দীনু বললে–এই চণ্ডীমণ্ডপে বসে রয়েছে–
কিন্তু প্রকাশ মামা যখন চণ্ডীমণ্ডপে গেল তখন তারা চলে গেছে।
চৌধুরী মশাই প্রকাশকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন–কী দেখছো?
–আজ্ঞে শুনলুম কুটুমবাড়ির লোক এসেছে বউমাকে নিয়ে যেতে। দীনু বলছিল। কোথায় গেল তারা?
চৌধুরী মশাই বললেন–তারা চলে গেছে–কেন, তোমার কী দরকার?
–তা বউমাকে নিয়ে যাবার কথা আছে নাকি শুনলুম?
চৌধুরী মশাই নিজের মনেই তখনও ভাবছিলেন। কিছুই সিদ্ধান্ত করতে পারেন নি। এত বড় বিপর্যয়টা গেল, কেমন করে সমস্ত দিক সামলাবেন বুঝতে পারছিলেন না। সমস্ত জিনিসটাই যেন জটিল হয়ে আসছিল। এমনই ব্যাপার যে কাউকে বলাও যাবে না কিছু। ছেলে ফুলশয্যার রাত্রে বউয়ের ঘরে রাত কাটায়নি এও যেমন কাউকে বলার নয় তেমনি বউমার মায়ের মৃত্যুর খবরটাও এখন কাউকে বলা যাবে না। বউমার কানে যদি কোনও রকমে কথাটা ওঠে তো সে এক মর্মান্তিক কাণ্ড ঘটে যাবে তখনই।
প্রকাশ মামা তখনও জিজ্ঞেস করলে–তা বউমাকে আপনি সত্যি-সত্যিই পাঠিয়ে দেবেন নাকি?
চৌধুরী মশাই অন্যমনস্ক ভাবেই বলে ফেললেন–হ্যাঁ, তুমি এখন যাও, আমার কাজ আছে–
তখন থেকেই ছটফট করতে লাগলো প্রকাশ মামা। সদাকে খুঁজতে লাগলো। কোথাও নেই সে। ভেতরবাড়িতে দিদির কাছে গিয়েও কোনও সুরাহা হলো না। যাকে দেখে তাকেই জিজ্ঞেস করে–হ্যাঁ রে, সদাকে দেখেছিস? সদা কোথায় গেল?
কেউই দেখেনি সদাকে। যাকে ঘিরে এত কাণ্ড সে এই সময়ে কোথায় পালালো! পিসেমশাই-এর ঘরে গিয়ে দেখলে তিনি তামাক ধরিয়েছেন। প্রকাশ মামা তাকে গিয়েও জিজ্ঞেস করলে–সদাকে দেখেছেন নাকি পিসেমশাই?
কীর্তিপদবাবু অবাক হয়ে গেলেন–সদা? খোকার কথা বলছো? তা সে আবার কোথায় যাবে? আবার পালালো নাকি?
–না, তাকে আমার দরকার।
কীর্তিপদবাবু বললেন–তা দেখ গিয়ে সে হয়ত এখন নতুন নাতবউ-এর কাছে ঘুর ঘুর করছে–সে কি আর আজকে বুড়ো মানুষের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করবে!
তা বটে। প্রকাশ মামা আবার ভেতর বাড়িতে ঢুকলো। দিদি তখন ভাড়ার নিয়ে ব্যস্ত। একেবারে সোজা গিয়ে সদার শোবার ঘরের ভেতর দিকে চেয়ে দেখলে। নতুন বউ চুপ করে বসে ছিল। পাশে গৌরী পিসী তাকে পাথরের বাটিতে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে।
–হ্যাঁ গো গৌরী, আমাদের সদা কোথায় গেল? সদা এখানে আছে?
নয়নতারা মামাশ্বশুরকে দেখেই মাথার ঘোমটাটা একটু টেনে দিলে। গৌরী পিসী বললে–খোকা এখেনে থাকতে যাবে কেন গো, বারবাড়িতে গিয়ে দেখ–দিনের বেলা বর মানুষ কখনও বউ-এর কাছে থাকে?
প্রকাশ মামা সদাকে না পেয়ে আবার অন্য দিকে চলে গেল।
কর্তাবাবুর কাছে খবর গেল প্রাণকৃষ্ণ সা’ মশাই এবার বউ-এর মুখ দেখতে আসতে পারেন। আড়তদার লোক। অনেক টাকা নিয়ে নাড়াচাড়া করা মানুষ। টাকাও যেমন তিনি দেখেছেন, মানুষও দেখেছেন তেমনি অনেক। নতুন বউ খাটের ওপর বসে ছিল; আবার তাকে বেনারসী পরানো হয়েছে। আবার সারা গায়ে গয়না উঠেছে।
গৌরী পিসী বললে–বউমা, তুমি ওই কার্পেটের আসনের ওপর বোস–সা’ মশাই এলে তাকে প্রণাম করবে–
ওদিকে প্রাণকৃষ্ণ সা’ মশাইকে নিয়ে চৌধুরী মশাই ভেতর বাড়িতে এসে পড়েছেন। তাদের কথাবার্তা কানে আসছে। গণ্যমান্য লোক, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করলে বৈষয়িক ব্যাপারে ক্ষতি হবে এবাড়ির। যেন আদর-আপ্যায়নের কোন ত্রুটি না হয় কোথাও।
বাইরে এসে চৌধুরী মশাই গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন–গৌরী, বউমা তৈরী? আমরা যাবো?
ভেতরে গৌরী পিসী নয়নতারাকে নিয়ে আসনের ওপর বসিয়ে দিতে দিতে বললে– হ্যাঁ, আসুন–
কিন্তু বসতে গিয়েই একটা কাণ্ড ঘটে গেল। পাথরের জলখাবারের গেলাসটা নয়নতারার পায়ে লেগে উল্টে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে গেলাসটা ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে গেল। গিয়ে ঘরের মেঝেয় সেই টুকরোগুলো চারদিকে ছড়িয়ে গেল। গেলাসের জলটুকুও ছড়িয়ে ছিটিয়ে চারদিকে জলে জলময় হয়ে গেল।
চৌধুরী মশাইএর সঙ্গে প্রাণকৃষ্ণ সা’ মশাই তখন ঘরে ঢুকে ওই দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে হতবুদ্ধি হয়ে গেছেন।
কারোর মুখেই তখন কোনও কথা নেই।না নয়নতারার, না গৌরী পিসীর। দুজনেরই মনে হলো যেন চরম সর্বনাশ ঘটে গেল তাদের চোখের সামনে। যেন আজকের সমস্ত অনুষ্ঠানের কেন্দ্র চরিত্র নয়নতারারও অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সমস্ত কিছু ভেঙেচুর ছত্রখান হয়ে গেল হঠাৎ।
বাইরে প্রীতির কানে গেল শব্দটা। প্রীতি বুঝতে পারলে ঘরের ভেতর যেন কী একটা ভারি জিনিস হাত থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙে গেল।
–কী যেন ভাঙলো না?
বেহারী পালের বউ সকালবেলাই এসেছিল। সেও বললে–ওমা, কী ভাঙলো ঘরের ভেতরে?
প্রাণকৃষ্ণ সা’ মশাই ওই পরিস্থিতির মধ্যে আর দাঁড়ালো না। যা সঙ্গে করে এনেছিল সেটা তাড়াতাড়ি নতুন বউএর হাতে তুলে দিয়েই বিদায় নিতে পারলে যেন বাঁচে। যেন তার অপরাধেই দুর্ঘটনাটা ঘটলো।
মাঝখানে ভাঙা পাথরের টুকরোগুলো, আর জল। আর একপাশে নতুন বউ দাঁড়িয়ে, আর একপাশে প্রাণকৃষ্ণ সা’ মশাই। নতুন বউ দু’হাত পেতে উপহারটা নিয়ে সা’ মশাইকে নমস্কার করতে যাচ্ছিল। কিন্তু সা’ মশাই বলে উঠলো–থাক, থাক, আমি চলি–
সত্যিই, তার অপরাধ-বোধ তাকে আর সেখানে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকতে দিলে না। পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন চৌধুরী মশাই। তিনিও ঘটনার আকস্মিকতায় তখন স্তব্ধ হতচকিত।
