গৌরী পিসী বললে–তোমার শাশুড়ীও খুব ভালো বউমা, তোমার শাশুড়ীর মত মানুষও হয় না–
নয়নতারা বললে–মাও আমাকে তাই বলেছে। বলেছে–এখন থেকে শাশুড়ীকেই মায়ের মত ভক্তি করবি–
গৌরী পিসী বললে–ও কটা ভাত দুধ দিয়ে খেয়ে নাও বউমা, আমি একটা সন্দেশ আনছি।
গৌরী পিসী বাইরে চলে গেল। কেষ্টনগরে যাওয়ার কথা ভাবতেই নয়নতারার সব দুঃখ যেন কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। আবার যেন নতুন করে বেঁচে উঠলো সে। আবার যেন সে নিজের সত্তা ফিরে পেলে। বেঁচে থেকে যে এত সুখ তা যেন সে এতদিন এমন করে আর কখনও উপলব্ধি করতে পারে নি। পাখিদের মত যদি পাখা থাকতো তার তাহলে বেশ উড়ে যাওয়া যেত। কেষ্টনগরে যেতে তাহলে আর তার এত দেরি হতো না।
হঠাৎ যেন বাইরে তার সেই মামাশ্বশুরের গলা শোনা গেল।
–হ্যাঁ গো গৌরী, বউমা হঠাৎ বাপের বাড়ি যাচ্ছে কেন গো? কী হয়েছে?
গৌরী পিসীর গলা শোনা গেল তারপর। গৌরী পিসী বললে–অত জোরে কথা বোল মামাবাবু, একটু আস্তে, বউমার কানে যাবে। বউমার কানে গেলে অনত্থ বাধবে–
–কেন, কী হয়েছে? বউমার কানে গেলে ক্ষতি কী?
গৌরী পিসী বললে–বউমার মা যে মারা গেছে–
–অ্যাঁ? মা মারা গেছে? সদার শাশুড়ী? কীসে মারা গেল? কখন খবর এল? আমি তো কিছুই টের পাই নি, আমাকে তো কেউ কিছু বলে নি–
গৌরী পিসী বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো–আঃ, বলছি আস্তে! বউমা ঘরের ভেতরে রয়েছে, শুনতে পাবে যে–
কিন্তু ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে। গৌরী পিসী ঘরে ঢুকতেই দেখলে বউমার চোখ দুটো কেমন বিহ্বল হয়ে শূন্যের দিকে চেয়ে রয়েছে। হয়ত এখুনি ঢলে পড়ে যাবে।
গৌরী পিসী তাড়াতাড়ি পাশে গিয়ে তাকে ধরে ফেললে। বললে–কী হলো বউমা, তোমার শরীর খারাপ হলো নাকি!
নয়নতারার মুখে যেন তখন কথা বলবারও শক্তি নেই। কোনও রকমে বলে উঠলো– আমার মা মারা গেছে? তোমরা তো আমাকে কিছু বলো নি পিসীমা…
বলতে বলতে নয়নতারা সেইখানে বসেই ভেঙে পড়লো।
.
সংসারে যার জীবনের যাত্রাপথের সূচনাটাই মৃত্যু দিয়ে অভিষিক্ত হলো তার শেষ পরিণতি যে কোথায় কেমন করে কোন্ চোরাবালিতে গিয়ে পূর্ণচ্ছেদ টানবে তা যেমন তার সৃষ্টিকর্তাও বলতে পারে না, তেমনি কোনও ইতিহাস-লেখকও বলতে পারে না। তবু তো সৃষ্টির কাজ ব্যাহত হয় না সৃষ্টিকর্তার, আর লেখককেও তাই লিখে যেতে হয়। কারণ বিন্দু বিন্দু রক্ত দিয়ে যেমন একজন মানুষ, তেমনি এক একটি মানুষ নিয়েই সমাজ দেশ ভূগোল আর ইতিহাস। যাকে সেই ইতিহাস সৃষ্টি করতে হয় তাকে কখনও বা মধুর আবার কখনও বা নিষ্ঠুর হতে হয়। কারো মনোরঞ্জন করার দায় তার নেই, আবার কারো মুখ চাওয়ার দায়িত্ব নিলেও তার চলে না। সে যে নিষ্ঠুর, নিরাসক্ত, নির্বিকার!
অন্তত নয়নতারার সেদিন সেই কথাই মনে হয়েছিল। কার বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে সে? কার কাছে সে প্রতিকার প্রার্থনা করবে? মাকে সে দুদিন আগেও দেখেছে। দুদিন আগেও মা তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিয়েছে। মা বলেছে–দেখিস মা, আসছে বেস্পতিবারেই আবার তোকে নিয়ে আসবো, বেয়াই মশাইকে উনি বলে দিয়েছেন–
বৃহস্পতিবার মার কাছে যাবার প্রতীক্ষাতেই সে ছিল। ভেবেছিল এটা এই শ্বশুরবাড়িটা তার সাময়িক আশ্রয়, কেষ্টনগরের বাড়িটার আশ্রয়ই তার শাশ্বত। সেখানে সে আবার ফিরে যাবে। আবার তার বাবা-মাকে ঘিরে তার জীবনের পরিক্রমা আগের মতই সুচারুভাবে চলবে।
কিন্তু হঠাৎ অদৃশ্য দেবতার কোন অমোঘ নির্দেশে তার সব কিছু এমন হঠাৎ বানচাল হয়ে গেল।
নয়নতারা মনে মনে ভাবতে চাইলে হয়ত সে যা শুনেছে তা ভুল। ভাবতে ভালো লাগলো যে আসলে তার মা আছে। হে ভগবান, তার ভাবনাটাই যেন সত্যি হয়। যেন সে কেষ্টনগরে গিয়ে মাকে দেখতে পায়। তাহলে মাকে গিয়ে সে বলবে–মা, আমি আর নবাবগঞ্জে যাবো না, আমি এবার এই কেষ্টনগরে তোমার কাছেই থাকবো–
মা তাকে হয়ত বলবে–না মা, ও কথা বলতে নেই, এখন তোমার বিয়ে হয়েছে, এখন থেকে স্বামীর ঘরই তোমার ঘর, স্বামীই তোমার আপন, স্বামীই তোমার সব–
আশ্চর্য! কে জানতো এই স্বামীই তার কাছে একদিন সব চেয়ে পর হয়ে যাবে, সব চেয়ে দূর হয়ে যাবে। একদিন যার হাতে নয়নতারাকে তুলে দিয়ে তার মা সব চেয়ে নিশ্চিত বোধ করেছিল সেই সদানন্দই তাকে এমন করে দূরে ঠেলে দেবে–এ কথা কি তারা-ই কোনও দিন কল্পনা করতে পেরেছিল!
কালীকান্ত ভট্টাচার্য মশাই জীবন আরম্ভ করেছিলেন বড় মহৎ আদর্শ নিয়ে। তাঁর আদর্শ ছিল ছেলে মানুষ করবার। শুধু একজন ছেলে নয়, হাজার হাজার ছেলে। আর শুধু ছেলেই নয়, ভেবেছিলেন ছেলে মেয়ে সবাইকে তিনি মানুষ করে যাবেন নিজের আদর্শের মত করে। তিনি বলতেন–জীবনে পাওয়াটাই বড় কথা নয় নিখিলেশ, পেয়ে যেমন অনেকের হারিয়ে যায়, তেমনি হারিয়েও আবার অনেকে অনেক কিছু পায়। তথাগত বুদ্ধদেব রাজার ঐশ্বর্য হারিয়ে সম্রাটের ঐশ্বর্য পেয়েছিলেন। তাকেই বলে সত্যিকারের পাওয়া। কিন্তু আমরা সবাই পেয়ে হারাই নিখিলেশ। আমরাই হলুম আসল লক্ষ্মীছাড়া। আমরা যা পাই তাও ধরে রাখতে পারি না, আবার যা পাই না তার জন্যেও আমাদের আক্ষেপ নেই। এই আমার জীবনটাই দেখ না–
বলে নিজের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। বলেন–আমি কিছুই হারাতে পারলুম না বলে জীবনে কিছুই পেলুম না–
