সদানন্দ বললে–এখন ও-সব কথা ভাল লাগছে না প্রকাশ মামা, পরে সব বলবো–
বলে অন্যদিকে চলে যাচ্ছিল, কিন্তু প্রকাশ মামা ছাড়লে না। বললে–ওরে শয়তান, আজ আমি পর হয়ে গেলুম, না? অথচ আমিই এত কাঠ-খড় পুড়িয়ে তোর বিয়ে দিয়ে নিয়ে এলুম, আর আজ আমি কেউ নয়! বেইমান তুই, জাত বেইমান–
কিন্তু কথার মধ্যেখানে বাধা পড়লো। ওদিক থেকে চৌধুরী মশাই যাচ্ছিলেন। হঠাৎ সদানন্দকে দেখে এগিয়ে এলেন।
বললেন–খোকা, তুমি একবার ভেতরে আমার সঙ্গে দেখা করো তো—
বলে আর দাঁড়ালেন না। সোজা যেদিকে যাচ্ছিলেন সেই দিকেই চলতে লাগলেন।
সদানন্দও তাঁর পেছনে-পেছনে সেই দিকে চলতে লাগলো।
.
মনে আছে সেদিন সদানন্দ বাবার সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমে একটু আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিল। চৌধুরী মশাই সোজা গিয়ে উঠলেন তাঁর চন্ডীমন্ডপে। আসলে কর্তাবাবু যেদিন পঙ্গু হয়ে পড়েছিলেন সেইদিন থেকেই তিনি নিজের আসন করে নিয়েছিলেন ওইখানে। ওইখানে বসেই তিনি ক্ষেতের কাজকর্ম পরিচালনা করতেন। সেই যে সকালবেলা গিয়ে সেখানে বসতেন, তখন থেকে বেলা একটা দুটো পর্যন্ত তাঁর ওই চণ্ডীমণ্ডপে কাটতো। এক-এক করে সবাই আসতো নানান কাজে। তিনি চাইতেন তাঁর সঙ্গে খোকাও ওখানে বসুক, তাঁর কাজ কর্ম আস্তে আস্তে দেখেশুনে নিক। তিনি থাকতে থাকতে ছেলে তাঁর কাছে সব কিছু কাজ-কর্ম শিখে নিক।
কিন্তু ছেলের মতিগতি তাঁর ভালো লাগতো না কোনও দিনই। বাপের কথা ছেলে অমান্য করত না বটে, কিন্তু তেমন মান্যও ঠিক করতো না যেন। যেন কাজকর্ম না করতে হলেই সে বেঁচে যেত।
কীর্তিপদবাবু জামাইকে বলতেন–এখন থেকে তোমার ছেলেকে সব কিছু বুঝিয়ে টুঝিয়ে দিচ্ছ তো বাবাজী?
জামাই বলতো–আমি তো বুঝিয়েই দিতে চাই, কিন্তু তার তো এসব দিকে একেবারেই মন নেই–
শ্বশুর বলতেন–এ-বয়সে মন তো থাকবেই না, আমারও ছিল না। আমার বাবা আমাকে কত বুঝিয়েছেন, তখন ওসব ভালো লাগতো না, কিন্তু পরে তাই নিয়েই তো মেতে আছি। এখন ও ছাড়া আর কিছু বুঝিই না–
কিন্তু আজ মনে হলো এবার আর দেরি নয়। যে ছেলে বিয়ের দিনে এই কাণ্ড করতে পারে সে বড় সাধারণ ছেলে নয়। তাকে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার যে জীবন ছেলেখেলার জিনিস নয়। শুধু লেখাপড়া আর আড্ডা দিয়ে বেড়ালে আর যাই চলুক সংসার চলে না। সংসার মানে দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া।
চণ্ডীমণ্ডপের মধ্যে একটা তক্তপোশ পাতা ছিল। তার ওপরে মাদুর পাতা। মাদুরের ওপর সামনের দিকে একটা কাঠের ক্যাশবাক্স। চৌধুরী মশাই সেই ক্যাশবাক্সের পেছনে গিয়ে বসলেন। তারপর ছেলের দিকে চেয়ে বললেন–বোস–
সদানন্দ বসলো না। তেমনি আড়ষ্ট হয়েই দাঁড়িয়ে রইলো।
–কই, বসলে না যে! বোস! তোমার কানে কি কথা যাচ্ছে না?
সদানন্দ এবার তক্তাপোশের ওপরেই পা ঝুলিয়ে বসলো।
কাল রাত্রেই চৌধুরী মশাই কথাগুলো ভেবে রেখেছিলেন। সেই রাত তিনটের সময়। গৃহিণী যখন বউমার ঘরে চলে গিয়েছিল। অনেক ভেবে-চিন্তে ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। অবশ্য বিয়ে তিনিও একদিন করেছিলেন। জীবনে বিয়ে করার কী মর্ম তা তিনি জানেন। মর্মও যেমন জানেন তেমনি তার সঙ্গে দায়িত্বের কথাটাও তিনি কখনও হালকা করে দেখেননি। কর্তাবাবুর মত তিনিও একদিন বুড়ো হয়ে যাবেন। তখন হয়ত ঠিক তাঁরই মত পঙ্গু হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে থাকবেন। তখন এই খোকাই এসে এই চণ্ডীমণ্ডপে বসে দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যাবে। কিন্তু যে ফুলশয্যার রাতে এইরকম কাণ্ড করতে পারে তার ওপর কতটা নির্ভর করা যায়।
হঠাৎ তাঁর মুখ দিয়ে আসল প্রশ্নটা বেরোল। বললেন–কোথায় ছিলে সমস্ত রাত?
সদানন্দও জবাব দিতে দেরি করলে না। বললে–বাইরে—
চৌধুরী মশাই থমকে রইলেন। জিজ্ঞেস করলেন–বাইরে মানে?
সদানন্দ বললে–বাইরে-মানে বাইরে। আমি বাড়িতে ছিলুম না সারারাত–
আরো অবাক হয়ে গেলেন চৌধুরী মশাই। তাঁর মুখের সামনে এমন করে তো কখনও আগে কথা বলেনি খোকা! হঠাৎ এত সাহস পেলে সে কোথা থেকে?
বললেন–তুমি জানো যে বাড়ির বাইরে থাকা এবাড়ির নিয়ম নয়! আর শুধু এবাড়ি কেন, কোন বাড়িতেই নিয়ম নেই বাড়ির ছেলে রাত্রে বাইরে রাত কাটাবে। কাটালে নিন্দে হয়, দশজনে দশ কথা বলে–
সদানন্দ উঠে দাঁড়ালো। বললে–আপনি কি আমাকে এই কথা বলতেই এখানে ডেকে এনেছেন?
সদানন্দর হাব-ভাব দেখে চৌধুরী মশাই তাজ্জব হয়ে চেয়ে রইলেন ছেলের দিকে। খানিক পরে বললেন–কেন, তোমাকে এখানে ডেকে এনে এই কথা বলা কি আমার অন্যায় হয়েছে?
সদানন্দ বললে–ন্যায়-অন্যায়ের কথা আপনারা তুলবেন না। কাকে ন্যায় বলে আর কাকে অন্যায় বলে তা আমি ভালো করেই জানি। আমি কি এখন যেতে পারি?
চৌধুরী মশাই বললেন–তুমি উঠে দাঁড়ালে কেন, বোস না–
সদানন্দ বললে, আমি এখানে বসব না। যা শোনবার আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শুনতে পারবো
চৌধুরী মশাই বললেন–তাহলে বলো তুমি কেন এরকম করলে? বউমা তোমার কাছে কী অপরাধ করেছে? আর আমি আর তোমার মা, আমরাই বা তোমার কাছে কী অপরাধ করলুম যে দশের কাছে তুমি আমাদের বে-ইজ্জত করতে চাও! আমাদের বংশমর্যাদা, কোনও কিছুর কথাই কি তুমি ভাববে না?
সদানন্দ কথা না বলে চুপ করে রইল।
–কথা বলছো না যে, একটা কিছু জবাব দাও—
তবু সদানন্দ কিছু কথা বললে না। তেমনি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।
