প্রীতি আর শব্দ না করে টিপি টিপি পায়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল। তারপর আস্তে আস্তে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে আবার নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো। বারান্দার ওপর তখনও মানুষ-জন গড়া গড়া শুয়ে আছে। তখনও যেন তাদের কাছে গভীর রাত।
কিন্তু সকলের আগে উঠেছে প্রকাশ মামা। প্রকাশ মামার ঘুম থেকে উঠেই চা খাওয়ার রোগ আছে। ঘুম থেকে উঠে সেইটেই তার প্রধান কাজ। বৃষ্টি হোক, ঝড় হোক, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প, যা কিছু হোক, ওটি তার প্রথমেই চাই।
আগের রাতে শেষ নিমন্ত্রিত ব্যক্তিটি চলে না-যাওয়া পর্যন্ত প্রকাশ মামার শান্তি ছিল। সকলকে নিজে দাঁড়িয়ে খাইয়েছে প্রকাশ মামা। জোর-জবরদস্তি করে পেট ভরে সকলকে খাইয়েছে। যে দশখানা লুচির বেশি খেতে পারবে না, তাকে জোর-দবরদস্তি করে তিরিশ-চল্লিশখানা লুচি খাইয়েছে। মনে মনে সবাই বাহবা দিয়েছে শালাবাবুকে। হ্যাঁ, কেউ বলতে পারবে না যে সদানন্দর বিয়েতে ভালো করে খাতির-যত্ন হয়নি, পেট ভরে খেতে পায়নি। গাঁ-গঞ্জে এই-ই নিয়ম। বিয়ে বাড়ির এমন খাওয়া বছরে ক্বচিৎ কদাচিৎ কপালে জোটে। চাষাভুষোদের বিয়েবাড়িতে সাধারণত চিড়ের ফলারের বন্দোবস্ত।
প্রকাশ মামা কোথায় ছিল কেউ জানে না। চোখ মেলেই চেঁচিয়ে উঠলো–কই রে, চা হয়েছে?
কিন্তু কথাটা বলেই বুঝলো আজকে শালাবাবুর হুকুম তামিল করবার কেউ নেই আশেপাশে। আজকে সবাই ঘুমোচ্ছে। কালকের খাটুনির পর সকলেরই গায়ে-গতরে ব্যথা হয়ে বিছানায় গড়াচ্ছে। কিন্তু তা বললে তো নেশা শুনবে না। নেশার রসদ যোগাতেই হবে।
আস্তে আস্তে আড়ামোড়া খেয়ে প্রকাশ মামা উঠলো। উঠে একবার রান্নাবাড়ির দিকে গেল। কিন্তু সেদিকে সব ভোঁ-ভোঁ। কারোর টিকির পাত্তা নেই। একেবার পুকুরপাড়ের দিকে গেল। সেখানেই কালকে ভিয়েন চড়েছিল। মোটা-মোটা কাঠগুলো পুড়ে কাঠকয়লা হয়ে রয়েছে। কিন্তু ঠাকুর-চাকরদের কারো দেখা নেই। ঘুমোতে যেতে সেই রাত একটা বেজে গিয়েছিল কাল।
হঠাৎ একটা চেনা লোকের মুখ দেখেই খুশীতে লাফিতে উঠলো। লোকটা মাঠের দিক থেকে আসছিল।
প্রকাশ মামা তাকেই ধরলো–এই যে হে, উঠেছ? কী নাম যেন তোমার?
–আজ্ঞে বিন্দাবন?
–বৃন্দাবন! বেশ বেশ! বেশ নাম তোমার! চা খেয়েছো তুমি?
–আজ্ঞে চা আমি খাইনে।
প্রকাশ মামা যেন একটু হতাশ হলো কথাটা শুনে। বললে–চা খাও না? তা না-ই বা খেলে, চা তৈরি করতে পারো তো?
–আজ্ঞে, তা পারি।
–ভেরি গুড। চা এক বাটি তৈরি করো দিকিনি।
লোকটা জানতো শালাবাবুর হাতেই সব ক্ষমতা। মজুরি নেবার সময় এই শালাবাবুকেই ধরতে হবে। তখন চায়ের কথাটা মনে থাকবে। প্রকাশ মামা বললে–বেশ কড়া করে বানাবে, বুঝলে? দুধ-ফুদ যদি না পাও তো ক্ষতি নেই, রংটা যেন লঙ্কার মত লাল হয়। এই চায়ের জন্যে মাঠে যেতে পারছি না, সব আটকে গেছে, পেট-টেট সব বোম্ মেরে আছে–
লোকটা অদ্ভুত করিতকর্মা বটে! কোথা থেকে কাকে ধরে চা, দুধ, চিনি যোগাড় করে নিয়ে এল। তারপর কাঠকয়লার আগুন ধরিয়ে তার ওপর জল চড়িয়ে দিলে।
প্রকাশ মামা বললে–দুবাটির মত জল দাও, আমি খাবো, আর আমার পিসেমশাই খাবে। পিসেমশাইকে চেনো তো? ওই যে বরের দাদামশাই, ওঁকেও এক বাটি দেব। কুটুম মানুষ, লজ্জায় চায়ের কথা মুখ ফুটে বলতে পারবেন না। তবে আমার ও-সব লজ্জা-ফজ্জা নেই ভাই, আমি দিল-খোলা মানুষ। খাওয়ার ব্যাপারে লজ্জা-সরম করি নে; পেট হচ্ছে সকলের চেয়ে বড়, জানো বৃন্দাবন। পেটের জন্যেই দুনিয়া চলছে। আরো বড় একটা জিনিস আছে অবিশ্যি, কিন্তু পেট তার চেয়েও বড়। সেটা না হলেও চলে, কিন্তু পেট তো না হলে চলে না–
বৃন্দাবন জল গরম করছে আর প্রকাশ মামা উনুনের সামনে তাই দেখছে। হঠাৎ সদরের দিকে চেয়ে অবাক হয়ে গেল। আরে সদা না! এত ভোরে কোথায় গিয়েছিল!
আর বসা হলো না প্রকাশ মামার। উঠে দাঁড়ালো। সদানন্দ ভেতরের দিকেই ঢুকছিল। প্রকাশ মামাও তার দিকে যেতে লাগলো।
একেবারে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে কী রে, তুই? আজ এত সকালে উঠে পড়েছিস যে?
সদানন্দর মুখের ভাব দেখে প্রকাশ মামার কেমন সন্দেহ হলো।
বললে–তোর চেহারা ওরকম হলো কেন রে? কী হয়েছে বল তো?
সদানন্দ বললেন, কিছু হয়নি–
প্রকাশ মামা বললে–কিছু না হলেই ভালো। কাল তুই যা ভাবিয়ে তুলেছিলি সকলকে! আমি তো ভেবেছিলাম তুই একটা কিছু কাণ্ড করে বসবি। নতুন বউ বাড়িতে এসেছে। এই সময়ে কিছু করলে কেলেঙ্কারি হয়ে যেত মাইরি। তা যাক শেষ পর্যন্ত তোকে শোবার ঘরে ঢুকিয়ে তবে আমি খেইছি, জানিস! তোর দাদুও তোর জন্যে খুব ভাবনায় পড়েছিল। আমি যখন গিয়ে বললুম যে সদা ঘরে ঢুকে দরজায় খিল দিয়ে দিয়েছে, তখন বুড়ো নিশ্চিন্ত হলো–
তারপর একটু থেমে বললে–তা যাক সে-সব বাজে কথা, রাতটা কেমন কাটালি বল্–কে প্রথম কথা বললে? তুই, না তোর বউ?–
সদানন্দ কোনও জবাব দিলে না।
প্রকাশ মামা তবু পীড়াপীড়ি করতে লাগলো–কী রে? কথার জবাব দিচ্ছিস নে যে? বল না, বল্! আমাকে বলতে তোর লজ্জা কীসের? মাইরি বলছি আমি কাউকে বলবো না। আমাকে বলতে তোর দোষ কীসের? আমি না তোর বিয়ে দিয়ে নিয়ে এলাম, আজ আমার সঙ্গেই তুই বেইমানি করছিস!
সদানন্দ বললে–বলছি তো কিছু বলবার নেই–
–বলবার নেই মানে? তুই কি সারারাত নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়ে কাটিয়েছি নাকি? অ্যাঁ? ছিঃ ছিঃ, তুই দেখছি একটা আস্ত হাঁদারাম! মেয়েটা কী ভাবলে বল্ দিকিনি? বেচারা কতদিন ধরে এই রাতটার দিকে চেয়ে বসে ছিল, আর তুই কিনা সারারাত নাক ডাকিয়ে ঘুমোলি?
