খাওয়া-দাওয়ার পর থেকেই প্রকাশ মামা কানে কানে বলছিল–আমি যা বলেছি, সব তোর মনে আছে তো? ভুলিস নি তো?
সদানন্দ বললে–কী?
–মনে নেই? তোকে এত করে পাখি-পড়ানো করে শিখিয়ে দিলুম আর এখন কিনা তুই বলছিস কী? তোকে নিয়ে আমি কি করবো বল দিকিনি।
সদানন্দ এ-কথার কিছু জবার দিলে না।
প্রকাশ মামা বললে–আরে ফুলশয্যের রাত একবারই তো আসে মানুষের জীবনে, তুই দেখছি শেষকালে সব গুবলেট করে ফেলবি। আমার মান-ইজ্জৎ সব ডোবাবি। ভাগ্নেবউ শেষকালে আমার নামেই খোঁটা দেবে। বলবে এমন বরের সঙ্গে আমার বিয়ে দিয়েছে যে একটা আস্ত আনাড়ির ডিম–
কিন্তু সদানন্দ সেই ঘরের মধ্যে ঢুকতেই যেন তার মাথার ওপর বিকট শব্দে একটা বাজ ভেঙে পড়লো। সামনের দিকে চাইতেই মনে হলো কে যেন ছাদের কড়িকাট থেকে ঝুলছে। মুখটা যেন চেনা-চেনা। যেন ঠিক কপিল পায়রাপোড়া…… পরনের কাপড়টা গলায় ফাঁস দেওয়া….. ঝুলছে…..
পেছন থেকে প্রকাশ মামা আবার তাগিদ দিলে কই রে, সদা, দিলি নে? খিল দে–
কর্তাবাবুর কাছে রিপোর্ট দিতে গেলেন চৌধুরী মশাই। বললেন–সব নিশ্চিন্তে চুকে গেছে বাবা–
কর্তাবাবু এই খবরটার আশাতেই রাত জেগে বসেছিলেন। বললেন–আর খোকা?
পেছনে প্রকাশ মামাও ছিল। সে এগিয়ে গিয়ে বাহাদুরি নেবার চেষ্টা করলে।
বললে–আমি এই এখুনি তাকে ঘরের মধ্যে ঠেলে ঢুকিয়ে দিয়ে তবে সেখান থেকে আসছি–আর যেতে কি চায়, ঠেলে ঘরে ঢুকিয়ে দিলাম–
–ঘরে খিল দিয়েছে তো?
প্রকাশ মামা বললে–খিল দিতে কি চায়? প্রথমে দিচ্ছিল না, তারপর আমি পিছন থেকে তাগিদ দিয়ে দিয়ে খিল্ বন্ধ করিয়ে তবে ছেড়েছি…
কর্তাবাবু নিশ্চিন্ত হলেন। একটা আত্মতৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তাঁর বুক থেকে। অবশ পা দুটো অভ্যাসমত ছড়াবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু ব্যর্থ চেষ্টা করেও পারলেন না।
তারপর বললেন–আচ্ছা, ঠিক আছে, যাও, এবার তোমরা বিশ্রাম করো গে—
.
শুধু যে তাতে কর্তাবাবুই নিশ্চিন্ত হলেন তা-ই নয়, হয়ত নবাবগঞ্জের চৌধুরীবাড়ির সবাই-ই নিশ্চিন্ত হলেন। চৌধুরী মশাইও নিশ্চিন্ত হলেন। যাক, আর কোনও দুর্ভাবনা নেই। ঈশ্বরের ইচ্ছেই পূর্ণ হলো। সদানন্দ এতক্ষণে নতুন বউ-এর আকর্ষণে গা ঢেলে দিয়ে অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সব ভুলে গিয়েছে। আর কোনও দুর্ভাবনা কারো নেই, আর কোনও আশঙ্কাও নেই কারো। যা ভয় ছিল সকলের তা হলো না। সব সমস্যা নির্বিঘ্নে সমাধা হয়ে গেল। তিন দিন আগেও যে সমস্যা সকলের অশান্তির কারণ হয়ে উঠেছিল তার সমাধি হলো। কোথা থেকে এক পুরোন ইতিহাসের কুটিল স্মৃতি সাপ হয়ে ফণা তুলেছিল। মনে হয়েছিল সেই ফণা বুঝি এ সংসারের সুখ-শান্তি-ঐশ্বর্যের মাথায় ছোবল মেরে সব কিছু ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু আর তা হবার সম্ভাবনা নেই। এবার নয়নতারা এসেছে। ফুলশয্যার ওপর নয়নতারার চোখ-ভোলানো রূপ আর মন-ভোলানো ভালবাসা সব কিছু সন্দেহের কাঁটা নির্মূল করে দিয়েছে। আর ভয় নেই। এবার ঘুমোও। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ো সবাই। তোমাদের অনেক ঝঞ্ঝাট গেছে এ কদিন ধরে। গায়ে-হলুদের আগের দিন রাত্রে যেদিন থেকে সদানন্দ নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল সেই দিন থেকেই তোমাদের অনেক ঝঞ্ঝাট গেছে। তারপর অনেক ঝড়-ঝাপটা অতিক্রম করে শেষরক্ষা করেছে বংশী ঢালী। যেটুকু বংশী ঢালী পারেনি, সেটুকু শেষ করবে নতুন বউ নয়নতারা। নয়নতারাই আজ ফুলশয্যার রাত্রে সদানন্দকে জীবনের আসল মানে বুঝিয়ে দেবে। নয়নতারাই বুঝিয়ে দেবে মহাপুরুষরা যা কিছু বলে গিয়েছেন তা বইতে ছাপাবার জন্যে, স্কুলে কলেজে পড়াবার জন্যে, পড়ে পরীক্ষায় পাস করবার জন্যে, কিন্তু জীবন আলাদা জিনিস। সে জীবনে একমাত্র সত্য হলো ভোগ। ভোগ তার সংসারের বিলাসের মধ্যে দিয়ে, তার অর্থ উপার্জনের মধ্যে দিয়ে। আর সেই ভোগের পথে যত বাধা আসে তা যে-কোনও উপায়ে অপসারণের মধ্যে দিয়ে। এরই নাম হলো জীবন!
কর্তাবাবুও ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তার ঘোরটা যেন চট করে একটু ভেঙে গেল। মনে হলো কে যেন কাঁদছে। যেন কাছাকাছি থেকে কারো কান্নার আওয়াজ আসছে!
এই আনন্দের দিনে এত রাত্রে কে আবার কাঁদে! অভ্যাসগত ডাকলেন—দীনু–
অন্য সময় হলে দীনু সঙ্গে সঙ্গে এসে হাজির হতো। হুকুম তামিল করবার জন্যে দীনুর মত অত বাধ্য মানুষ তিনি আর দেখেন নি। কালীগঞ্জের কর্তাবাবুর কাছে যখন তিনি কাজ করতেন তিনি নিজেও অত বাধ্য হয়ে হুকুম তামিল করেন নি কখনও।
কর্তাবাবুর ডাকে কেউ-ই সাড়া দিলে না। তা না সাড়া দিক। আহা সারা দিন খাটুনির পর বোধ হয় দীনু ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমোক। ঘুমোক সে। কিন্তু জানতে ইচ্ছে করছিল কে কাঁদছে! অথচ কাঁদার তো কথা নয় কারো। আজকে তো আনন্দের দিন। আজকে তাঁর নাতির বিয়ে। বিয়ে ঠিক নয়, ফুলশয্যে। আজকে তো তাঁর প্রজারা এসে তাঁর নাতবউকে আশীর্বাদ করে গেছে। আজকে সবাই তাঁর বাড়িতে এসে পাত পেতে পেট ভরে খেয়ে গিয়েছে। কেউ কেউ খাবার পর ছাঁদা বেঁধেও নিয়ে গেছে। গ্রামে তো আজ আর কেউই উপবাসী নেই। সবাই পরিতৃপ্ত, সবাই পরিশ্রান্ত। এখন তারা যে-যার বাড়িতে গিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। এখন কেন তারা কাঁদতে যাবে! কীসের দুঃখ তাদের!
কর্তাবাবু আবার চোখ দুটো জোর করে বুজিয়ে প্রাণপণে ঘুমোবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কর্তাবাবু তখনও জানতেন না যে তিনি ঘুমোতে চেষ্টা করলেও ইতিহাসের কখনও ঘুমোতে নেই। ইতিহাস ঘুমোয় না বলেই আজ কালীগঞ্জের বউকে বেঘোরে প্রাণ দিতে হয়। ইতিহাস ঘুমোয় না বলেই এত রাত্রে তার কানে চাপা আর্তনাদ ভেসে আসে। ইতিহাস ঘুমোয় না বলেই তাঁর নাতি বিয়ের দিন বাড়ি থেকে পালিয়ে কালীগঞ্জে গিয়ে আশ্রয় নেয়। আবার ইতিহাস ঘুমোয় না বলেই তাঁর নাতি বিয়ে করে বউ নিয়ে এসেই টাকা চায়!
