ওপরে কর্তাবাবুর ঘরে তখন প্রাণকৃষ্ণ সা মশাই বেশ আসর জাঁকিয়ে বসেছে। নাতির বিয়েটা দিয়ে দিয়েছেন বলে খুব বাহবা দিচ্ছে কর্তাবাবুকে। বলছে–খুব ভাল কাজ করলেন কর্তাবাবু, একটা কাজের মত কাজ করে গেলেন–
কর্তাবাবু বললেন–আমার তো এই একটা কাজই বাকি ছিল, এবার রাস্তা ক্লিয়ার হয়ে গেল, এখন যেতে পারলেই হয়–
প্রাণকৃষ্ণ সা বললে–ওকথা বলবেন না কর্তাবাবু, নাতির তো এই সবে বিয়ে হলো, এখন তার ছেলে হোক, অন্নপ্রাশন হোক, আমরা পাত পেড়ে ভোজ খাই, তবে তো…
প্রাণকৃষ্ণ সা’র সঙ্গে কর্তাবাবুর পুরোন সম্পর্ক! সম্পর্কটা লেনদেনের হলেও কালক্রমে সেটা বন্ধুত্বের বন্ধনে নিবিড় হয়েছে। তাকে চৌধুরী বংশ সহজে অস্বীকার করতে পারে না। তাই তার অত্যাচার সহ্য করতে হয় এদের মুখ বুঁজে।
ততক্ষণে চৌধুরী মশাই এসে গেলেন।
বললেন–আপনি কাল আসেননি, তাই খুব ভাবছিলুম—
প্রাণকৃষ্ণ সা বললে–তা শুভ কাজ নির্বিঘ্নে মিটে গেছে তো, তাহলেই হলো বাবাজী…
কর্তাবাবুও তাই বললেন। বললেন–হ্যাঁ, আমার বড় উদ্বেগ ছিল সা মশাই। আমার নাতি যেমন বেয়াড়া, ভেবেছিলুম একটা কাণ্ড না আবার বাধিয়ে বসে। আজকালকার ছেলে ছোকরা তো আর আমাদের মত নয়, এরা সব অন্য রকম!
চৌধুরী মশাই কথার মাঝখানে বললেন–আপনাকে একটু অপেক্ষা করতে হবে কিন্তু, বউমা আমার সবে ঘুম থেকে উঠেছে তো, একটু মুখ-হাত-পা ধুয়ে তৈরি হয়ে নেবেন–
প্রাণকৃষ্ণ সা মশাই বললে–না, না, তার জন্যে ব্যস্ত হতে হবে না, আমার তাড়া নেই, আমি ততক্ষণ গল্প করছি–
কিন্তু ওদিকে সদানন্দ তখনও মার সামনে কাঠের পুতুলের মত দাঁড়িয়ে আছে।
মা বললে–কই, বল কী হয়েছে তোর, বল–
সদানন্দ এতক্ষণে আবার কথা বলে উঠলো। বললে–কেন তুমি বারবার এক কথা জিজ্ঞেস করছো, বলো তো?
মা বললে–তা তুই কেন বউমার কাছে শুবি নে তা বলবি তো?
সদানন্দ বললে–আমি তো বলেছি
–কী বলেছিস?
–আমি তো বলেছি তুমি বার বার ওকথা জিজ্ঞেস কোরনা আমাকে। আমি বলবো না।
মা বললে–তা আমাকে না বলিস, তুই বউমাকে বল্! বউমার সঙ্গে তুই একবার কথা বল্ গিয়ে। সে বেচারি কাল রাত তিনটের সময় ভয় পেয়ে আমাকে ডাকতে এসেছে, আমি গিয়ে তখন তার পাশে শুই, তবে বেচারি একটু ঘুমোতে পারে। জানিস আমাকে জড়িয়ে ধরে কী কাঁদাটা সে কেঁদেছে! তাকে আমি কী বোঝাই বল তো? বল, তাকে আমি কী বলে বোঝাব?
–তুমি কী বোঝাবে তা আমি কী করে জানবো?
–তুই যদি তা না জানবি তো ঘর থেকে পালিয়ে গেলি কেন? বউমা তোর কাছে কী দোষ করলো?
সদানন্দ বললে–তা আমি তো তোমাদের আগেই বলেছিলুম আমি বিয়ে করবো না!
মা বলে উঠলো–তা বিয়ে করবিই বা না কেন? বিয়ে কে না করে শুনি?
সদানন্দ বললে–তুমি সব কথা জানো না মা। তুমি যা জানো না তা নিয়ে কথা বলতে এসো না।
মা এবার ছেলের মুখের দিকে অনেকক্ষণ সোজাসুজি চেয়ে রইল। যেন কী একটা আতঙ্ক জেগে উঠলো মনে। বললে–তুই তাহলে কি কোনও দিনই বউমার কাছে শুবি নে নাকি?
সদানন্দ বললে–না–
–তাহলে পরের মেয়েকে বাড়িতে এনে তুই এত কষ্ট দিবি?
–তা সেজন্যে তো আমি দায়ী নই।
–কিন্তু সে বেচারি তাহলে এখানে কী করবে? সে এমন কী পাপ করলে যে তাকে তুই এমন শাস্তি দিবি? তোর ধর্ম বলেও কি কিছু নেই? দয়া মায়া ভগবান–কিছুই তুই মানবি নে? তুই তার দিকটা একটু ভেবে দেখবি নে? তার কথা না ভাবলেও আমাদের কথাও কি তুই একবার ভাববি নে? আমরাই বা লোকের কাছে কুটুমদের কাছে মুখ দেখাবো কী করে? চিরকাল তো আর এ-কথা চাপা থাকবে না, একদিন না একদিন তো এ দশ কান হবেই, তখন?
সদানন্দ বলে উঠলো–তা এসব কথা তোমরা আগে ভাবোনি কেন? যখন কালীগঞ্জের বউকে দাদু টাকা দিলে না, তখন এসব কথা কেন একবার ভাবলে না? যখন দাদু তাকে খুন করে মারলে তখনও তো কেউ একটা কথা পর্যন্ত বললে না তোমরা!
মা ছেলেকে চুপ করিয়ে দিলে। বললে–তুই আস্তে কথা বল বাবা, একটু আস্তে, বাইরের সবাই শুনতে পাবে
সদানন্দ আরো চেঁচিয়ে উঠলো–কেন, চুপ করে থাকলেই কি চিরকাল সব চাপা থাকবে তুমি বলতে চাও?
মা বললে–তোর দেখছি মাথা খারাপ হয়ে গেছে। চল, আমার সঙ্গে চল্, বউমার কাছে গিয়ে তুই এই কথাগুলো বলবি চ!
সদানন্দ বললে–কেন, বউমার কাছে আমি যাবো কেন? তোমরা তাকে বউ করে নিয়ে এসেছ, তোমরাই তার সঙ্গে ঘর করো, আমাকে ছেড়ে দাও, আমাকে ওর মধ্যে টেনো না
–পাগলামি করিস নে, আয় আমার সঙ্গে আয়—
বলে ছেলেকে হাত ধরে টানতে লাগলো প্রীতি।
সদানন্দ জোর করে হাত ছাড়িয়ে নিলে। বললে–তুমি কি আমাকে এতদিনেও চিনলে না? ভেবেছ তুমি হাত ধরে টানলেই আমি যাবো? আমি ছেলেমানুষ?
–তা তুই না যাস আমি বরং বউমাকে ডেকে তোর কাছে নিয়ে আসছি, তার কাছেই সব কথা পরিষ্কার হয়ে যাক।
সদানন্দ ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করতেই মা খপ করে তার হাতখানা ধরে ফেললে। বললে–কোথায় যাচ্ছিস?
সদানন্দ বললে–কোথায় যাচ্ছি তার কৈফিয়ৎ আমি তোমাকে দিতে বাধ্য নই–
মা বললে–তা আমাকে যদি না-ই বলিস তো বউমাকে বলে যা! বউমাকে বলে যা কেন তুই তার ঘরে থাকবি না! আমার দায়িত্বটা অন্তত কাটুক। আমি অন্তত মুক্তি পাই। তোরা দু’জনে নিজেদের মধ্যে যা ইচ্ছে বোঝাপড়া করে নে, আমি কেন মাঝখানে থেকে পাপের ভাগী হই?
