে নি। মিছিমিছি সে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। এতক্ষণ তারা তিনজনেই হয়ত কেষ্টনগরে পৌঁছে গিয়েছে। এতক্ষণ হয়ত খুবই কান্নাকাটি করছে তার স্ত্রী। বিয়ের একদিন পরেই মা মারা গেল। এমন তো সাধারণত হয় না।
কিন্তু অত ভাবতে গেলে সদানন্দর চলবে না। সে কারো স্বার্থ কারো ভালোমন্দ দেখবে না। তার স্বার্থ, তার ভালোমন্দের কথা কি কেউ কোনও দিন ভেবেছে! সবাই শুধু তাকে কেন্দ্র করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে চেয়েছে। তার দাদু চেয়েছে এই বংশ, এই বংশের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা অক্ষয় করতে। তার বাবা চেয়েছে সদানন্দ যেন বংশের ধারাকে জীইয়ে রেখে দেয়। কেউ আর কিছু চায় না তার কাছ থেকে। সদানন্দর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কারো কাম্য নয়।
কালীগঞ্জের বউ সেদিন সদানন্দকে সেই কথাই বলেছিল। বলেছিল–তুমি কেন আমার কথা ভাবছো বাবা? তোমার বিয়ে হবে, তোমার সংসার হবে, তোমার ছেলে হবে, তোমার সামনে এখন মস্ত লম্বা ভবিষ্যৎ পড়ে আছে, আমার তো গঙ্গামুখো পা, আমি যেতে পারলেই এখন বাঁচি। আমার কথা আর তুমি ভেবো না বাবা–
বালিশের ওপর মুখটা গুঁজে বার বার কথাগুলো না-ভাববারই চেষ্টা করতে লাগলো সদানন্দ। সত্যিই সে কেন কালীগঞ্জের বউ-এর কথা ভাবে! কেন সে কপিল পায়রাপোড়ার কথা ভাবে! কেন সে মানিক ঘোষ, ফটিক প্রামাণিকের কথা ভাবে! পৃথিবীর আর কেউ তো তার মত এত বাজে কথা ভাবে না!
না, সদানন্দ এবার আর কিছু ভাববে না। এবার কারোর কথা সে ভাববে না। শুধু নিজের কথা ভাববে। নিজের স্বার্থের কথা, নিজের সুখের কথা। কোথাকার কে কপিল পায়রাপোড়া, কোথাকার কে কালীগঞ্জের বউ, তারা তো আর এ পৃথিবীতে নেই। তাদের কথা ভেবেও তো সে তাদের কোনও উপকার করতে পারবে না। তারা মারা গেছে। তাদের দলে কেউ নেই। তাদের পুলিস নেই, দারোগা নেই, আইন নেই, গভর্নমেন্ট নেই, সমাজও তাদের বিরুদ্ধে। কেন তাদের কথা সে ভাববে! কেন তাদের কথা ভেবে সে মন খারাপ করবে! তার চেয়ে সে বরং নিজের কথাই ভাববে। নিজের স্বার্থ, নিজের সুখ, নিজের স্ত্রী, নিজের সম্পত্তির কথা ভাববে। এই পারিবারিক লাখ-লাখ টাকার জমিদারি, এসব কী করে আরো বাড়ানো যায়, কী করে পরের জমি কোন্ কৌশলে দখল করে নিজের সম্পত্তির পরিমাণ দ্বিগুণ করা যায় কেবল সেই কথাই সে ভাববে।
এবার নয়নতারা যদি আসে তা হলে এই ঘরেই সে রাত্রে শোবে। এই ঘরের বিছানাতেই সে তার স্ত্রীর সঙ্গে শোবে।
তারপর আস্তে আস্তে কখন সে ঘুমিয়ে পড়েছে তা সে নিজেও জানতে পারল না।
.
বহুদিন আগের আর একটা দিনের ঘটনা। নবাবগঞ্জে তখন বেশ ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করেছে। গ্রামের লোক শীত পড়লেই ভোরবেলা উঠোনে বেরিয়ে পড়ে। খোলা-মেলা চারিদিক। তখন ক্ষেতেও কাজ থাকে না কারো। তখন ধান কাটা হয়ে গেছে, পাটও উঠে গেছে। ক্ষেতে শুধু তখন সরষে। সরষে ক্ষেত তখন শুকিয়ে কালো হয়ে যাচ্ছে। চৌধুরীবাড়ির বাইরে চণ্ডীমণ্ডপের পশ্চিমে উঠোনময় সরষে ছড়ানো। চারদিকে বাকারির বেড়া দেওয়া থাকে। যাতে গরু-ছাগল এসে খেয়ে না যায়। সেই সরষে কেটে বেছে মরাইতে তুলতে হবে। তারপর খেপে খেপে যাবে রেলবাজারের প্রাণকৃষ্ণ শা’ মশাই-এর আড়তে। সেখান থেকে নগদ টাকা আসবে নরনারায়ন চৌধুরীর সিন্দুকে। সেই টাকা দিয়ে আবার জমি কেনা হবে সেই জমিতে আবার ফসল ফলবে। এই জমি কেনা আর ফসল ফলানো আর ফসল বেচার টাকায় নরনারায়ণ চৌধুরী মশাই পঙ্গু পা দুটো নিয়ে নিজের ঘরে শুয়ে শুয়ে অখণ্ড সাম্রাজ্যের স্বপ্ন দেখবে আর সেই স্বপ্নের নেশাতেই বছরের পর বছর পরমায়ু নিঃশেষ করে দেবে।
ছোটবেলায় সদানন্দ ওই ধান মাড়া, পাট-কাচা, সরষে ভাঙা দেখত। বিধু কয়াল সেগুলো আবার দাঁড়িপাল্লায় ওজন করতো। চৌধুরী মশাই অনেক সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতেন।
সদানন্দ জিজ্ঞেস করতো–হ্যাঁ গো বিধুকাকা, এত সরষে কে খাবে গো?
বিধু কয়াল বলতো–কে আবার খাবে, লোকে খাবে—
সদানন্দ বলতো–তা এত সরষে লোকে খেতে পারবে?
বিধু কয়াল হাসতো। বলতো–পৃথিবীতে লোক কি কম খোকাবাবু লোকের শেষ নেই। পৃথিবীতে রোজ কত লোক জন্মাচ্ছে, তা জানো?
–কত লোক?
–কোটি কোটি লোক জন্মাচ্ছে। আবার কোটি কোটি লোক মরছেও। যত লোক জন্মাচ্ছে সবাই এই চাল, ডাল, সরষে সব খাবে।
সদানন্দ জিজ্ঞেস করতো–কী করে জন্মায় এত লোক?
বিধু কয়াল বলতো-সে-সব তুমি এখন বুঝবে না, বড় হলে তবে বুঝতে পারবে।
সদানন্দ বলতো–তুমি বলো না, আমি তো বড় হয়েছি, আমি ঠিক বুঝতে পারবো–
বিধু কয়াল তবু বলতো না। কিংবা হয়তো ও সব কথা নিয়ে আলোচনা করতে চাইত না ছোট ছেলের সঙ্গে। আর অত কথা বলবার হয়ত সময়ও ছিল না বিধু কয়ালের। তার অনেক কাজ ছিল। যখন দাঁড়িপাল্লার কাজ থাকতো না তখন তাকে অন্য কাজ দেওয়া হতো। কাজ কি চৌধুরী মশাই-এর বাড়িতে একটা! গোয়ালের গরু দেখবার রাখাল ছিল, ক্ষেত খামারে কাজ করবার জন্যে কৃষাণ ছিল, মাল ওজন করবার কয়াল ছিল, কাছারির কাজ করবার গোমস্তা ছিল। তার ওপর ছিল সংসারের কাজকর্ম দেখাশোনার লোক। লোকে লোকে ভর্তি ছিল সেই বাড়ি। ভোরবেলা থেকে চৌধুরীদের বাড়িতে কাজ শুরু হতো, সে কাজ শেষ হতে সন্ধ্যের পর। সন্ধ্যের পরেই যেন একটু ঠাণ্ডা হতো নবাবগঞ্জ।
