শুধু নিখিলেশ নয়, মাস্টার মশাই-এর কথাগুলো আরো অনেক ছাত্র শুনতো। ছুটির দিন সবাই ভট্টাচার্যি মশাই-এর বাড়ি আসতো। কথা বলতে বলতে যদি অনেক বেলা হয়ে যেত তাঁর নয়নতারা হঠাৎ ঘরে এসে বলতো–বাবা, তুমি আজ চান করবে না, খাবে না?
ভট্টাচর্যি মশাই-এর এতক্ষণে যেন হুঁশ হতো। বলতেন–এই দেখ, আমাদের বেশ কথা হচ্ছিল, বেশ বিদ্যার জগতে বিচরণ করছিলুম, হঠাৎ অবিদ্যা এসে সব ভেস্তে দিল–
নয়নতারা অভিমান করে বলতো–বা রে, আমি বুঝি তোমার অবিদ্যা?
ভট্টাচার্যি মশাই নিজের ভুল বুঝে নয়নতারাকে জড়িয়ে ধরে আদর করতেন–এই দেখ, আমার মেয়ে ওমনি আবার রাগ করে বসলো–
মেয়েকে আদর করতে করতে বলতেন–তুমি অবিদ্যা হতে যাবে কেন মা, তুমি হলে মা আমার সরস্বতী। মা-সরস্বতী তুমি আমার! আমি বলছিলাম কল্পনা আর বাস্তবের কথা। আমরা সবাই বেশ বড় বড় বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলাম, হঠাৎ তুমি আমাদের বাস্তব জগতে ফিরিয়ে নিয়ে এলে
নয়নতারা বলতো–বা রে, আমি কী করবো, মা যে তোমাকে ডাকতে বললে–
ভট্টাচার্যি মশাই বলতেন—না না, তোমার মা ঠিকই করেছে মা, বাস্তবকে বাদ দিয়ে তো কল্পনা হয় না। কল্পনার শেকড় থাকে বাস্তবের মাটিতে। তা না থাকলে সে কল্পনারও কোনও দাম নেই, সে কল্পনা হলো ফানুস, ফানুস ফেটে গেলে সে-ফানুসের তাই আর কোনও দাম থাকে না
নয়নতারা কিন্তু বাবার সে-সব কথায় কান দিত না। সে বাবার ছাত্রদের দিকে চেয়ে বলতো–তোমরা হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখছো কী? তোমরা বাড়ি যাবে না? তোমাদের বাড়ি ঘর দোর নেই?
ছাত্রদের মধ্যে নিখিলেশ ছিল একটু স্পষ্টবক্তা।
নিখিলেশ বলতো–তা আজকে তুমিই আমদের খেতে দাও না–আমরা এখানেই দুটি খাই–
নয়নতারা বলতো–ইস, খাবে! তাহলে রান্না করবে কে? মা’র যে শরীর খারাপ, মা’র বুঝি রাঁধতে কষ্ট হয় না?
নিখিলেশ বলতো–কেন? তুমি রাঁধবে! তুমি আমাদের জন্যে একটু কষ্ট করতে পারো না?
নয়নতারাও কম যেত না। সে বলতো–তোমাদের জন্যে কেন আমি কষ্ট করতে যাবো বলো তো? তোমরা আমার কে?
ভট্টাচার্যি মশাই বলতেন–ছিঃ, ও কথা বলতে নেই, পৃথিবীতে কেউ কারো পর নয়, জানো মা। পৃথিবীর সব মানুষকে আপন করে নিতে হবে। যে তা পারে সে-ই সত্যিকারের মানুষ। হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান, বৌদ্ধ, সবাইকে নিজের লোক মনে করবে মা–
নয়নতারা বলতো–বা রে বা, তুমি তো আমার বাবা, কিন্তু ওরা আমার কে?
ভট্টাচার্যি মশাই একটু ভেবে নিয়ে বলতেন–ওরা? ওরা তোমার ভাই-এর মত। আমি কি শুধু তোমার একলার বাবা? আমি যে সকলের। আমি যেমন তোমার কথা ভাবি, তেমনি ওদের কথাও তো আমাকে ভাবতে হয়। আমি যে ওদেরও মঙ্গল চাই–
বাড়ির ভেতরে মা বলতো–আমার কথা কে ভাবে তার ঠিক নেই, আমি যাচ্ছি পরের কথা ভাবতে! পরের কথা ভাবতে আমার বয়ে গেছে–
নয়নতারাকে নিজের পাশে শুইয়ে মা বলতো–ওঁর কথা ছেড়ে দে তুই, এ-সব বড় বড় কথা শুনতে ভালো, বলতে ভালো, কিন্তু ওতে তো আমার পেট ভরবে না!
যখন বাবা ছাত্রদের নিয়ে লেখাপড়ার চর্চা করতো মা নিজের সংসার সামলাতেই হিমসিম্ খেয়ে যেত। আর সেই সময় সব সময়ের সঙ্গী থাকতো নয়নতারা। নয়নতারা মার কাছে কাছে ঘুরতো সারাদিন।
মা বলতো–ও মা নয়ন, এই চাল ক’টা একটু বেছে দে তো—
মা’র কথায় একটা কুলো নিয়ে নয়নতারা চাল বাছতে বসতো। কিন্তু চাল বাছা শেষ হতে না হতেই মা আর একটা কাজের হুকুম করতো। বলতো–ওরে নয়ন, কোথায় গেলি, বড়িগুলো একটু রোদদুরে দিয়ে দে তো মা–
যতবার নয়নতারা বই নিয়ে পড়তে বসতো ততবার মা’র ফরমাস। একটানা-একটা ফরমাস লেগেই থাকতো মা’র। মার সঙ্গে নয়নতারার লেখাপড়ার যেন আড়ি ছিল। নয়নতারাকে পড়তে বসতে দেখলেই মা যত বাজে কাজ আবিষ্কার করে বসতো।
শেষকালে বিরক্ত হয়ে যেত নয়নতারা বলতো–আমি পারবো না তোমার কাজ করতে, আমাকে দেখলেই বুঝি তোমার কাজ পায়?
মা বলতো–এক হাতে কত কাজ করছি তা তুই দেখতে পাচ্ছিস না? আমি খেটে খেটে মরে যাই তা-ই তোরা সবাই চাস্?
নয়নতারা বলতো তা একটা ঝি রাখলেই পারো, ওই তো কল্যাণীদের বাড়িতে কেমন দিন-রাতের ঝি আছে, সে-ই সব কাজ করে–
মা বলতো–আমি তোর ভালোর জন্যেই বলছি রে। এখন যদি এ-সব কাজ না করিস তাহলে কোথায় কার বাড়িতে যাবি, সেখানে গিয়ে যে শাশুড়ীর কাছে তোকে বকুনি খেয়ে মরতে হবে। তখন শাশুড়ী আবার তোকে খোঁটা দেবে। বলবে–বাপের বাড়িতে মা কিছুই শেখায়নি মেয়েকে, একেবারে ঠুঁটো জগন্নাথ করে রেখে দিয়েছে।
তারপর মা নিজের মনেই বলতো–আমি যা বলি তোর ভালোর জন্যেই বলি রে! আমি মরে গেলে তখন বুঝবি, মা তোর ভালোর জন্যেই এত কথা বলতো–
তা শেষকালে যখন নবাবগঞ্জের সম্বন্ধটা এল তখন একেবারে দৌড়তে দৌড়তে মা তার ঘরে এসেছে। বললে–ওরে, তুই এবার জমিদারের বউ হবি, জানিস–
জমিদারের ছেলের বউ হওয়া যে কী জিনিস তা যদি মা তখন জানতো! কিন্তু শুধু মা কেন, নয়নতারা কি নিজেই সে কথা জানতো! বোধ হয় ভূ-ভারতে কেউই জানতো না। নইলে কোনও মেয়ের ফুলশয্যার দিনে এমন দুর্ঘটনা ঘটে? কারো পা লেগে শ্বেত পাথরের গেলাস এমন করে ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে যায়?
২.৫ সদানন্দ যখন বাড়ি ঢুকলো
সমস্ত দিন কোথায় ঘুরে ঘুরে সদানন্দ যখন বাড়ি ঢুকলো তখন সব শান্ত। এই কাল পর্যন্ত যে বাড়িতে লোকজন গিসগিস করেছে, যে বাড়িতে ঢুকলেই লুচি-ভাজার ঘিয়ের গন্ধ ভুর ভুর করেছে তা আর তখন নেই। একদিন আগেও এখানে উৎসবের জাঁকজমক সব কিছু ভরাট ছিল। প্রকাশ মামা একাই ছিল একশো। তার হাঁক-ডাকে বাড়িতে কাক-পক্ষী পর্যন্ত বসতে পারছিল না।
