কর্তাবাবু একসময় ছেলেকে ডেকে পাঠালেন। চৌধুরী মশাই আসতেই কর্তাবাবু জিজ্ঞেস করলেন–কী খবর, ও-দিকের খবর কী?
চৌধুরী মশাই বললেন–সব তো ঠিকই চলছে। ফুলশয্যার লোকদের সকলকে খাইয়ে দাইয়ে পাঠিয়ে দিলুম। তাদের তো আবার ট্রেন ধরতে হবে–
কর্তাবাবু বললেন না, আমি ও কথা বলছি না, বলছি খোকা কোথায়?
চৌধুরী মশাই বললেন–খোকা আর তো কোনও গণ্ডগোল করছে না–
–ওই তোমাদের বুদ্ধি! গণ্ডগোল না করলেও, কখন কী করে ফেলে তা কি বলা যায়? আমি যে বলেছিলাম একটু চোখে চোখে রাখতে, রেখেছ?
চৌধুরী মশাই বললেন–হ্যাঁ, তার জন্যে তো প্রকাশকে বলে রেখেছি–
–প্রকাশ কে?
–আমার শালা। সে পাকা লোক। তার চোখ এড়াতে পারবে না খোকা—
কর্তাবাবু বললেন–তবেই হয়েছে। তোমাকে বলেছি না তুমি নিজে একটু নজর রাখবে। একলা ছাড়বে না ওকে মোটে, আর বংশীদেরও বলে রেখেছ?
–হ্যাঁ, বলেছি।
–বংশীরা যেন সবাই মিলে ওর আশেপাশে থাকে। যেন চোখের আড়াল না করে, বলে দিও–
চৌধুরী মশাই বললেন–হ্যাঁ, বলে রেখেছি
–ঠিক আছে, যাও, তুমি ও-দিকটায় দেখ গিয়ে, আমার এদিকে তোমাকে বেশি আসতে হবে না–
চৌধুরী মশাই আর দাঁড়ালেন না। চলে গেলেন। নিচের অনেক লোকজনের শব্দ কানে এল। সকলে খেতে বসেছে। সমস্ত বাড়িটাতেই অতিথি-অভ্যাগতের ভিড়। বাইরে থেকে শানাই বাজতে শুরু করেছে। কর্তাবাবু যেন খানিকটা নিশ্চিন্ত হলেন মনে মনে। ফুলশয্যাটা কাটলেই পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারবেন। তারপর একটা রাত কাটলেই আর ভয় নেই। তখন খোকা আস্তে আস্তে সংসারী হয়ে উঠবে। তখন পাগলামি চলে যাবে তার। ওই বেয়াই মশাই যা বলেছেন তাই হবে। কাঁধে জোয়াল পড়লেই মানুষের দায়িত্ববোধ আসে।
ক্রমে আরো লোকের ভিড় বাড়লো। আওয়াজের মাত্রা আরো বেড় গেল। নবাবগঞ্জের আকাশে অঘ্রাণ মাসের রাত আরো ঘন হলো। তার মনে পড়তে লাগলো সেই নবদ্বীপের ঘাটে বুক-জলে নেমে হর্ষনাথ চক্রবর্তীর শেষ কথাগুলো। আশ্চর্য! প্রথমে হাঁটু-জল, তারপরে কোমর-জল। তারপরে বুক-জল, তারপরে গলা-জল। তখন সূর্য উঠেছে নতুন। গঙ্গার ঘাটে আরো কিছু স্নানার্থী এসেছে। তারাও ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিল।
–নারাণ!
কর্তাবাবু বললেন–বলুন হুজুর–
হর্ষনাথ চক্রবর্তী বললেন–আমি চললুম নারাণ। ওদের ভার তোমার ওপর রেখে দিয়েই চললুম। তুমি ওদের দেখো—বুঝলে–
কর্তাবাবু বলেছিলেন–আপনি কিছু ভাববেন না হুজুর, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন–
হর্ষনাথ চক্রবর্তী বললেন–তুমি যদি না–ও দেখো, তবু আমার কিছু বলবার নেই নারাণ, আমার কিছু করণীয়ও নেই, আমার সব আসক্তি আজ দূর হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম তামাকের আসক্তিটাই আমি কাটিয়ে উঠতে পারব না। তা এখন সে আসক্তিটাও দূর করেছি। এখন চলি-বলে তিনি সংস্কৃত শ্লোক আবৃত্তি করতে লাগলেন।
জবাকুসুমসংকাশং
কাশ্যপেয়ম্ মহাদ্যুতিং…
সূর্যস্তব পাঠ করতে লাগলেন হর্ষনাথ চক্রবর্তী মশাই অনেকক্ষণ ধরে। কর্তাবাবু ওসব সংস্কৃত বোঝেন না। তিনি তখনও জলের ভেতর দাঁড়িয়ে হুজুরকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর একসময় হঠাৎ তিনি নির্বাক হয়ে গেলেন। চোখ দুটো ঊর্ধনেত্র হলো। আর তারপরেই সব শেষ!
কোথায় গেলেন তিনি। আর কোথায় রইলেন নরনারায়ণ চৌধুরী। তিনি আসক্তি ত্যাগ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু কর্তাবাবু কোন্ দুঃখে আসক্তি ত্যাগ করবেন। তাঁর যে এখনও অনেক কামনা-বাসনা বাকি! এখনও অনেক আকাঙ্খা তার। এই আজ খোকার বউ-ভাত। এখনই খোকা সংসারী হলো। তারপর একদিন তার সন্তান হবে। তারপরে সেই সন্তানেরও আবার একদিন সন্তান হবে। এমনি করে তিনিই এই বংশধারার পরিক্রার মধ্যে অনন্তকাল ধরে বেঁচে থাকবেন। তাঁর বংশের শাখা-প্রশাখার মধ্যেই তিনি অজর-অমর হয়ে নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ত্যাগ করবেন। তবেই হয়ত তখন তাঁর চিরকালের সাধ-আহ্লাদ-আশা মিটবে। তার আগে কিছুতেই নয়।
অনেক রাত্রে বাইরের কল-কোলাহল স্তিমিত হয়ে এল। নয়নতারাকে ফুলশয্যায় বসিয়ে দিলে বেহারী পালের বউ।
বললে–বেশি রাত কোর না মা আজ, ঘুমিয়ে পড়, নইলে তোমারও শরীর খারাপ হবে, সদার শরীরও খারাপ হবে, কাল থেকেই তো তোমাদের শরীরের ওপর দিয়ে ধকল যাচ্ছে–
ফুলের গন্ধ এসে নাকে লাগছিল নয়নতারার। চারিদিকেই ফুল। ফুলের পাহাড় চারদিকে। অনেক ফুল যোগাড় করা হয়েছিল। পদ্মফুল এসেছিল চৌধুরীদের বিল থেকে। নয়নতারার কেমন যেন ভয় করতে লাগলো। মা বাবা কেউই এল না। এ বাড়িতে সবাই পর। কেউই তার আপন নয়। তবু শ্বশুর-শাশুড়ী সবাই-ই কাল থেকে খুব ভালো ব্যবহার করে আসছে–
শাশুড়ী বার বার বলেছে–লজ্জা করো না বউমা। পেট ভরে খাও। মনে করো না যেন এখানে তোমার কেউ নেই। তোমার শ্বশুরও আমাকে তোমার কথা বার বার জিজ্ঞেস করেছেন। আর একটা সন্দেশ দেব?
তারপর যখন আরো রাত হলো হঠাৎ ঘরের দরজাটা আবার খুলে গেল। নয়নতারা আন্দাজে বুঝতে পারলে কে ঘরে ঢুকেছে। কিন্তু সাহস করে চোখ তুলে চাইতে পারলে না। বুকটা থর-থর করে কাঁপতে লাগলো। মনে হলো যেন সে অজ্ঞান হয়ে যাবে।
সদানন্দ সবে ঘরে ঢুকেছে।
পেছন থেকে প্রকাশ মামা বললে–দরজায় খিল দিয়ে দে রে, খিল দিয়ে দে—
কিন্তু তবু যেন তার হাত উঠতে চাইল না। প্রকাশ মামা আবার পেছন থেকে তাগিদ দিলে–কই রে সদা, খিল দিলি নে?
