এবার চৌধুরী মশাই উঠলেন। উঠে সদানন্দর কাছে এলেন। তারপর বললেন–চলো, ভেতর বাড়িতে তোমার মার কাছে চলো, তোমার সঙ্গে কথা আছে–
বলে সদানন্দকে হাতে ধরে চণ্ডীমণ্ডপের বাইরে নিয়ে এলেন। বাইরে তখন বেশ স্পষ্ট সকাল হয়েছে। বিয়েবাড়ির লোকজন তখন এক-এক করে জেগে উঠেছে। তাদের সকলের দৃষ্টির সামনে দিয়ে একবারে সোজা তাকে ভেতর বাড়িতে নিয়ে এলেন। সেখানে মেয়েদের আনাগোনা। তখন তারাও উঠেছে ঘুম থেকে। চারদিক অগোছালো। চৌধুরী মশাই-এর পেছন-পেছন সদানন্দ যাচ্ছিল। অনেকেই ছোটবাবুকে দেখে ঘোমটা টেনে সামনে থেকে সরে গেল।
রাত্রে ভাল করে ঘুম হয়নি, তাই প্রীতি ভোরবেলাতেই তৈরি হয়ে নিয়েছিল। রাত তিনটের সময় সবেমাত্র একটু দু’চোখ জুড়ে এসেছিল এমন সময় ওই দুর্যোগ। মনটাও বিষিয়ে ছিল তার পর থেকে। নতুনবউ এর কাছে মুখ দেখাতেও যেন লজ্জা হচ্ছিল তার। ছেলে ফুলশয্যার রাতে বউ-এর সঙ্গে একঘরে শোয়নি, এ লজ্জা যেন ছেলেরও নয় বউ এরও নয়, এ লজ্জা যেন শাশুড়ীরই নিজের। অথচ এমন এক ঘটনা যা বাইরের লোককে বলাও যাবে না। যা বলে কারোর কাছ থেকে সহানুভূতিও পাওয়া যাবে না। নিজের মনে মনে জিনিসটাকে পুষে রেখে তুষের আগুনে জ্বলতে হবে।
হঠাৎ কর্তাকে সেই অসময়ে ঘরে আসতে দেখে প্রীতি অবাক হয়ে গেল। বললে–কী হলো, খোকার খোঁজ পেয়েছ?
কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই দেখলে, পেছনে খোকাও রয়েছে।
চৌধুরী মশাই সদানন্দকে ঘরে ঢুকিয়ে নিয়ে দরজার পাল্লা দুটো ভেজিয়ে দিলেন।
বললেন–এই তো খোকাকে সঙ্গে করে নিয়ে এলুম তোমার কাছে—
সদানন্দ তখন অপরাধীর মত মা’র সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
চৌধুরী মশাই বললেন–আমি ওকে অনেক কথা জিজ্ঞেস করেছি, তবু কোনও কথার জবাব দিচ্ছে না, দেখ, তুমি যদি কিছু কথা আদায় করতে পারো–
প্রীতি ছেলের মুখের দিকে সোজাসুজি চোখ রেখে বললে–হ্যাঁ রে খোকা, কোথায় ছিলি তুই সারারাত?
চৌধুরী মশাই বললেন–আমি ওকে সেই কথাই জিজ্ঞেস করেছি। সমস্ত রাত বাইরে বাইরে কাটালো, অথচ নতুন বউমা, সে বেচারি নতুন জায়গায় ভয়ে কেঁপে অস্থির–সে কী দোষ করলে?
প্রীতি ছেলের কাঁধে হাত দিয়ে সান্ত্বনা দিতে চাইলে। বললে–কী হয়েছিল তোর বল্ তো বাবা? বউমাকে পছন্দ হয়নি? আমাকে সত্যি করে মন খুলে বল, কী হয়েছিল তোর, বল কী হয়েছিল তোর? আমি কাউকে কিছু বলবো না। আমাদের কাছে বলতে তোর কীসের আপত্তি? আমাকে তো তুই আগে সব বলতিস, এখন তোর কী হলো যে আমাকে একবারও কিছু বললি না–না আমি তোর পর? তুই কি আমাদের পর মনে করিস?
সদানন্দ তখনও চুপ।
চৌধুরী মশাই বলতে লাগলেন–গায়ে-হলুদের সময় তুই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেলি, ভাবলুম বিয়ের পর সব মিটে-টিটে যাবে। তারপর থানা-পুলিস কত কী হলো। তাও তো একরকম করে সব মিটলো, এখন পরের মেয়ে এ বাড়িতে এসেছে, সে বেচারি কী ভাবছে বল্ দিকিনি
মা ছেলের দিকে চেয়ে বললে–কী রে, কথা বলছিস নে যে? বাড়িত এখন এত লোকজন এসেছে, এদের কানে যদি কথাটা যায় তো তারাই বা কী ভাববে বল্ দিকিনি।
এতক্ষণে সদানন্দর মুখ দিয়ে কথা বেরোল।
বললে–মা…
কিন্তু কথা বলতে গিয়েও যেন সব কথা তার মুখের মধ্যে আটকে গেল।
মা বললে–কী রে, কী বলছিলি বল্, থামলি কেন?
সদানন্দ এবার মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎ বাইরে থেকে কৈলাস গোমস্তার গলা শোনা গেল—ছোটবাবু—
গৃহিণী বললে–ওই, গোমস্তা মশাই তোমাকে ডাকছে, যাও—
কিন্তু এই অবস্থায় চৌধুরী মশাই-এর ঘর থেকে চলে যাবার ইচ্ছে ছিল না।
চৌধুরী মশাই দরজা খুলে বাইরে আসতেই গোমস্তা মশাই বললে–রেলবাজার থেকে প্রাণকৃষ্ণ সা মশাই এসেছেন–
প্রাণকৃষ্ণ সা! প্রাণকৃষ্ণ সা রেলবাজারের আড়তদার মানুষ। মহাজনও বটে। টাকার দরকার হলে চৌধুরী মশাইকে ওই প্রাণকৃষ্ণ সা’র কাছেই হাত পাততে হয়।
জিজ্ঞেস করলেন–তা তিনি এই অসময়ে কেন?
কৈলাস বললে– কাল সন্ধেবেলা বউভাতে আসতে পারেননি, এখন এসেছে, বউমার মুখ দেখবেন।
চৌধুরী মশাই বিরক্ত হলেন মনে মনে। ঘরের ভেতর ঢুকে গৃহিণীকে বললেন–দেখেছ আক্কেলখানা! এই অসময়ে প্রাণকেষ্ট সা এসে হাজির, নতুন বউ-এর মুখ দেখবে! মুখ দেখবার আর সময় পেলে না! এখন কী করি বলো দিকিনি!
গৃহিণী বললেন–তা এসেছেন যখন তখন তো আর ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু একটু বসতে বলো গে। বউমা এখন ঘুমোচ্ছে, বউমা উঠবে, উঠে মুখ হাত ধোবে, তারপর সাজিয়ে-গুছিয়ে তবে বউ দেখাবো–তার আগে নয়–
চৌধুরী মশাই বিরক্ত হলেন। নিজের মনেই বললেন–আড়তদার মানুষ তো, তাই আক্কেলের মাথা খেয়ে বসে আছে একেবারে। সাত-সকালে বউ দেখতে চাইলেই অমনি দেখানো যায়! এখনও কারো বাসি কাপড় ছাড়া হয়নি–
আবার বাইরে এসে কৈলাসকে বললেন–সা মশাইকে বসিয়েছো তো!
–আজ্ঞে, তিনি তো কর্তাবাবুর কাছে বসে আছেন। কর্তাবাবুই আপনাকে ডাকতে পাঠালেন।
চৌধুরী মশাই বললেন–আচ্ছা ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি–তুমি যাও–
সেখানেও কিছু লোকজন বসে আছে। তারা প্রাত্যহিক প্রয়োজনে আসে। হুকুম নেয় ছোটবাবুর কাছে। কোথায় কোন্ জমিতে লাঙল দিতে হবে, কোন্ জমির সর্ষে কাটতে হবে; কোন্ ক্ষেতের বেড়া বাঁধতে হবে–সব নির্দেশ ছোটবাবু সকালবেলাই দিয়ে দেন। তারপর আছে মজুরি দেওয়ার কাজ। রোজকার মজুরিটা ছোটবাবু রোজই দিয়ে দেন। ওটা পড়ে থাকে না। তার ওপর আছে উকিল-মুহুরি-মোক্তারের আনাগোনা।
