নয়নতারা এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
প্রীতি বললে–বলল বউমা, আমার কথার জবাব দাও, তারপর কখন সে বেরিয়ে গেল? তোমার সঙ্গে কী কথা হলো? তুমি কি কিছু বলেছিলে তাকে? কী বলেছিলে?
নয়নতারা কাঁদতে কাঁদতেই বললে–কিছু বলিনি–
–কিছু বলোনি?
–না।
–সে তোমাকে কিছু বলেছিল?
–না।
প্রীতি একটু ভেবে নিলে। তারপর বললে–তোমাদের দু’জনের মধ্যে কোন কিছুই কথা হয়নি?
নয়নতারা বললে–না–
–তোমার গায়ে হাত দিয়েছিল সে?
নয়নতারা হঠাৎ এ-কথার জবাব দিতে পারলে না।
প্রীতি বললে–বলো বউমা, আমি তোমাকে বলছি, আমি তোমার শাশুড়ী হই, আমি তোমার মায়ের মত। এখানে তোমার মা থাকলে যেমন তাকে সব কথা বলতে, তেমনি আমাকেও তুমি বলো। মনে করে নাও এবাড়িতে আমিই তোমার মা আমাকে কোন কিছু বলতে তুমি লজ্জা করো না। বলল, তোমার গায়ে হাত দিয়েছিল সে?
নয়নতারা এবার শাশুড়ীর বুকের মধ্যে ভেঙে পড়লো। শাশুড়ী বউকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। বললে–কেঁদো না বউমা, চুপ করো, কেঁদো না। আমাকে সব খুলে বলো তুমি। তোমার কিছু ভয় নেই। আমি তো রয়েছি, তোমার কী ভয়? মার কাছে কি কেউ কিছু বলতে লজ্জা করে? বলো তো লক্ষ্মী মেয়ে, সদা বুঝি তোমার গায়ে হাত দিয়েছিল, আর তুমি বুঝি আপত্তি করেছিলে?
নয়নতারা শাশুড়ীর বুকের মধ্যেই মাথা নেড়ে বললে–না–
–তবে? তবে কেন খোকা চলে গেল?
এর উত্তর কী দেবে নয়নতারা? নয়নতারা কি নিজেই এর উত্তর জানতো! সে কি কল্পনা করতে পেরেছিল এমন করে তার ফুলশয্যা রাত্রের সমস্ত স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে? কত দিন কত মেয়ের কাছে তাদের ফুলশয্যা রাত্রের মুখরোচক গল্প শুনেছে সে। তারাও তার সঙ্গে এক স্কুলে এক ক্লাসে পড়েছে। তাদের বিয়ে হবার পরে তারাই গল্প করেছে সে-সব ঘটনার। বিয়ের আগে নয়নতারাও নিজের ফুলশয্যার রাত্রের অনেক স্বপ্ন তিলে তিলে মনের ভেতরে পুষে রেখেছিল। ভেবেছিল তার ফুলশয্যার রাত্রের ঘটনা তাদের বলবে। অন্তত বলবার মত একটা কিছু ঘটনা ঘটবে। কিন্তু এ কী হলো? কারো বাড়িতে কি বউভাতের রাত্রে পুলিস আসে! এমন ঘটনা তো তার কোনও বন্ধুর বিয়েতে ঘটেনি। পুলিসই বা কেন হঠাৎ আসতে গেল, আর খুনই বা হলো কে? সব কিছু মিশিয়ে যেন এক রহস্যজনক বিপর্যয় ঘটে গেল তার জীবনে। কান্না কি মানুষের চোখে সহজে আসে! আজ যদি মা এখানে থাকতো তো নয়নতারা তাকে জিজ্ঞেস করতো–মা, তুমি এমন জায়গায় আমার বিয়ে দিলে কেন? একটু খোঁজখবরও নিতে পারলে না ভালো করে?
প্রীতি কী করবে তখন বুঝতে পারছিল না। বললে–কেঁদো না বউমা, আমার সঙ্গে কথা বলো, আমি যে কথা বলছি তার জবাব দাও–
বলে নয়নতারাকে বুক থেকে সরিয়ে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করালো। নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে বউমার চোখ মুখ মুছিয়ে দিয়ে বললে–এবার বলো তো বউমা, সত্যিই কী হয়েছিল? সব সত্যি করে বলবে, কিছু লুকোবে না–বলো–
নয়নতারা বললে–কিছু হয়নি মা—
শাশুড়ী বললে–কিছু হয়নি তো শুধু শুধু খোকা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল? ফুলশয্যার রাত্তিরে বর কখনও মিছিমিছি বউকে ছেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়? এমন কথা কখনও কেউ শুনেছে? নিশ্চয় কিছু হয়েছে? তুমি আমার কাছে লুকোচ্ছ। বলল সত্যিই কী হয়েছিল?
নয়নতারা বললে–সত্যি বলছি মা, কিছু হয়নি–
–কিছু না হলে খোকা এমনিই বেরিয়ে গেল? আমার ছেলে তো পাগল নয়। পাগল হলে না-হয় বুঝতাম, তবু তার একটা মানে ছিল। শুধু শুধু সে বেরিয়ে গেল কেন? তুমি নিশ্চয়ই তাকে কিছু বলেছিলে!
–বিশ্বাস করুন মা, আমি কিছু বলিনি!
–তুমি বললেই আমি বিশ্বাস করবো? যখন তুমি দেখলে যে সে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে যাচ্ছে তখন তুমি তাকে জিজ্ঞেস করলে না কেন যে সে বেরিয়ে যাচ্ছে কেন, কোথায় যাচ্ছে?
নয়নতারা অপরাধীর মত বললে–আমি জিজ্ঞেস করিনি—
কেন জিজ্ঞেস করোনি?
–আমার ভয় করেছিল!
–ভয়? কীসের ভয়?
কীসের যে ভয় তা নয়নতারা নিজেই জানে না তো শাশুড়ীকে বোঝাবে কেমন করে? বললে–আমি জানি না কীসের ভয়!
প্রীতি এবার যেন একটু অসন্তুষ্ট হলো। বলে উঠলো–তা তুমি যখন দেখলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে তখন তাকে ধরে রাখলে না কেন? তাহলে কীসের জন্যে ভগবান এত রূপ দিয়েছিল তোমাকে? তাহলে অন্য এত মেয়ে থাকতে কেন তোমাকেই বা এ বাড়ির বউ করে নিয়ে এলুম? আর এইটুকুই যদি তুমি না করতে পারবে তো এত রূপ নিয়ে কি আমি ধুয়ে খাবো? আমি রূপসী বউ চেয়েছিলুম কি আমার নিজের জন্যে?
কিন্তু কথাগুলো বলেই প্রীতি বুঝলো ঠিক এই সময়ে এ কথাগুলো বলা যেন তার উচিত হচ্ছে না।
নয়নতারা তখনও শাশুড়ীর বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে কাঁদছিল। প্রীতি বললে–আর কেঁদো না বউমা, আমি বুঝতে পেরেছি তোমার কিছু দোষ নেই। আর সত্যিই তো, তুমিই বা কী করবে! তুমি তো নতুন এ বাড়িতে! এক কাজ করি, এখনও কিছুক্ষণ রাত আছে, আমি এসে তোমার কাছে শুচ্ছি। সারারাত জাগলে তোমার শরীর খারাপ হবে–তুমি একটু থাকো এখানে, আমি আসছি–
বলে নয়নতারাকে বিছানার ওপর বসিয়ে আবার নিজের ঘরে চলে এলো।
চৌধুরী মশাই তখন নিজের ঘরের ভেতর ছটফট করে পায়চারি করছিলেন। ঠিক বুঝতে পারছিলেন না, কোথায় কী গোলমাল বেধেছে। এখন যদি সমস্ত বাড়িময় জিনিসটা জানাজানি হয়ে যায়, তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে একেবারে। সমস্ত নবাবগঞ্জময় লোক জেনে যাবে যে, তাঁর ছেলে ফুলশয্যার রাত্রে বাড়ি থেকে পালিয়েছে! কথাটা হয়ত শেষ পর্যন্ত কেষ্টনগরে বেয়াইবাড়িতেও গিয়ে পৌঁছোবে! তখন?
