যখন উৎসবের বাড়িতে আবার সবাই আগেকার বউভাতের জের টেনে সকালবেলা থেকেই খুশির হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিয়েছে, যখন সবাই বাসি লুচি-বেগুনভাজার ভোজে। বেসামাল, বাড়ির গিন্নির তখন মেজাজ সপ্তমে চড়ে উঠেছে। অথচ কাল রাত্রেও এমন ছিল না। বাড়ির গৃহিণী তখন শান্তিপুরের চওড়া জরির পাড়ওয়ালা শাড়ি পরে সবাইকে অভ্যর্থনা করছে। কিন্তু আজ তারই আবার তখন অন্য চেহারা, অন্য মেজাজ। গৌরী পিসী কী একটা আর্জি জানাতে এসে বকুনি খেয়ে ফিরে গেল।
প্রীতি বলে উঠলো–আমার একটা তো মাথা, আমি কোন দিক সামলাবো শুনি! না খেল তো বয়ে গেল! দরকার নেই কারো খেয়ে। আমার নতুন বউয়ের মুখে এখনও জল পড়েনি, আগে আমি তাই ভাববো না তোদের কথা ভাববো!
গৌরী পিসী বললে–আমি তো সে কথা বলিনি বউদি। বলছি রাঁধুনী বামুনরা জিজ্ঞেস করছে কত ময়দা মাখব–
প্রীতি ঝাঁঝিয়ে উঠলো–কত ময়দা মাখবে তা আমি এত আগে থেকে কী করে বলবো, আমি কি গুনতে জানি যে আগে গুনে বলবো আমার এতজন বাড়িতে খাবে…
এর পরে আর কথা চলে না। কিন্তু শুধু এই-ই শেষ নয়, সামান্য-সামান্য ব্যাপারেই সকাল থেকে বাড়ির গিন্নীর মেজাজটা সকলের নজরে পড়লো।
প্রকাশ মামা এসেই বললে–দিদি, শুনলুম বউমাকে নাকি বাপের বাড়ি পাঠানো হচ্ছে?
দিদি বললে–কেন, কে তোকে বললে?
–তুমি কথাটা সত্যি কি না তাই বলো না! কথা নেই বার্তা নেই ওমনি বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেই হলো? এখনও তো আট দিনও কাটলো না!
প্রীতি বললে–কিন্তু এ-সব কথা কে বললে তোকে?
–কে আবার বলবে, বলেছে জামাইবাবু!
–তা যে বলেছে তাকেই জিজ্ঞেস করগে কেন বউমাকে পাঠানো হচ্ছে।
প্রকাশ মামা বললে–তা হলে যা শুনছি তা সত্যি!
প্রীতি বললে–সত্যি-মিথ্যে আমি জানি নে। আমার অত জানবার সময় নেই বাপু
বলে আবার তার নিজের কাজে চলে গেল। কিন্তু প্রকাশ মামা ব্যাপারটা নিয়ে চুপ করে বসে থাকতে পারলে না। আসলে চুপ করে বসে থাকা তার স্বভাবেই নেই। আবার দৌড়ে গেল চৌধুরী মশাইয়ের কাছে। বললে–-জামাইবাবু, দিদি তো কই কিছু বললে না–
চৌধুরী মশাই তখন নিজের ঝঞ্ঝাট নিয়েই ব্যস্ত। প্রকাশের কথাটা বুঝতে পারলেন না। বললেন–কীসের কী?
–ওই যে আপনি বললেন বউমাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হবে!
চৌধুরী মশাই চটে গেলেন। বললেন–তা বউমা একবার বাপের বাড়িও যাবে না? বিয়ে হয়েছে বলে কি একেবারে চিরকাল শ্বশুরবাড়িতেই বাঁধা হয়ে থাকবে? বাপ-মার জন্যে একটু মন-কেমন করে না? ছেলেমানুষ বউ, বেশি তো বয়েস নয়–
–কিন্তু এখানে কিছুদিন তো অন্তত থাকবে। একটা হপ্তা থাকুক, আপনি এত তাড়াতাড়ি কেন ফেরত পাঠাচ্ছেন?
চৌধুরী মশাইয়ের কেমন যেন সন্দেহ হলো। বললেন–তা বউমার জন্যে তোমার এত মাথাব্যথা কেন হে? বউমা কিছু বলেছে তোমাকে?
–বউমা? বউমা কেন বলতে যাবে। আপনি কী যে বলেন!
–তা হলে? তা হলে কে তার হয়ে তোমাকে ওকালতি করতে বললে? বলো, কে বললে?
প্রকাশ মামা আর কী বলবে! হঠাৎ বলে ফেললে–সদা! সদা বলছিল—
চৌধুরী মশাই অবাক। বললেন–সদা? সদা তোমাকে বলেছে?
প্রকাশ মামা বললে–হ্যাঁ–
–কী বলেছে সদা?
–বলছিল এরই মধ্যে কেন বাবা বউকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছে, সেই কথা জিজ্ঞেস করছিল।
–জিজ্ঞেস করেছে তোমাকে?
প্রকাশ মামা বললে–তা জিজ্ঞেস করবে না। সবে কাল ফুলশয্যে হয়েছে। এখনও ভালো করে ভাব-ভালবাসা হয়নি, এরই মধ্যে কিনা আপনি বউমাকে কেষ্টনগরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন!
–সদা কোথায়? তাকে একবার ডেকে নিয়ে এসো তো আমার কাছে!
প্রকাশ মামা সদাকে আনতে চলে গেল। আসলে খবরটা কেউই বলেনি প্রকাশ মামাকে। ঘুম থেকে উঠে ঠাকুরদের বলে চা তৈরি করিয়ে নিয়ে খেয়েছিল। পিসে মশাইকেও গিয়ে এক কাপ খাইয়ে এসেছিল। বিরাট বাড়ি। বারবাড়ি, ভেতর বাড়ি। বার বাড়ির উঠোন, ভেতর-বাড়ির উঠোন। কাল বউভাতের রাত্রে সমস্ত বাড়িটা লোকজনে ভরে গিয়েছিল। তারপর কখন কে খেলে, কে না খেলে, সব তদারক করেছে সে। সঙ্গে সঙ্গে পাহারা দিয়েছে সদাকে। যেন কোথাও পালিয়ে না যায় সে। তারপর যখন সব শেষ হলো তার আগেই শোবার ঘরে সদাকে ঢুকিয়ে তবে নিশ্চিন্ত হয়েছে। কিন্তু তখন আর শরীর বইছে না তার। সবাই-ই ক্লান্ত। শেষকালে একটা জায়গা বেছে নিয়ে দু-চোখ বুজতেই ঘুমিয়ে পড়েছে অঘোরে তারপর সকালবেলাই দীনুর সঙ্গে দেখা। তখন বেশ বেলা হয়েছে। চা খেয়ে চাঙ্গা হয়েছে শরীর।
প্রকাশ মামা দীনুকে জিজ্ঞেস করলে কী খবর দীনু? কাল রাত্তিরে কেমন খেলে? দীনুর তখন কথা বলবার সময় ছিল না। বললে–ভালো–
বলেই চলে যাচ্ছিল। কিন্তু প্রকাশ মামা বললে–কী গো, অত সাতাড়াতাড়ি যাচ্ছো কোথায়? কর্তাবাবু উঠেছে নাকি?
দীনু যেতে যেতে বললে–না, কুটুমবাড়ির লোক এসেছে, তাদের খাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে।
–কুটুমবাড়ির লোক! কেষ্টনগর থেকে এসেছে? কালই তো ফুলশয্যের তত্ত্ব নিয়ে এসে খেয়ে-দেয়ে চলে গেল! আবার আজ সকালেই এসেছে? হঠাৎ এল কেন?
দীনু বললে–বউমাকে নিয়ে যেতে–
–সে কী? বউমাকে নিয়ে যাবে মানে?
আসলে দীনুও ভালো করে কিছুই জানতো না। কুটুমবাড়ির লোক যখন এসেছে তখন বউমাকে নিয়ে যাবার জন্যেই এসেছে। তা ছাড়া আর কী হতে পারে?
–কোথায় তারা? কোথায় কুটুমবাড়ির লোক?
