–চলো বাবাজী, চলো—
দুজনেই তাড়াতাড়ি ঘটনাস্থল থেকে বাইরে বার বাড়ির দিকে চলে গেলেন। তাঁরা চলে যেতেই প্রীতি ঘরে ঢুকলো। চোখের সামনে যে দৃশ্য তার নজরে পড়লো তা দেখে তার মুখ দিয়ে তখন আর কোনও কথা বেরোল না।
নতুন বউ তখনও তার কার্পেটের আসনটার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। তার সমস্ত শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে। ভাঙা পাথরের গেলাসের টুকরোগুলো যেন তখনও তার বুকে গিয়ে ফুটছে। তার যন্ত্রনাতেই যেন সে ছটফট করতে আরম্ভ করেছে।
বেহারী পালের বউও পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল।
বললে–ওমা, এ কী, পাথরের গেলাসটা ভেঙে গেল নাকি?
কিন্তু কে আর তখন তার কথার উত্তর দেবে! সকলেই ঘটনার আকস্মিকতায় যেন মুহ্যমান।
প্রীতি চাইলে গৌরীর দিকে। বললে–হ্যাঁরে, গেলাসটা ভাঙলি?
গৌরী বললে–বউমার পায়ে লেগে ভেঙে গেল বৌদি–
ঝাঁঝিয়ে উঠলা প্রীতি। বললে–বউমার পায়ে লেগে ভেঙে গেল, তো তুই কোথায় ছিলি? তুই দেখতে পাসনি? তুই কি চোখের মাথা খেয়েছিলি? তুই গেলাসটা একপাশে সরিয়ে রাখতে পারিসনি?
গৌরী বললে–সা’ মশাই আসছিল তাই আমি তাড়াতাড়ি বৌমাকে আসনের ওপর বসাতে গেলুম…
–তা যখন দেখলি পায়ের সামনে গেলাসটা রয়েছে তখন ওটা সরাতে পারলি নে? দিন দিন তোর কী হচ্ছে কী? আজকের এই দিনে পাথরের জিনিস কি ভাঙা ভালো হলো?
বেহারী পালের বউও পেছনে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। বললে–-বেস্পতিবারের বারবেলায় ব্যাপারটা ভালো হলো না বউ।
কথাটা সকলেরই মনে গিয়ে লাগলো। এমনিতেই পাথরের জিনিস। তার ওপর বৃহস্পতিবার। একটা অজ্ঞাত আতঙ্কে সকলের বুকই ধকধক করে উঠলো। এ যে কত বড় অমঙ্গল সে-কথাটা যেন কারো হৃদয়ঙ্গম হতে আর বাকি রইলো না। সকলেরই মনে হলো এত বড় দুর্ঘটনা যেন ভাবী কোনও অমঙ্গলের সূচক। অথচ এর কী প্রতিবিধান তাও সেই মুহূর্তে কারো যেন মাথায় এলো না।
বাইরে এসে বেহারী পালের বউ বললে–কাজটা ভালো হলো না বউ, নতুনবউ বাড়িতে এসেই পা দিয়ে পাথরের গেলাসটা ভেঙে ফেললে এটা কিন্তু ভালো না।
প্রীতির তখন চোখ দুটো ছলছল করে উঠেছে। বললে–আমি কত দিক সামলাই বলো তো মাসীমা? আমার কি একটা জ্বালা? আর মানুষদেরও আক্কেল কী রকম দেখ, কালকে বউভাত গেল, কাল আসতে পারেনি বলে আজ এই অসময়ে আসতে হয়? আসবার আর সময় পেলে না কেউ? বউ তো পালিয়ে যাচ্ছে না বাড়ি থেকে! আর একটু বেলা করে এলে কী এমন ক্ষেতি হতো?
বেহারী পালের বউ বললে–তা কী আর করবে বলল, মঙ্গলচণ্ডীতলায় গিয়ে পূজো দিয়ে আসতে হবে।
–পূজো?
বেহারী পালের বউ বললে–ওমা, তা পূজো দেবে না? অন্য কেউ হলে তত কিছু না করলেও চলতো, কিন্তু নতুন বউ বলে কথা! তোমার নতুন বউকেও নিয়ে যেতে হবে।
–কিন্তু মাসীমা, ওদিকে আর এক বিপদ হয়ে গেছে আমার।
বলতে বলতে প্রীতির গলাটা যেন বন্ধ হয়ে এল। বললে–কাউকে যেন বোল না মাসীমা। তোমার দুটি পায়ে পড়ি এখন কাউকে বোল না। বউমার কানে গেলে আবার কেঁদেকেটে একসা করেবে
বেহারী পালের বউ গোপন কথার ইঙ্গিত পেয়ে আরো কৌতূহলী হয়ে উঠলো।
বললে–আমার কাউকে বলতে বয়ে গেছে, কথাটা কী শুনি না?
–তোমাকে আমার ঘরের লোক মনে করি বলেই বলছি, এখনও কেউ জানে না..
–আরে কথাটা কী তা-ই বলো না?
–বউমার মা মারা গেছে।
–ওমা, সে কী? কবে? কখন? কোত্থেকে খবর এল?
প্রীতি বললে–এই সকালবেলা বেয়াই মশাই খবর পাঠিয়েছেন। এখন আমি যে কী করি, কার সঙ্গে পরামর্শ করি তাই ভাবছি। বউমা জানে না কথাটা। পুরুতমশাইকে ডেকে পাঠানো হয়েছে, কর্তারা সে-সব করছেন। এখন বাড়ির মধ্যে আমি কী করবো তা বুঝতে পারছি নে!
বেহারী পালের বউ বললে–বলেছ ভালোই করেছ বউমা। তাহলে এক কাজ করো। আজকে আর মাছ-টাছ কিছু খেতে দিও না বউমাকে। নিরিমিষ খাক, তারপর চতুর্থী করার ব্যবস্থা করতে হবে
–কিন্তু ওরা তো বৌমাকে নিয়ে যেতে এসেছিল। তা বাপের বাড়িতে তো মা ছাড়া আর দ্বিতীয় মেয়েমানুষ কেউ নেই। বেয়াইমশাই খুবই ভেঙে পড়েছেন। আমি ভাবছি বউমাকে কেষ্টনগরে পাঠিয়ে দিই।
বেহারী পালের বউ ভেবে-চিন্তে বললে–তা তাই-ই দাও বরং–
তারপর যেন কী ভাবলে! বললে–একে মা মারা যাওয়ার খবর এলো, তার ওপর বেস্পতিবারে পা দিয়ে পাথরের জিনিস ভাঙলে, এসব তো ভালো লক্ষণ নয় বউমা, এতে কারোর ভালো হবে না, তোমার ছেলের পক্ষেও ভালো নয়। অবিশ্যি তোমার ছেলের একটু কষ্ট হবে বটে। কদিন বউকে ছেড়ে খোকা থাকতে পারবে তো?
প্রীতি বললে–আমার ছেলের কথা ছেড়ে দাও
–তা ছেলে যদি তোমার রাগ না করে তো বউমা সেখানেই থাক। তারপর শ্রাদ্ধ শান্তি হয়ে গেলে, তখন না হয় ফিরবে। এই সময়ে বাপের কাছে থাকলে বাপও মনে একটু শান্তি পাবে–আর না-হয় ছেলেকেও বউ-এর সঙ্গে সেখানে পাঠিয়ে দাও। ছেলে যদি বউকে ছেড়ে থাকতে না পারে তো তাই-ই না হয় করো–
প্রীতি কিছু ভাঙলে না। মুখে বললে–দেখি, কী করি কিন্তু বউমাকে খবরটা আমি কী করে দেব তাই ভাবছি মাসীমা–বউমা তো এখনও কিছু জানে না–
তা আমি গিয়ে খবরটা দেব?
প্রীতি বললে–না মাসীমা, আমি বলি এখন থাক। কর্তাও বলছিলেন খবরটা এখন বউমাকে দিয়ে দরকার নেই। শেষকালে কান্নাকাটি করলে আমি আর বউমাকে সামলাতে পারবো না–
–তা তোমার ছেলে কী বলছে? সদা?
–ছেলের কথা তুমি ছেড়ে দাও মাসীমা। সে শুধু বিয়ে করেই খালাস। সে কারো সাতেও নেই পাঁচেও নেই। ভোরবেলা থেকে কোথায় যে সে ঘুরছে কেউ তার মুখও দেখেনি। খবরটা যে তাকে বলবো, তা তার দেখা পেলে তবে তো?
