কিন্তু সেই প্রকাশ মামাও তখন আর নেই।
কর্তাবাবু তখন নিজের ঘরের মধ্যে আসর জাঁকিয়ে কথাবার্তা চালাচ্ছিলেন। বহুদিন আগে একদিন তিনি এই বংশের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেদিন মনে নানা সংশয় ছিল তাঁর। সংশয় ছিল নানা কারণে। একে তো সোজা পথে তাঁর যাত্রা শুরু হয় নি। অনেক বাধা এসেছে তার জীবনে। একদিক থেকে যেমন উন্নতি অন্যদিক থেকে তেমনি শত্রুতা। শুধু বিধাতার শত্রুতাই নয়, মানুষের শত্রুতাও কম ছিল না। তার জমির আয়তন বেড়েছে, কিন্তু সেই আয়তন বাড়াতে গিয়ে কতবার রাজদ্বারে উপস্থিত হতে হয়েছে তাকে। একটার পর একটা মকর্দমা। সঙ্গে সঙ্গে ছিল অর্থব্যয়। দু’হাতে টাকা বিলিয়েছে সকলকে। উকিল, মুহুরি, পেশকার থেকে শুরু করে কোর্টের একটা সামান্য পোকা-মাকড় পর্যন্ত তার টাকায় পেট ভরিয়েছে। তারপর আছে পুলিস-দারোগা-চৌকিদার। সবাই যেন এক-একটা রাঘব বোয়াল। আর তিনিও ছিলেন মুক্তহস্ত। তিনি বলতেন–টাকা নিচ্ছ নাও, কিন্তু দেখো আমার কাজটা যেন উদ্ধার হয় বাপু–
তা নেমকহারামি যে কেউ করে নি তা নয়, করেছে। কিন্তু অনেকে আবার তার কাজ উদ্ধারও করে দিয়েছে। লাভ-লোকসান ক্ষয়-ক্ষতি মিলিয়ে শেষমেষ যা দাঁড়িয়েছে তাতে মোটা লাভের দিকেই তার পাল্লা ঝুঁকেছে।
এ সব অতীতের কথা। এখন বলতে গেলে সব দিক থেকেই সুরাহা হয়েছে তার। এখন আর তার জমিদারি নেই বটে। সরকারী আইনের আওতায় এখন তাকে আর জমিদার বলা যাবে না। সরকারী সেরেস্তার খাতায় জমিদারের তালিকাটাই পুরোপুরি বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু তা হোক, তাতে তার কোনও উনিশ-বিশ হয় নি। তিনি আগেও যেমন ছিলেন, এখনও তেমনিই আছেন। বরং এখন তার সমৃদ্ধি বলতে গেলে আরো বেড়েছে। তার একমাত্র দাবীদার যে এতদিন বেঁচে ছিল সে–ও এখন নিঃশেষ হয়েছে। আর বাকি ছিল নাতির বিয়েটা। তা ভেবেছিলেন সেদিক থেকেও হয়ত কিছু বাধা আসবে। কিন্তু না, শেষ পর্যন্ত তাও নির্বিঘ্নে সমাধা হয়ে গেল কাল। কাল সমস্ত অতিথি-অভ্যাগতরা তাঁর বাড়িতে এসে নববধূকে আশীর্বাদ করে গিয়েছে। ভেবেছিলেন তার নাতি ফুলশয্যার রাত্রে হয়ত বাড়ি থেকেই নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে। কিন্তু না, সে শোবার ঘরে ঢুকে রীতিমত দরজায় খিল দিয়েছে। নতুন বউ এর সঙ্গে রাত্রিযাপনও করেছে।
কিন্তু তাহলে রাত্রে অমন অমঙ্গলের কান্না কে কেঁদেছিল?
দীনু ভোরবেলার দিকে এল। কর্তাবাবু জিজ্ঞেস করলেন–হ্যাঁ রে দীনু, রাত্তিরে তুই কোথায় শুয়েছিলি?
দীনু বললে–আজ্ঞে, বাইরের বারান্দায়–
কর্তাবাবু বললেন, বেশ করেছিস, বারান্দায় শুয়েছিস। তা হ্যাঁ রে, রাত্তিরে কিছু শুনতে পেয়েছিলি?
–কী শুনবো?
–কারোর কান্না?
দীনু কিছু বুঝতে পারলে না। বললে–কান্না? কার কান্নার কথা বলছেন কর্তাবাবু?
কর্তাবাবু বললেন–কার কান্না তা কি ছাই আমিই জানি। মনে হলো যেন কে কোথায় কাঁদছে। তা আমি তোকে ‘দীনু দীনু’ বলে বার-দুই ডাকলুম, কিন্তু তোর তো কোনও সাড়া শব্দই পেলুম না–
দীনু অপরাধীর মত বললে–আজ্ঞে আমি অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছিলুম–
–তা ঘুমিয়েছিস বেশ করেছিস। সারাদিন খাটুনি গেছে, ঘুমোবি না? হাজার হোক শরীর তো বটে।
তারপর একটু থেমে জিজ্ঞেস করলেন–তুই নিচেয় গিয়েছিলি?
দীনু বললে–আজ্ঞে হ্যাঁ, নিচের থেকেই তো আসচি–
–নিচেয় কী দেখে এলি?
–দেখলুম ঠাকুররা উঠেছে, এইবার সব জল-খাবারের ব্যবস্থা হবে, উনুনে আগুন পড়েছে–
কর্তাবাবু বললেন না না, ও কথা বলছি না, বলছি ভেতরবাড়িতে কী দেখলি?
–ভেতর-বাড়িতে এখনও সবাই ঘুমোচ্ছে।
–ঘুমোচ্ছে? তাই নাকি রে! সবাই-ই ঘুমোচ্ছে?
–না, ওদিকে কাল তো শুতে অনেক রাত হয়েছিল, তাই এখন জাগে নি কেউ। তা ছোট মশাইকে ডেকে দেব আমি?
–দূর, ছোট মশাইকে ডেকে দিয়ে কী হবে! আমি বুড়ো মানুষ, আমার তো খাটা খাটুনি হয় নি বেশি, তাই ভালো ঘুমও হয় নি। ঘুমোচ্ছে ঘুমোক না। এখন ঝামেলা ঝঞ্ঝাট সব চুকে গেছে। এখন তো ঘুমোবেই।
তারপর একটু হেসে বললেন–তা ওদিকের কী খবর রে?
–কোন্ দিকের?
–বর-কনের!
–আজ্ঞে, খোকাবাবুর কথা বলছেন? খোকাবাবু তো দেখলুম শালাবাবুর সঙ্গে বার বাড়ির উঠোনে কথা বলছেন।
কর্তাবাবু যেন বিশ্বাস করতে চাইলেন না। বললেন–ঠিক দেখেছিস তো তুই?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি ভুল দেখতে যাবো কেন?
–কিন্তু এত ভোর-ভোর, তাহলে উঠতে গেল কেন? নতুন বউ কোথায়?
–আজ্ঞে নতুন বউমার ঘরের দরজা তো ভেজানো রয়েছে দেখলুম!
কর্তবাবু কেমন যেন চিন্তায় পড়লেন। নতুন বউ, ফুলশয্যার রাত, সেই রাতে বর কেন এত সকালে উঠলো! এ-দিনে তো একটু দেরি করেই ঘুম থেকে ওঠে সবাই!
বললেন–তুই একবার ছোট মশাইকে ডেকে আন তো আমার কাছে
দীনু আর দাঁড়ালো না। কিন্তু ততক্ষণে প্রাণকৃষ্ণ শা’ মশাইও এসে গেছেন। আড়তদার মানুষ। নতুন বউয়ের মুখ দেখবেন সোনা দিয়ে। একটু পরে কৈলাস গোমস্তাও এসে গেল। আর তার পরেই এল চৌধুরী মশাই নিজে।
নিচের থেকে খবর এল, বউমার তৈরি হতে একটু দেরি হবে। কর্তাবাবু বললেন একটু বসতে হবে শা’ মশাই, বুঝতেই তো পারছেন, কাল অনেক রাত হয়েছে সব শেষ হতে…
কিন্তু এই-ই সব নয়। যখন প্রাণকৃষ্ণ সা’ মশাই বউকে আশীর্বাদ করে চলে গেলেন তখন চৌধুরী মশাইকে ডাকলেন কর্তাবাবু। একেবারে একান্তে।
