–আচ্ছা তুই যা, আমি দেখছি—
বলে সোজা বউমার ঘরে গেল। বাইরে থেকে যেমন দরজা ভেজিয়ে রেখে দিয়েছিল, তখনও ঠিক তেমনি ভেজানোই রয়েছে।
প্রীতি আস্তে আস্তে নিঃশব্দে দরজার ফাঁক দিয়ে ঘরের ভেতরে উঁকি দিলে। উঁকি দিয়ে দেখলে বউ বিছানার ওপর শুয়ে বালিশের ওপর মুখ গুঁজে পড়ে রয়েছে। মনে হলো বোধ হয় জেগেই আছে।
আস্তে আস্তে প্রীতি ভেতরে ঢুকলো। তারপর বিছানার কাছে গিয়ে বোঝবার চেষ্টা করলে বউমা সত্যিই জেগে আছে না ঘুমোচ্ছে।
বোধ হয় প্রীতির পায়ের আওয়াজ নয়নতারার কানে গিয়েছিল। নয়নতারা মাথা তুলে দেখতেই প্রীতি বললে–তুমি জেগে আছ বউমা?
শাশুড়ীর কথার উত্তরে নয়নতারা ধড়মড় করে উঠে বসলো। বললে—হ্যাঁ–
–একটুও ঘুম হয়নি? তোমাকে ঘুম পাড়িয়েই তো গেলাম। একটু ঘুমোতে চেষ্টা করলে না কেন?
নয়নতারা কোনও উত্তর দিলে না।
প্রীতি বললে–ঠিক আছে বউমা, তুমি একটু বোস, কিছু ভেবো না। আমি এখুনি আসছি। তোমার চা খাওয়া অভ্যেস আছে তো? তুমি চা খাও?
নয়নতারা বললে—হ্যাঁ–
তাহলে আমি চা তৈরি করে নিয়ে আসছি। তারপর একজন ভদ্রলোক এসেছেন। তিনি কালকে আসতে পারেননি, আজকে ভোর থেকে এসে বসে আছেন। তোমার মুখ দেখে আশীর্বাদ করেই চলে যাবেন। তার আগে তোমাকে মুখ-হাত-পা ধুয়ে তৈরি হয়ে নিতে হবে–
তারপর একটু থেমে বললে–তুমি একটু অপেক্ষা করো বউমা আমি এখুনি আসছি, আমি যাবো আর আসবো–
বলে প্রীতি বাইরে চলে গেল। যাবার আগে দরজার পাল্লা দু’টো ভেজিয়ে দিয়ে গেল।
বাইরে গিয়ে নিজের ঘরের দিকে যাওয়ার পথে আবার চৌধুরী মশাই-এর সঙ্গে দেখা। চৌধুরী মশাই হনহন করে আসছিলেন। গৃহিণীকে দেখেই বললেন–ওগো শুনছো, কোথায় ছিলে তুমি?
গৃহিণী বললে–বউমার কাছে, কেন?
–বউমা কেমন আছেন এখন?
–থাকা-থাকি আর কী! সারারাতই ঘুমোয়নি। না-ঘুমিয়ে চোখ দুটো জবাফুলের মত লাল হয়ে রয়েছে। বউমার জন্যে চা তৈরি করতে আসছি। তা শুনছি নাকি বউমার মায়ের খুব অসুখ? বউমার বাপের বাড়ি থেকে নাকি লোক এসেছে-বেয়াই মশাই-এর চিঠি নিয়ে? বেয়ানের নাকি অসুখ?
–তোমায় কে বললে?
–গৌরী। তা অসুখের খবরটা কি আজকেই না-পাঠালে হতো না?
চৌধুরী মশাই হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন। গলাটা নিচু করে বললেন–তোমাকে চুপি চুপি বলি। কাউকে যেন এখন বোল না। এই দেখ, বেয়াই মশাই এই চিঠি দিয়েছেন। খুবই দুঃখের খবর। বউমার মায়ের অসুখ নয়, ওটা আমি গৌরীকে ঘুরিয়ে বলেছি। আসলে বউমার মা কাল মারা গেছেন
–অ্যাঁ?
প্রীতির মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়লো। বললে–বলছো কী তুমি? কখন মারা গেলেন? কী হয়েছিল? কালও তো কিছু বলেনি ওদের লোকেরা!
এ বাড়ির যে গৃহিণী তারই যেন সব দায়, নতুন বউ বাড়িতে এলে গৃহিণীর দায়িত্ব কোথায় কমবে, তা নয়। যেন আরো বেড়ে গেল। একে ক’দিন থেকেই ঝঞ্ঝাট চলেছে, তার ওপর আছে ছেলের বেয়াড়াপনা। এখন বউকে সামলাবে, না ছেলেকে সামলাবে, সেই ভাবনাতেই অস্থির। তার ওপর আবার এই নতুন ঝঞ্ঝাট। মাথা ঠিক রাখাই দায় হয়ে পড়েছিল প্রীতির।
প্রীতি বললে–এখন কী করি তাহলে আমি? বউমাকে কথাটা বলি কী করে? খবরটা শুনে তো বউমা একেবারে কেঁদে ভাসাবে। তখন আমি সামলাবো কী করে?
চৌধুরী মশাই বললেন–আমিও তো তাই ভাবছি। কী যে করি আর কার সঙ্গেই বা পরামর্শ করি তাও বুঝতে পারছি না–
–তা বেয়াই বাড়ির লোক কী বলছে?
–ওরা আর কী বলবে? ওরা তো আমাদের খবর দিতে এসেছে। বেয়াই মশাই নিজেও কিছু ঠিক করতে পারেন নি, ওদিকে লোকজন সবাই শ্মশানে গেছে, আর এদেরও পাঠিয়ে দিয়েছেন এখানে। এখন যা করার হয় আমরা করবো।
বলে চৌধুরী মশাই কিছু সমাধান বার করতে না পেরে দু’হাতে মাথার চুলগুলোকে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলেন। যেন মাথার চুলগুলোই সমস্যা সমাধানের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু অত কথা শোনবার বা ভাববারও সময় তখন কারো ছিল না। না প্রীতির না চৌধুরী মশাইয়ের। চৌধুরী মশাই বললেন–ওদিকে আবার প্রাণকৃষ্ণ সা’ মশাই বসে আছে, বউমা তৈরি আছে তো?
প্রীতি রেগে গেল কী করে তৈরি থাকবে? যখন-তখন ওমনি বউ দেখতে এলেই হলো? মানুষের শরীর-গতিক বলে একটা জিনিস নেই?
চৌধুরী মশাই বললেন–না, আমি তা বলছি না। তাঁকে তো আমি বসিয়েই রেখেছি।
প্রীতি বললে–হ্যাঁ, তিনি বসে থাকুন। যখন বউমা তৈরি হবে তখন দেখাবো, তার আগে নয়। আর আমারও তো শরীর-গতিক আছে! সারারাত তো আমিও ঘুমোতে পারিনি। আমার মাথা টলছে, আমিও আর কিছু ভাবতে পারছি না–
বলে গৃহিণী তার নিজের কাজে চলে গেল।
চৌধুরী মশাই খানিকক্ষণ সেখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর তিনিও বারবাড়ির দিকে এক-পা এক-পা করে এগোতে লাগলেন।
.
এ এক অদ্ভূত পরিস্থিতি সেদিন সমস্ত বাড়িটার মধ্যে সৃষ্টি হলো। কেউ জানলো না কোথায় সংসারের কোন্ কোণে একট ফাটল ধরেছে। সবাই উৎসবের আনন্দে উন্মত্ত। যারা নেমন্তন্ন খেয়ে গেছে তারা খাওয়ার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। যারা বউ-এর মুখ দেখে গেছে তারাও বউ এর রূপের প্রশংসায় মুখর। ঐশ্বর্যের প্রাচুর্যের আর বিলাসের জাঁকজমকের ঝলমলানিই তারা দেখলে। তার অন্তরের দুর্যোগের দুর্দশাটির চেহারা তারা উপলব্ধি করতে পারলে না। ওটা চাপা থাক, ওটাকে পুলটিশ দিয়ে ঢেকে রাখো। তোমার বাইরের ঐশ্বর্যটাই তাদের কাছে সত্যি হোক, কেউ যেন তার দারিদ্রটা না দেখতে পায়। ওটা দেখতে পেলে তোমার সম্মান সমৃদ্ধি আর সম্পদের সৌধটা ভেঙে গুঁড়িয়ে চুরমার হয়ে যাবে। তাহলে কেউ আর তোমায় সেলাম করবে না, কেউ তোমাকে হিংসেও করবে না। অথচ সংসারে তোমাকে কেউ হিংসে না করলে তোমার মাথাই বা উঁচু থাকবে কী করে? তুমি যে তাহলে সাধারণ হয়ে যাবে। একেবারে সাধারণ। আর সাধারণ হয়ে বেঁচে থাকা মানেই তো নিচু হওয়া। অর্থাৎ অন্য সবাইয়ের সমান হওয়া, সকলের সঙ্গে একাকার হওয়া।
