বেহারী পালের বউ বললে–তাহলে কর্তা যেমন বলেন সেই রকমই করো তুমি বউমা। ছেলের কানে গেলে যদি আবার সে বউমাকে বাপের বাড়ি যেতে না দেয়!
হঠাৎ চৌধুরী মশাই ভেতর বাড়িতে এলেন। প্রীতি কাছে এগিয়ে গেল। গলা নিচু করে জিজ্ঞেস করলে, কী খবর ওদিকের?
চৌধুরী মশাই বললেন–সা’ মশাইকে বিদেয় করে দিয়ে এলুম। লোকের আক্কেল দেখে অবাক। আর সময় পেলে না, এই অসময়ে এসে হাজির! পাথরের গেলাসটা ভেঙে গেল মাঝখান থেকে! দেখ দিকিন কী অমঙ্গলের ব্যাপার
–সে আর ভেবে কী হবে! কিন্তু পুরুত মশাই কী বললেন? বউমা আজ নিরিমিষ খাবে তো?
–তা সব জেনে-শুনে আর আঁশ খেতে দেওয়া যায় কী করে বলো!
–কিন্তু কেষ্টনগরে যাওয়া?
চৌধুরী মশাই বললেন–পুরুত মশাই তো বলছেন সেখানে পাঠিয়ে দিতে! দুদিন পরে তো পাঠাতেই হতো সেখানে। না হয় একদিন আগেই গেল! আমি ভাবছি সেইটেই ভালো হবে। খোকা যে কাণ্ড করছে, আজকেও যদি খোকা বউমার ঘরে না শোয় তো তাতেও বউমার মনে সন্দেহ হবে। তার চেয়ে বরং বউমাকে সেখানে পাঠিয়ে দেওয়াই ভালো হবে–
–সঙ্গে কে যাবে?
চৌধুরী মশাই বললেন–খোকা গেলেই ভালো হতো। কিন্তু কোথায় সে?
–থাকলেই কি সে সেখানে যেত? খোকা যদি না যায় তো প্রকাশ আর গৌরী সঙ্গে যাক। এখানকার আমাদের তরফের কেউ গেলেই ভালো হতো।
–কিন্তু সঙ্গে খোকা গেলেই সব চেয়ে ভালো হয়। তাহলে আর কারো যাবার দরকার হয় না।
প্রীতি বললে–তা দেখ না তাকে খুঁজে। যদি রাজি করাতে পারো–
চৌধুরী মশাই বললেন–সে না-হয় আমি দেখছি। কিন্তু তুমি ততক্ষণে বউমাকে তৈরি করিয়ে রাখো। খাইয়ে-দাইয়ে সাজিয়ে-গুজিয়ে রেখে দাও। বেরোলে এখুনি বেরোতে হবে। রজব আলীকে বলেছি গাড়ী তৈরি করতে। বেলাবেলির ট্রেনে পাঠানোই ভালো, প্রকাশ আর গৌরীকেও আমি তৈরি হতে বলেছি
বলে তিনি যেমন এসেছিলেন আবার তেমনি বারবাড়ির দিকে চলে গেলেন।
.
হায় রে কপাল! তখনও নয়নতারা জানতো না যে যে বাড়ি থেকে তাকে একদিন চিরকালের মত চলে যেতে হবে এই-ই বুঝি তার সূত্রপাত। এই ফুলশয্যার রাতই বুঝি তার জীবনের এক অমোঘ সূচনা। নইলে অমন করে পাথরের গেলাসটা পায়ে লেগে ভেঙে গেলই বা কেন? অথচ এসব কথা যখন মা বলেছে তখন বিশ্বাসই করে নি সে। ভেবেছে মা’র যত সব মনের কুসংস্কার। কোথায় কত দূরে রইল তার মা, আর কোথায় চিরকালের মত বিচ্ছিন্ন হয়ে সে চলে এল নবাবগঞ্জে। আর এই নবাবগঞ্জেই হয়ত তাকে সারাজীবন কাটাতে হবে।
সারাজীবন এখানে কাটাবার কথাটা মনে হতেই কেমন যেন আতঙ্কে শিউরে উঠলো সে। কাল রাত থেকেই সে ভয়ে কাঁপছে। কীসের ভয়? তার তো এখানে ভয় পাবার কোনও কারণ নেই! তার শাশুড়ী মানুষটা তো ভালো। শ্বশুরও তো ভালো। আর…
আর সেই তার স্বামীর কথাটা ভাবতে গিয়েই যেন সব কিছু তার কাছে অস্পষ্ট হয়ে গেল! কে সে? কী রকম মানুষ! কী রকম স্বভাবচরিত্র সে মানুষটার! শুধু বিয়ের সময় হাতে তার হাতের ছোঁয়া লেগেছিল কিছুক্ষণ। কেষ্টনগরের সবাই-ই বলেছিল–ওরকম বর নাকি সাধারণত দেখা যায় না।
আসবার সময় নয়নতারা যখন খুব কাঁদছিল তখন মা নিজের আঁচল দিয়ে চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলেছিল–কাঁদিস নে মা, তোর কীসের দুঃখু, তুই যেমন স্বামী পেয়েছিস অমন স্বামী ক’জনের আছে বল তো! কাঁদিস নে–
তা সত্যি, বিয়ের দিন বাপের বাড়িতে একে একে সবাই তাকে এই কথাই বলে গেছে। যাদের বিয়ে হয় নি, কিম্বা যাদের বিয়ে হয়েছে সবাই তার বরের রূপ দেখে হিংসে করেছে।
হঠাৎ গৌরী পিসী ভাতের থালা নিয়ে ঘরে ঢুকলো। বললো–এই নাও বউমা ভাত খেয়ে নাও
নয়নতারা অবাক হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলে–এত সকাল-সকাল যে ভাত দিচ্ছ পিসীমা? কটা বাজলো এখন?
গৌরী পিসী বললে–সকাল-সকাল খেয়ে নাও, তুমি আবার কেষ্টনগরে যাবে যে আজ
–কেষ্টনগরে? আজকে? কেন?
গৌরী পিসী বললে–তোমার শ্বশুরের ইচ্ছে যে তোমার বাবা-মার সঙ্গে তুমি একবার দেখা করে আসবে। তুমি নাকি আসবার সময় সেদিন খুব কেঁদেছিলে, তাই। মাকে দেখতে তোমার খুব ইচ্ছে করছে না?
নয়নতারা বললে–হ্যাঁ, খুব ইচ্ছে করছে পিসীমা। মা’র জন্যে খুব মন-কেমন করছে আমার। কিন্তু তোমরা কী করে তা জানতে পারলে? আমি তো তোমাদের কিছু বলি নি!
গৌরী পিসী বললে–আহা, মন কেমন করবে না? মা কি যেমন-তেমন জিনিস বউমা?
নয়নতারা বললে–জানো পিসীমা, আমি কালকে রাত্তিরে মাকে স্বপ্ন দেখেছি। মা যেন আমার বউভাতের দিনে এই নবাবগঞ্জে এসেছে, এসে আমাকে মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করছে। আমি জিজ্ঞেস করলুম-মা, তুমি যে খবর দিয়েছিলে আসবে না! তবে এলে কেন? শুনে মা কী বললে জানো? মা বললে–তোর বউভাতের দিনে আমি না এসে কি থাকতে পারি রে? তারপর হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। চেয়ে দেখি আমি বিছানায় শুয়ে আছি, আমার চোখ দুটো জলে ভেসে গেছে। কখন কেঁদেছি মনেও নেই
গৌরী পিসী বললে–তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও বউমা, দেরি হয়ে যাবে আবার। আজকে কিন্তু মাছ নেই, খেতে পারবে তো?
–মাছ নেই কেন পিসীমা?
গৌরী পিসী বললে–আজকে তোমার মাছ খেতে নেই–
–কেন পিসীমা, আজকে কী?
গৌরী পিসী সেকথার উত্তর না দিয়ে বললে–তোমার জন্যে আর একটু দুধ এনে দিই বউমা–
খেতে খেতে নয়নতারা কেবল মার কথাই বলতে লাগলো। মা কেমন চমৎকার রান্না করে, মা কেমন সেলাই করে, মা কেমন কথা বলে। মার কথা বলবার লোক পেয়ে নয়নতারা যেন বেঁচে গেল।
