সদানন্দ এ কথার কোনও উত্তর দিলে না।
মা এবার ছেলের আরো কাছে সরে এলো। বললে–কে কী দোষ করলো, তার জন্যে হেনস্তা হবে আমার আর ওই এক ফোঁটা দুধের মেয়ের? এই-ই কি তোর বিধান?
সদানন্দ বললে–তুমি বড় বড় কথা বোল না মা, ও-সব বড় বড় কথায় আমি ভুলবো না, তা জেনে রেখো। আমি যা করবো তা আমি ঠিক করেই রেখেছি–
–কী ঠিক করে রেখেছিস?
–কী ঠিক করেছি তা তুমি দেখতেই পাবে। আমাকে আর জিজ্ঞেস কোর না।
মা বললে–তাহলে তুই কোনও দিনই বউমার ঘরে শুবি নে?
সদানন্দ চুপ করে রইল।
মা আবার জোর দিয়ে জিজ্ঞেস করলে কী রে, উত্তর দিচ্ছিস নে যে? কথা বল, জবাব দে–
সদানন্দর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। তাড়াতাড়ি ডান হাত দিয়ে সেটা মুছে নিতে যাচ্ছিল, মা সঙ্গে সঙ্গে হাতটা ধরে ফেলেছে।
বললে–তুই আমার কাছে লুকোচ্ছিস? ভেবেছিস আমার কাছে মনের কথা লুকিয়ে তুই পার পাবি? তাহলে কেন আমি তোর মা হয়েছিলুম? কেন আমি তোকে দশমাস দশ দিন পেটে ধরেছিলুম? তোর জেদটাই বড় হবে রে, আর আমি কেউ নই? আমার কথার কোনও দাম নেই তোর কাছে? এই-ই তোর বিচার?
সদানন্দ মার কথা শুনতে শুনতে আর থাকতে পারলে না। দেখলে মার চোখ দিয়েও জল পড়ছে। সদানন্দ মার দিকে চেয়ে বললে–মা….
মা বলে উঠলো–না, আমি তোর মা নই। আজ থেকে আমি তোর কেউ নই, আমাকে তুই এখন থেকে আর মা বলে ডাকিস নে—যা–
বলে প্রীতি এক-পা পিছিয়ে গেল। সদানন্দ মার দিকে এগিয়ে গেল। বললে–মা–
প্রীতি বললেন, আমাকে তুই মা বলে আর ডাকিস নে, আমার ঘর থেকে তুই বেরিয়ে যা। আমি আর তোর মুখ দেখতে চাই নে–যা, বেরিয়ে যা–
সদানন্দ তবু মার দিকে এগিয়ে গেল। বললে–মা, তুমি আমার ওপর রাগ কোর না, আমার কথা শোন–
–তোর কোনও কথা শুনতে চাই নে, তুই আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যা—
এবার সদানন্দ মা’র সামনে গিয়ে মাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলে। বললে–মা, তুমি আমার কথা শোন মা, আমার কথাগুলো শোন
মা ছেলের হাত দুটো ধরে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করতে লাগলো। বললে–না, তুই চলে যা আমার সামনে থেকে, চলে যা–আমি তোর মুখ দেখতে চাই নে–
সদানন্দ বললে–না না, তুমি আমার ওপর রাগ কোর না, তুমি আমার দিকটা মোটে ভেবে দেখছ না। শুধু তোমাদের দিকটাই দেখছে। কিন্তু আমি কী করবো বলো তো, আমি কী করবো তুমি বলে দাও, আমি যে আর পারছি না–
মা বললে–কেন, কী হয়েছে তোর?
সদানন্দ বললে–কী হয়নি আমার, তাই আমাকে জিজ্ঞেস করো! আমি তোমাদের এই পাপের সংসারে কী করে থাকবো! কী করে তোমাদের সঙ্গে আমি মানিয়ে চলবো তাই শুধু আমি ভাবছি। আমার যে বুক ফেটে যাচ্ছে মা, সেটা তুমি দেখতে পাচ্ছো না?
–কেন? কীসের জন্যে তোর বুক ফেটে যাচ্ছে?
সদানন্দ বললে–তুমি তো বাড়ির ভেতরে থাকো, তুমি সেসব কথা জানবে কী করে? কপিল পায়রাপোড়াকে জানো? মানিক ঘোষকে জানো? ফটিক প্রামাণিক? কত লোকের নাম জানো তুমি? তারপরে এই কালীগঞ্জের বউ? মা, তুমি কেবল আমার নামেই দোষ দিতে পারো, আর কই, এতকাল ধরে যে এ বাড়িতে এত অন্যায় চলে আসছে, তার বিরুদ্ধে তো তোমরা কিছুই বলোনি?
মা বললে–তা ওসব কথা নিয়ে তুই অত মাথা ঘামাস কেন? ওসব নিয়ে তোর ভাববার দরকারই বা কী? ওসব ব্যাপারে তুই কানে তুলো দিয়ে রাখলেই পারিস–
সদানন্দ বললে–তা আমি যদি মাথা না ঘামাই তো ওরা কি এমনি করেই মরে যাবে? কেউ ওদের দেখবে না?
বাইরে থেকে ডাক এল হঠাৎ–ও বউদি, বউদি–
মা বললে–ওই তোর গৌরী পিসী ডাকছে। আমি যাই, কাজের বাড়ি, তোর সঙ্গে এতক্ষণ ধরে আমার কথা বলবার কি সময় আছে! যাই, আমি বাইরে যাই–
বলে একটু থেমে ছেলের দিকে চেয়ে বললে–তাহলে এবার থেকে আমার কথা শুনবি তো?
কিন্তু বাইরে থেকে আবার দরজা ঠেলার শব্দ–ও বউদি, বউদি–
প্রীতি দরজা খুলে দিতেই গৌরী পিসী বললে–কী করছিলে বউদি ঘরের ভেতর? তারপর সদানন্দকে দেখে আর কিছু বললে না। সদানন্দ খোলা দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। সদানন্দ চলে যেতেই গৌরী বললে–খবর শুনেছ?
–কী খবর?
গৌরী গলা নিচু করে বললে–বউমার বাপের বাড়ি থেকে লোক এসেছে–
–কেন? এই তো কাল বিকেলেই ফুলশয্যের তত্ত্ব নিয়ে লোক এসেছিল। এই সাত সকালে আবার কী হলো?
গৌরী বললে–সব্বনাশ হয়েছে বউদি, খারাপ খবর নিয়ে এসেছে কেষ্টনগরের লোক–
–কী খারাপ খবর?
–বউমার মা’র নাকি খুব অসুখ।
–অসুখ? বউমাকে নিতে এসেছে নাকি? দেখ দিকিনি, কী কাণ্ড! তুই ওঘরে গিয়ে দেখেছিলি? বউমা কী করছে?
গৌরী বললে–আমি এ খবর দিতে পারবো না বাপু বউমাকে। তুমি দাও গে—
প্রীতি বললে–তা ছোট মশাই কোথায়? ছোট মশাই জানে?
–ছোট মশাই-এর কাছে তো বউমার বাপের বাড়ির লোক চিঠি নিয়ে দিয়েছে। বউমার বাপ নাকি চিঠিতে সব কথা লিখেছে–
প্রীতির মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়লো। সারারাত এত কাণ্ডের পর প্রাণকৃষ্ণ সা’ মশাই এসে হাজির হয়েছে বউ দেখবে বলে। তাঁকে বসিয়ে রাখা হয়েছে এতক্ষণ। এরপর বউমাকে মুখ-হাত পা ধুইয়ে সাজিয়ে গুজিয়ে সা’ মশাইকে দেখাতে হবে। এরই মধ্যে আবার বেয়ানের কিনা অসুখ! অসুখের কি সময় অসময় নেই গো? আর অসুখই যদি হলো তো এখনি সে খবর পাঠাতে হয়। একদিন পরে খবর পাঠালে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত? এই সবে ফুলশয্যের রাত কাটলো, এখনও বাসি মুখে জল পড়েনি, এর মধ্যে খবরটাই বা বউমাকে দেওয়া যায় কী করে? হয়ত কেঁদে-কেটে একসা করবে।
