কিন্তু সে-সব কথা এখন থাক। এখন সবাই সুখী, এখন সকলের শান্তি। এখন সবাই ঘুমোও। আমি অসুস্থ লোক, আমার বয়েস হয়েছে, আমি জেগে থাকলেও তোমরা ঘুমোও।
২.৪ বংশধারা রক্ষা
–মা!
সমস্ত বাড়িময় যে যেখানে পেরেছে শুয়ে পড়েছে। অনেকের একটা চাটাই কিংবা বালিশও জোটেনি। কোঁচার খুঁটটা গায়ে দিয়ে একটা ছাদের তলা খুঁজে নিয়ে গড়িয়ে পড়েছে। কাজ শেষ হতে রাত প্রায় একটা বেজে গিয়েছিল। মাছের কাঁটা আর মাংসের এঁটো হাড়ের লোভে কিছু বেওয়ারিশ কুকুর পুকুরপাড়ে এসে অনেকক্ষণ কাড়াকাড়ি করে তখন পেট শান্ত করে ঘুমিয়ে পড়েছিল। বলতে গেলে কেউ আর তখন জেগে ছিল না। চৌধুরী মশাইও ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। বড় খাটুনি গিয়েছিল তাঁর। যখন সদানন্দ ফুলশয্যার ঘরে শুতে গেল তখনই শুধু একটা নিশ্চিন্তের দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়েছিলেন তিনি। যাক, বাঁচা গেল। চৌধুরী-পরিবারের বংশধারা রক্ষা পেল। আর কোনও দিন কোনও কালীগঞ্জের বউ এসে তাঁর কোনও ক্ষতিসাধন করতে পারবে না। এই বংশ শাখাপ্রশাখা মেলে যাবচ্চন্দ্রদিবাকরৌ বিস্তারলাভ করবে। ওই সদারও আবার একদিন সন্তান হবে। সেই সন্তানের আবার একদিন গায়ে-হলুদ হবে, একদিন বিয়ে হবে, একদিন ফুলশয্যাও হবে।
আর তারপর? তারপরের কথা ভাবতে গিয়েই চৌধুরী মশাই-এর দু’চোখ কখন ঘুমে জড়িয়ে এসেছিল।
–মা!
চৌধুরী মশাই চমকে উঠলেন। কে যেন কাকে ডাকছে! মেয়েলি গলা! তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন তিনি। পাশেই বিছানার ওপর গৃহিণী ঘুমোচ্ছিল। বড় অঘোর ঘুম তার। আহা, ঘুমোক। অনেক দিন ধরে অনেক পরিশ্রম করে আজ সবে একটু বিশ্রাম করবার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু কে-ই বা ডাকছে তাকে! এত রাত্রে তাকে কেনই বা ডাকছে!
তিনি গৃহিণীর গায়ে ঠেলা দিলেন। বললেন–ওগো, ওগো, শুনছো–
ধড়মড় করে উঠে পড়লো প্রীতি। বললে–কী হলো?
চৌধুরী মশাই বললেন–দেখ দিকিনি, কে যেন ডাকছে তোমাকে–
–আমাকে? ডাকছে? কে ডাকছে।
–কী জানি! একজন মেয়েমানুষের গলা মনে হলো—
মেয়েমানুষের গলা! এত রাত্তিরে কে মেয়েমানুষ তাকে ডাকবে! এই তো সবাইকে খাইয়ে-দাইয়ে ভাঁড়ারের চাবি আঁচলে বেঁধে তিনি ঘরে এসে শুয়ে পড়েছেন।
জিজ্ঞেস করলেন–রাত কটা হলো গো?
চৌধুরী মশাই ঘড়িটার দিকে চেয়ে বললেন–রাত তিনটে—
রাত তিনটে মানে ভোর হয়ে এল। এত রাত পর্যন্ত ঘুম হয়েছে। তবে তো অনেকক্ষণ ঘুম হয়েছে। কিছুই টের পায়নি সে।
আবার বাইরে থেকে ডাক এল—মা–
প্রীতি তাড়াতাড়ি কাপড়টা গুছিয়ে নিতে নিতে ঘরের খিল খুলে বাইরে এলো। চারদিকে অন্ধকার। সামনের বারান্দায় যে-যেখানে যেমন ভাবে পেরেছে গড়া-গড়া শুয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে যেন মনে হলো কে একজন অন্ধকারে তার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
প্রীতি তাড়াতাড়ি সামনের দিকে এগিয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলে কে? কে ওখানে দাঁড়িয়ে?
মূর্তিটা বললে—আমি–
–আমি? আমি কে?
প্রীতি একেবারে মূর্তিটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো, মূর্তিটার মুখের কাছে মুখ নিয়ে যেতেই চমকে উঠেছে। বউমা? তুমি? তুমি হঠাৎ এত রাত্তিরে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছ কেন? কী হয়েছে তোমার?
নয়নতারা তখন থরথর করে কাঁপছিল। বললে–আমার ভয় পাচ্ছে–
–কেন? ভয় পাচ্ছে কেন? খোকা কোথায়?
নয়নতারা এ-কথার কোনও জবাব দিলে না।
শাশুড়ী বললে–কী হলো, জবাব দিচ্ছ না কেন? খোকা কোথায় গেল? খোকা ঘরে নেই?
এবারও নয়নতারা কোন কথার উত্তর দিলে না।
কেমন যেন একটা সন্দেহ হলো শাশুড়ীর মনে। বললে–চলো, চলো, তোমার ঘরে চলো, কিছু ভয় নেই। চলো–
নয়নতারাকে হাতে ধরে নিয়ে প্রীতি তার শোবার ঘরের দিকে গেল। নয়নতারার শোবার ঘরের দরজা তখন হাট করে খোলা পড়ে ছিল। ভেতরে একরাশ ফুলের গন্ধ। দেয়ালের গায়ে টিমটিম করে তখনও দেয়ালগিরিটা জ্বলছে। বিছানা যেমন ছিল তেমনিই রয়েছে। চাদরে বালিশে এতটুকু ভাঁজও পড়েনি কোথাও। বিছানায় যে কেউ শুয়েছিল তার সামান্যতম চিহ্নও কোথাও নেই। বিছানাটা যেন ব্যবহারও করা হয়নি এক মূহূর্তের জন্যে।
চারিদিকে চেয়ে প্রীতি খানিকক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে রইল। যেন সমস্ত অবস্থাটা বোঝবার চেষ্টা করলে। তারপর নয়নতারার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললে–খোকা কোথায় গেল?
নয়নতারা কথা বলতে গিয়েও কথা বলতে পারলে না। শাশুড়ীর চোখের দৃষ্টি এড়াবার জন্যে মুখটা নিচু করে নিলে।
–বলো, খোকা কোথায় গেল? বলো?
নয়নতারা চুপ। তার চোখ দিয়ে তখন টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে।
–খোকা ঘরে শোয়নি?
এবার প্রীতি আর পারলে না। নয়নতারার চিবুকটা ধরে উঁচু করে নিজের মুখোমুখি ধরলে। নয়নতারা শাশুড়ীর সে দৃষ্টি সহ্য করত না পেরে চোখ দুটো বুঁজিয়ে ফেলল। বোঁজা চোখ দুটো দিয়ে তখন জলের ধারা আর বাধা মানছে না। দরদর করে গালে বেয়ে শাশুড়ীর হাতের পাতার ওপর পড়তে লাগলো।
–বলো বউমা, আমি তোমার শাশুড়ী হই, আমার কাছে লজ্জা করো না, খোকা তোমার বিছানায় শোয়নি?
নয়নতারার মুখে তখন যেন জবাব দেবার মত কোনও ক্ষমতাই আর নেই।
–বলো, জবাব দাও, খোকা শোয়নি?
এতক্ষণে নয়নতারার ঠোঁট দিয়ে একটা ছোট কথা বেরোল—না–
–শোয়নি? তা হলে কোথায় গেল সে?
নয়নতারা বললে–তা জানি না।
–কিন্তু তাকে তো আমরা তোমার ঘরে ঢুকিয়ে দিলুম। সে দরজায় খিল দিলে, তাও জানি। তারপর কী হলো? তারপর কখন সে বেরিয়ে গেল?
