ভৈরব বললে–তাহলে আজ রাতটা তোর বালিশ আঁকড়ে কাটবে সদা–তোর বরাতটাই খারাপ–
সদানন্দ বললে–আমি উঠি ভাই–
বলে আর সেখানে দাঁড়ালো না। মনে হলো এবার যেন আর কোনও বাধা নেই তার সামনে। সে যেন এবার স্বাধীন।
সবাই বলে উঠলো–কী রে, ওদিক কোথায় যাচ্ছিস্?
সেই সকাল থেকে আড্ডা দিয়েছে সে বারোয়ারিতলায়। তারপর আড্ডা দিতে দিতে সময়ের জ্ঞান ছিল না তার। একেবারে সোজা পশ্চিম দিকের রাস্তাটা ধরলে। যেতে যেতে বললে–একটা কাজ আছে ভাই পশ্চিমপাড়ায়–
আসলে পশ্চিমপাড়াও নয়, দক্ষিণপাড়াও নয়। মনে হলো সে যেন সমস্ত পৃথিবীটাই পরিক্রমা করে আসতে পারে এখন। তবু তার ক্লান্তি আসবে না, তবু তার শ্রান্তি আসবে না।
কেদার বললে–নতুন বিয়ে করে সদাটার মুণ্ডুটা ঘুরে গেছে। ও-রকম সকলেরই হয়–
বাড়িতে আসতেই মা বললে–শুনেছিস, তোর শাশুড়ী মারা গেছে, কেষ্টনগর থেকে লোক এসেছিল, তাই বউমাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিলুম।
সদানন্দ হাঁ না কিছুই বললে না। যেমন খেতে হয় তেমনি খেয়ে নিলে। মা আঁচল থেকে চাবির গোছা থেকে একটা চাবি খুলে দিয়ে বললে–তোর ঘরে চাবি দিয়ে রেখেছি, বউমার জিনিসপত্তর রয়েছে তো, তাই! এই নে চাবি–
চাবি নিয়ে সদানন্দ ঘরের দরজাটা খুললে। খুলতেই একটা কেমন-কেমন মিষ্টি গন্ধ নাকে ভেসে এল। ঘরের সমস্ত জানালা বন্ধ। পেছনের দিকের দরজাটাতেও আজ তালাচাবি পড়ে গেছে। কোথাও কোনও দিক দিয়ে আর পালাবার পথ নেই। ঘরের কোণের দিকের আলনায় একটা কোঁচানো শাড়ি, তার পাশে একটা ব্লাউজ।
মা হঠাৎ ঘরে এসে ঢুকলো–কী রে, আজকে ঘরে শুবি তো ঠিক? না শুস্ তো বল্। বউমার বাক্স-প্যাটরা সব রয়েছে, সেগুলো তাহলে আমার ঘরে সরিয়ে রাখবো।
সদানন্দ তবু কিছু কথা বললে না। মার মনে হলো হয়তো ছেলের মতিগতি ফিরেছে।
বললে–তাহলে আমি চলি, তুই আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়–
সদানন্দ গায়ের জামাটা খুলে রাখলে। তারপর আলোটা নেবাবার আগে ছাদের কড়িকাঠের দিকে একবার চেয়ে দেখলে। কই, সেই কপিল পায়রাপোড়ার ঝুলন্ত শরীরটা তো আর দেখা যাচ্ছে না। কোথায় গেল সেটা? নিজের গেঞ্জিটার দিকে চেয়ে দেখলে। সেই কালীগঞ্জের বউ-এর রক্তের দাগটাও তো কোথায় মিলিয়ে গিয়েছে। কেন এরকম হলো? এমন তো হবার কথা নয়। তবে কি সব দাগ মুছে গেল এক রাত্রেই! একটা ফুলশয্যার রাত্রের প্রলেপের এত ক্ষমতা! সদানন্দর মনে হলো তখনও যেন সেই গন্ধটা নাকের কাছে ঘুরঘুর করছে। ক’ঘন্টা আগেও একটা মানুষ এ-ঘরে ছিল। তার শরীরের আর তার যৌবনের সান্নিধ্যের স্পর্শ যেন এই ঘরের সর্বাঙ্গে লেগে রয়েছে তখনও। একটা ছাড়া শাড়ির কোঁচানন কুটিলতার মধ্যে যেন তার মনটাকে সে এখানে লুকিয়ে রেখে গেছে। সে লুকিয়ে লুকিয়ে চেয়ে দেখছে। দেখছে শাড়িটা আর ব্লাউজটা সে সকলের দৃষ্টির অগোচরে একবার স্পর্শ করে কি না। তার স্পষ্ট ধারণা সদানন্দ ওগুলো স্পর্শ করবেই, ওগুলোর ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে সদানন্দ বাঁচতে পারবে না। তার পূর্বপুরুষ এক মোহিনী জাল বিছিয়েছে তাকে অভিভূত করবার জন্যে। সে তাতে ধরা পড়বেই, সে তাতে ধরা পড়ে ধ্বংস হবেই–
বোধ হয় সত্যিই সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ তার দরজায় ঠকঠক্ করে টোকা পড়লো। বাইরে মা ডাকছে!
–ও খোকা, খোকা, ওরে, দরজা খোল্–বউমা এসেছে!
সদানন্দ কী করবে বুঝতে পারলে না। কেষ্টনগরে যার যাবার কথা, কেষ্টনগরেই যার দু’তিন দিন থাকবার কথা, সে হঠাৎ আবার ফিরে এল কেন?
-–ওরে খোকা, দরজা খোল। বউমা এসেছে। কেষ্টনগরের ট্রেন ফেল করে আবার এখানে ফিরে এসেছে, দরজা খোল
সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ মামার গলাও শোনা গেল। আশ্চর্য, ঠিক আজকেই কিনা তাদের ট্রেন ফেল করতে হয়!
সদানন্দ দরজাটা খুলে দিলে।
বাইরে অল্প-অল্প আলো। সেই আধো-অন্ধকারের মধ্যে মূর্তিটা চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। সদানন্দ দরজা খুলতেই নয়নতারা আস্তে আস্তে ঘরের ভেতরে এগিয়ে এল।
সদানন্দ বউ-এর মুখের দিকে চেয়ে দেখলে। চোখ দুটো ভিজে উঠেছে।
পেছন থেকে তখন প্রকাশ মামার গলা শোনা গেল–আমরা স্টেশনে গেছি আর ট্রেনটাও ঠিক সেই সময়ে ছেড়ে দিলে–
গৌরী পিসীও ফিরে এসেছে। সেও বলে উঠলো–কপালের দুর্ভোগ বউদি, গায়েগতরে একেবারে ব্যথা হয়ে গেল, অথচ কোনও লাভ হলো না।
মা বললে–বউমার খুব কষ্ট হলো মাঝখান থেকে–
সদানন্দ তখনও পাথরের মত সেইখানে দাঁড়িয়ে ছিল। কী যে সে করবে তা বুঝতে পারলে না। ঘর থেকে বেরিয়ে যাবে, না ঘরেই থাকবে! নাকি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে হয়ত প্রকাশ মামা আবার তাকে দেখতে পাবে।
হঠাৎ কী যে হলো, নয়নতারার দিকে একটু এগিয়ে গেল সদানন্দ। একটা কিছু কথা বলা তার উচিত। কাল সে ঘর থেকে কিছু না বলেই বেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কেন সে বেরিয়ে গিয়েছিল তা নয়নতারাকে বলা হয় নি। আর কাউকে না বললে কিছু আসে যায় না, কিন্তু তার নিজের বিয়ে করা বউকে অন্ততঃ কিছু কৈফিয়ৎ দেওয়া উচিত।
সদানন্দ নয়নতারার কাছে গিয়ে বললে–দেখ—
কিন্তু কিছু বলার আগেই নয়নতারা ফোঁস করে উঠেছে। বলে উঠল–আমাকে ছুঁও না–
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমটা ভেঙে গেছে। সদানন্দ মাথাটা বালিশ থেকে তুলে চারদিকে চেয়ে দেখলে। কই, কেউ তো কোথাও নেই। ঘর অন্ধকার। আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে উঠলো সে। তারপর আলোটা জ্বাললে। দরজায় যেমন খিল দেওয়া ছিল, তেমনিই রয়েছে। কেউ কোথাও নেই! ঘরের ভেতরে সে একলাই শুয়ে ছিল এতক্ষণ। ঘরে কেউই ঢোকে নি। আলনার ওপর কোঁচানো শাড়ি আর পাট-করা ব্লাউজ। তখনও একভাবে একই জায়গায় রয়েছে। কেউ তা স্পর্শ করে নি। আশ্চর্য-আশ্চর্য স্বপ্ন তো! কিন্তু স্বপ্নই যদি দেখতে হয় তো এমন স্বপ্ন দেখল কেন সে? কেন সে এমন স্বপ্ন দেখলে?
