হঠাৎ গৃহিণী এসে ঘরে ঢুকল।
চৌধুরী মশাই সঙ্গে সঙ্গে গৃহিণীর দিকে এগিয়ে গেলেন কী হলো? বউমা কী বললে?
–যা ভেবেছিলাম তাই-ই হয়েছে, খোকা ঘরে নেই।
–ঘরে নেই?
গৃহিনী বললে–হ্যাঁ, বউমার একলা থাকতে ভয় করছিল, তাই আমাকে ডাকতে এসেছিল। আমি যাই বউমার কাছে। তোমাকে তাই বলতে এলুম–
–কিন্তু খোকা গেল কোথায়?
গৃহিণী বললে–তা কী করে ও জানবে? বউমার সঙ্গে খোকার কোনও কথাও হয়নি, ঘরে ঢুকেছে আর সঙ্গে সঙ্গে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে–
–খোকা বেরিয়ে গেল আর বউমা আটকাতে পারলে না?
গৃহিণী বললে–কী যে তুমি বলো! নতুন বউ, এখনও খোকার সঙ্গে একটা কথাও হয়নি, আর খোকাকে আটকাবে? নতুন বউ-এর অত সাহস থাকে? অচেনা জায়গা, অচেনা মানুষ, একেবারে বলতে গেলে প্রথম রাত, এর আগে কোনও দিন একটা কথাও হয়নি, তাকে কী বলে বাধা দেবে? তোমার এত বয়েস হলো আর তুমি এই কথা বলছো? আমার ফুলশয্যার রাতে যদি তুমি অমনি করতে তো আমি তোমাকে বাধা দিতে পারতুম? তা কি কোনও মেয়ে পারে? কী যে তোমার বুদ্ধি
চৌধুরী মশাই বললেন–তাহলে কী হবে?
গৃহিণী বললে–এখন কী হবে তাই-ই ভাবছি। বউমা একেবারে ভেঙে পড়েছে। বেচারী এই রাত তিনটে পর্যন্ত একলা কী করবে ভেবে পায়নি, শুধু ভয়ে কেঁপেছে, শেষকালে আর কোনও উপায় না পেয়ে লজ্জা সরম সব ঠেলে ফেলে আমাকে ডাকতে এসেছে
–তা তুমি কী বলে এলে বউমাকে?
–কী আর বলবো! আর আমারই কি ছাই মাথার ঠিক আছে এখন! প্রথমে খুব বকলুম, কিন্তু শেষে বুঝলুম বউমারই বা কী দোষ! খুব কাঁদছিল, আমি তার মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বসিয়ে রেখে দিয়ে এলুম। এখন যাই, যে রাতটুকু আছে, পাশে গিয়ে শুই, চেষ্টা করে দেখি যদি একটু ঘুম পাড়াতে পারি, তারপর সকাল হলে যা-হয় ঠিক করা যাবে–
চৌধুরী মশাই বললেন–ঠিক আর কী করবে তুমি! খোকা কি আর ফিরে আসবে?
–সে-সব এখন আর ভাবতে পারছি না আমি। আমারও মাথায় সব গোলমাল হয়ে গেছে। আমিও আর দাঁড়াতে পারছি না–
বলে গৃহিণী চলে যাচ্ছিল।
চৌধুরী মশাই পেছন থেকে ডাকলেন। বললেন–আর একটা কথা শোন—
গৃহিনী ফিরলো। বললে–কী?
–দেখ, বউমাকে বলে দিও যেন এ-সব কথা কাউকে না বলে। বাইরের লোক এ-কথা শুনলে নানান কেলেঙ্কারি রটবে। কেষ্টনগরের বেয়াই-বেয়ানের কানেও যেন কথাটা না ওঠে।
গৃহিণী বললে–বউমাকে না হয় বারণ করবো, কিন্তু তোমার ছেলে? তোমার ছেলেই যদি দশজনকে বলে বেড়ায়। আর যদি না–ও বলে তো এ-সব কথা তুমি কদ্দিন চেপে রাখতে পারবে?
চৌধুরী মশাই বললেন–সে পরের কথা পরে ভেবে দেখা যাবে। এখন আজকের কাণ্ডটা যেন দুকান না হয়। তোমার বাবা রয়েছে এখানে, আত্মীয়-কুটুম্ব সবাই এসেছে, এই অবস্থায় বাইরে জানাজানি হওয়া ভালো নয়, তারপর বাবার কানেও যেন না যায় কথাটা, তুমি একটু বউমাকে ভালো করে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বলে দিও–
গৃহিণী বুঝলো কি বুঝলো না তা বোঝা গেল না। তাড়াতাড়ি ঘরের বাইরে চলে গেল। চৌধুরী মশাই তখন ঘরের মধ্যে ছটফট করতে করতে পায়চারি করতে লাগলেন।
নয়নতারা তখনও পাথরের মত ঠাণ্ডা শরীরে বিছানার ওপর কাঠ হয়ে বসে ছিল। শাশুড়ী ঘরে ঢুকেই বললে–ওমা, তুমি এখনও শোওনি? এসো, এসো, শুয়ে পড়ো–বলে নয়নতারাকে পাশে নিয়ে শুইয়ে দিলে। তারপর পায়ের দিকে পাট করে রাখা চাদরটা তার গায়ে ঢাকা দিয়ে নিজেও তার পাশে শুয়ে পড়লো।
বললে–কিছু ভয় নেই বউমা, খোকাকে তুমি ভুল বুঝো না, ও ওইরকম। একটু খেয়ালী ছেলে। আজকে ওইরকম ব্যবহার করলে বটে, কিন্তু দু’এক দিন পরে সব ঠিক হয়ে যাবে–তখন দেখবে ওরকম স্বামী হয় না। আমি ওর মা, তবু আমার সঙ্গে ওই রকম করে। তুমি কিছু ভেবো না বউমা, লক্ষ্মীটি।
বলে প্রীতি নয়নতারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
তারপর আস্তে আস্তে বললে–একটা কথা বউমা, তুমি এসব কথা কাউকে বোল না যেন, আমি সব ঠিক করে দেব। এখনও তো তোমাদের ভালো করে জানাশোনা হয়নি, তাই একটু লজ্জা হয়েছে আমার খোকার। বড় লাজুক ছেলে কিনা আমার সদা-দু’দিন ঘর করলেই বুঝতে পারবে সব। তুমি যেন তোমার বাবা-মাকে এসব কথা কিছু বোল না, বুঝলে–
নয়নতারা বুঝলে না তা ঠিক বোঝা গেল না। বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে রইল। শাশুড়ী তখনও নয়নতারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। রাত তখন শেষ হয়ে আসছে। সমস্ত বিয়েবাড়ি নিস্তব্ধ। বিকেল থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত যে কোলাহল চলছিল-তার চিহ্নমাত্র নেই আর কোথাও। সবাই ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন। দূরে কোন্ পাড়ায় কাদের মুর্গী ডেকে উঠলো। এইবার ভোর হবে। এইবার একে একে আবার সবাই ঘুম ভেঙে উঠবে। আবার ডাক পড়বে প্রীতির। তার আঁচলে বড়-ভাঁড়ারের চাবি। এতগুলো লোক জলখাবার খাবে, কারো দুধ, কারো লুচি, কারো চা, কারো বা চিড়ে-মুড়ি। সকলের সব ফরমাস তামিল করতে হবে একা তাকেই। যেন কেউ না বলতে পারে চৌধুরী মশাই-এর ছেলের বিয়েতে নেমন্তন্ন খেতে এসে পেটই ভরেনি আমাদের।
না, আর দেরি করা নয়। এরপর যদি একটু তন্দ্রা এসে যায় তখন বেলা গড়িয়ে যাবে। তখন জানাজানি হয়ে যাবে যে চৌধুরী মশাই-এর ছেলের ফুলশয্যা হয়নি। ছেলের বদলে শাশুড়ী এসে নতুন বউএর পাশে শুয়ে রাত কাটিয়েছে। আস্তে আস্তে প্রীতি উঠলো। একবার নিচু হয়ে দেখবার চেষ্টা করলে বউমা ঘুমিয়ে পড়েছে কি না। কিন্তু কিছু বোঝা গেল না। বউমা তখনও ঠিক সেই ভাবে বালিশে মুখ গুঁজে স্থির হয়ে শুয়ে আছে।
