হঠাৎ নিচেয় শাঁখ বেজে উঠলো। দীনু এল। কর্তাবাবু তার মুখের দিকে চাইলেন। বললেন–কী রে, ওরা রওনা হয়ে গেল?
–আজ্ঞে হ্যাঁ কর্তাবাবু।
–সঙ্গে কে গেল?
–আজ্ঞে, শালাবাবু আর গৌরী পিসী!
কথাটা শুনে আরো নিশ্চিন্ত হলেন কর্তাবাবু। তারপর মনে পড়ে গেল কথাটা। বললেন–একটা কাজ করতে পারিস! রেলবাজারের কাঞ্চন স্যাকরাকে একবার খবর দিতে পারিস?
–কাঞ্চন স্যাকরা?
কর্তাবাবু বললেন–হ্যাঁ, বলবি সময়মত যেন একবার আমার সঙ্গে দেখা করে—
.
চৌধুরীবাড়ির সদর রাস্তায় তখন দুটো গরুর গাড়ি সামনে পেছনে চলেছে। সামনেটাতে নতুন বউ নয়নতারা, আর তার পাশে গৌরী। গৌরী পিসী। আর পেছনেরটাতে শালাবাবু। শালাবাবু চিৎকার করে বললে–একটু পা চালিয়ে চলো রজব, একটু পা চালিয়ে চলো, ট্রেনের টাইম হয়ে গেছে–দুর্গা, দুর্গা…
সদর রাস্তা ছেড়ে গাড়ি দুটো বারোয়ারিতলায় পড়লো। বিরাট বিরাট বট আর অশ্বথ গাছের ছায়াঘেরা বারোয়ারিতলা। বারোয়ারিতলায় দোকানগুলোর মাচার ওপর তখন বিকেলের তাসের আড্ডা চলেছে। হঠাৎ গাড়ির ভেতরে সদানন্দর বউকে দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। পেছনের গাড়িতে শালাবাবুকে দেখে একটু সাহস পেয়ে চেঁচিয়ে উঠলো–এ কি শালাবাবু, কোথায়? নতুন বউকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?
শালাবাবুর তখন অত সময় নেই বাজে কথা বলবার। বললে–এখন ট্রেন ধরতে হবে ভাই, কথা বলবার সময় নেই–
বলে সামনের গাড়ির গাড়োয়ানকে আবার তাগাদা দিলে–একটু পা চালিয়ে চলো রজব, ট্রেনের টাইম হয়ে গেছে, পা চালিয়ে চলো–
এদিকে বাড়ির ভেতরে সদানন্দকে দেখে মা অবাক হয়ে গেছে। বললে–এ কী রে, তুই কোথায় ছিলি সারাদিন, বাড়িতে এত ঝঞ্ঝাট চললো, আর তোরই দেখা নেই–
প্রকাশ মামা থাকলে এতক্ষণে হই-হই লাগিয়ে দিত। কিন্তু প্রকাশ মামাও নেই, গৌরী পিসীও নেই। যারা দুজন বাড়ি জমিয়ে রাখে তারা কেউই নেই। বাড়িতে আস্তে আস্তে ঢুকেই লোকজন না দেখে কেমন অবাক হয়ে গিয়েছিল সদানন্দ। কদিন আগেও এখানে ভিড় ছিল। পুকুরের পাড়ের দিকে ভিয়েন বসেছিল। বারোয়ারিতলার তাসের আড্ডার সবাই-ই এখানে এসে নেমন্তন্ন খেয়ে গিয়েছিল। বউ দেখেও খুব তারিফ করেছে তারা। সকাল বেলা বারোয়ারিতলায় যেতেই সবাই ধরেছে কী রে, এত সকালে?
সদানন্দ বললে–বাড়িতে আর ভালো লাগলো না ভাই, বড্ড ভিড়–
গোপাল ষাট বলে–কাল তোদের বাড়িতে খুব খেয়েছি রে, একেবারে পেট ফেটে যাবার দাখিল
কেদার বললে–তা কী রকম বউ হলো বল সদা, পছন্দ হয়েছে তো তোর?
পছন্দর কথা শুনে আশেপাশে যারা শুনছিল সবাই কেদারের কথায় হেসে উঠেছে। অমন যার বউ তার আবার পছন্দর কথা ওঠে নাকি! নতুন বরকে দেখে ক্রমে ক্রমে আরো ভিড় জমে উঠলো মাচার ওপর। এতকাল ধরে এই সদানন্দকে তারা দেখে আসছে, অথচ সকলের কাছে আজ রাতারাতি যেন সে নতুন মানুষ হয়ে উঠেছে। এই মানুষটাই তাদের সঙ্গে এতদিন আড্ডা দিয়েছে, কথা বলেছে, তাস খেলেছে, যাত্রা করেছে, উঠেছে, বসেছে, তবু যেন সে আজ একটা রাত্রের মধ্যেই সম্পূর্ণ এক অচেনা মানুষ হয়ে উঠেছে সকলের কাছে। সকলেরই জানতে ইচ্ছে করছে গোপনে শুনে নেয় তার ফুলশয্যার রাতটা কেমন কাটলো। ওর ফুলশয্যা কি ঠিক আমার মত? সকলেরই নিজের নিজের ফুলশয্যার রাতের কথা মনে পড়তে লাগলো। নিজেদের সঙ্গে সদানন্দর ফুলশয্যার ঘটনাটা একবার মিলিয়েও নিতে চাইলে সবাই। অত সুন্দরী বউ বরের সঙ্গে প্রথমে কী কথা বললে–সেটাও তাদের জানতে হবে। কিন্তু সদানন্দ শুধু হাসতে লাগলো।
ভৈরব বললে–কী রে, হাসছিস যে?
সদানন্দ বললে–তোদের কথা শুনে ভাই–
–কেন, আমরা গরীব বলে কি মানুষ নই, না আমাদের কালো বউ বলে সে আর বউ নয়?
একজন বলে–ওরে না, যা ভাবছিস তা নয়, অন্ধকারে কালো বউও যা ফরসা বউও তাই, সব সমান!
–তুই থাম–বলে ধমকে উঠলো কেদার। বললে–তুই যা জানিস না, তা নিয়ে কথা বলতে আসিস নি। তুই বিয়ে করিস নি, বিয়ের মর্ম তুই কী বুঝবি রে?
কথাটা মর্মে মর্মে সত্যি। সবাই-ই স্বীকার করলে বিয়ে না করলে বিয়ের মর্ম বোঝা যায় না। সবাই বললে–তুই এখেন থেকে যা দিকিনি, যা চলে যা–
এতগুলো বিবাহিত লোকের মধ্যে থেকে অবিবাহিতকে সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করে দেওয়া হলো। এবার সবাই গোল হয়ে বসলো সদানন্দকে ঘিরে। বললে–এবার বল্ ভাই, কী হলো তোর?
সদানন্দ বললে–কিছুই হয় নি
–কিচ্ছু হয় নি মানে? আমাদের বোকা পেয়েছিস তুই?
সদানন্দ বললে–ওসব কথা থাক ভাই, অন্য কথা বল্—
কিন্তু অন্য কথা বলতে তখন কার ভালো লাগে! এর পরে যখন প্রসঙ্গটা পুরোন হয়ে যাবে তখন তো কেউ আর এসব কথা তুলবেও না সদানন্দর কাছে। তখন সদানন্দ এই সব লোকদের মতই সাধারণ হয়ে যাবে।
হঠাৎ গরুর গাড়ি দুটো দেখে কেদার বলে উঠলো–ওরে, তোর বউ বাপের বাড়ি যাচ্ছে রে, ওই দ্যাখ—
গাড়ি দুটো সামনে পেছনে চলেছে রেলবাজারের দিকে। কেদার চিৎকার করে উঠলো–একি শালাবাবু, কোথায়? নতুন বউকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?
শালাবাবু সেদিকে না চেয়েই বলে উঠলো–এখন ট্রেন ধরতে হবে ভাই, কথা বলবার সময় নেই–
গাড়ি দুটো জোর কদমে ছুটে চলতে লাগলো। সকলেই সদানন্দর দিকে চাইলে। জিজ্ঞেস করলে–কী রে, তোর বউ সাত-তাড়াতাড়ি বাপের বাড়ি যাচ্ছে কেন রে? এই তো সবে কাল বউভাত হল, এরই মধ্যে চলে গেল?
