ততক্ষণে কীর্তিপদবাবু এসে গেলেন। এসেই বললেন–বড় চিন্তায় পড়লুম বেয়াই মশাই, খোকা তো আগে এরকম ছিল না। ছোটবেলায় কত মজার মজার কথা বলতো। আর এখন একেবারে অন্য রকম হয়ে গিয়েছে দেখছি
কর্তাবাবু বললেন–বড় বেয়াড়া হয়ে গেছে আজকাল। কারো কথা শোনে না–
কীর্তিপদবাবু বললেন–ভালোই করেছেন যে বিয়েটা দিয়ে দিয়েছে, বিয়েটা কম বয়সে দিয়ে দেওয়াই ভালো
কর্তাবাবু বললেন–আরো আগে বিয়ে দিয়ে দিলেই ভালো হতো। কিন্তু ভালো-মতো পাত্রী তো এতদিন পাওয়া যাচ্ছিল না–তাই–
কীর্তিপদবাবু প্রবীণ বিচক্ষণ মানুষ। বললেন–দেখুন বেয়াই মশাই, বয়েস হয়েছে বলে কেউ আমাদের কথাই শুনতে চায় না আর, যেন আমরা কখনও কম বয়েসের ছিলাম না। এই-ই হয় বেয়াই মশাই, এই-ই হয়–
কর্তাবাবু বললেন–ওসব আর ভাববেন না বেয়াই মশাই, আমাদের যুগ চলে গেছে, আমরা বাতিল–
কীর্তিপদবাবু বললেন–কিন্তু কী ব্যাপারটা বলুন তো, খোকা ওরকম বেয়াড়া হলো কেন? কে কালীগঞ্জের বউ? তার কী হয়েছে?
কর্তাবাবু বললেন–পাগলের কথার কি মনে আছে? সেই কথায় আছে না, পাগলে কী-ই না বলে আর ছাগলে কী-ই না খায়! আপনি তামাক খান, কৈলাস, বেয়াই মশাইকে তামাক দিতে বলো–
কিন্তু এ প্রসঙ্গ বেশিক্ষণ চললো না। কথার মধ্যেই বাধা পড়লো। হঠাৎ নিচে থেকে শাঁখ বাজার আওয়াজ হলো।
–ওই ফুলশয্যার তত্ত্ব এসেছে বোধ হয় কেষ্টনগর থেকে। কৈলাস যাও যাও, দেখে এসো–
সত্যিই তখন একতলায় হই-হই ব্যাপার। বিপিনই ফুলশয্যার তত্ত্ব নিয়ে এসেছে দলের মাথা হয়ে। অনেক দূর থেকে তত্ত্ব এসেছে। শাঁখ বাজার শব্দ শুনেই গ্রাম থেকে ছেলে বুড়ো ছুটে এসেছে। অন্তত বারোজন লোক হবে। সকলের হাতেই জিনিসপত্র। রেল বাজার থেকে চারখানা গরুরগাড়ি ভর্তি জিনিসপত্র তারা নিয়ে এসেছে। বড় বড় বারকোষ, হাঁড়ি, থালা, ফলের ঝুড়ি, ছানার মিষ্টি, ফুলের ঝোড়া, দই-এর হাঁড়ি, কোচানো শাড়ি। জামাই এর ধুতি-পাঞ্জাবি।
–ঠাকুর, কড়ায় লুচি ছেড়ে দাও, বারোজন লোকের মতন। একসঙ্গে খেতে বসবে–
ভেতর বাড়িতেও সাজ-সাজ রব পড়ে গেল। চওড়া জরির শান্তিপুরে শাড়ি পরে বাড়ির গিন্নী সমস্ত কিছু তদারক করছে। আশেপাশের বাড়ি থেকে পাড়ার বুড়ী গিন্নী বান্নি মানুষেরা এসে পরামর্শ দিচ্ছে। কেউ পান সাজতে বসেছে। কেউ তরকারি কুটছে।
বেহারী পালের বউ ক’দিন থেকেই আসছে। বিয়েবাড়ির কাজ-কর্ম করে দিয়ে অনেক রাত্রে আবার নিজের বাড়ি চলে যায়।
সেদিন বললে–হ্যাঁ বউমা, সদার নাকি কী হয়েছে?
প্রীতি বললে–কী আবার হবে মাসীমা? কই, সদার তো কিছু হয়নি–
–শুনলুম নাকি সদা বলছে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবে। গাঁয়ে কত রকমের কথা উঠেছে, উনি নাকি বারোয়ারিতলা থেকে শুনে এসেছেন–
প্রীতি বললে–কী জানি মাসীমা, তুমি তো এ কদিন আসছো, নিজের কানে কিছু শুনেছ?
বেহারী পালের বউ সেই কথা বললে। বললে–আমি তো কর্তাকে তাই-ই বললুম, বললুম সদার যদি বউ পছন্দ না হয়ে থাকে তো আমার কানে সে-কথা একবার আসতোই–
প্রীতি বললে–পাড়ার লোকের কথা ছেড়ে দাও মাসীমা। পাড়ার লোকে তো অনেক কথাই বলে। তুমি নিজের চোখেই তো বউ দেখলে। অমন বউ কজনের বাড়িতে দেখেছ বলতে পারো? ছেলের অপছন্দ হবার মত কি বউ করেছি আমি? বলুক দিকিনি কেউ–
কিন্তু তখন অত কথা বলবার আর সময় নেই কারো। তবু বেহারী পালের বউ বললে–তোমার গুণের ছেলে বউ, পাস করা ছেলে, তুমি যদি এমন বউ ঘরে না আনবে তো কে আনবে বলো? কার এমন সাধ্যি আছে?
কথার মাঝখানেই গৌরী পিসী এসে বাধা দিলে। বললে–শুনেছ বউ, কেষ্টনগর থেকে তোমার বেয়াই-বেয়ান কেউই আসছে না–
–কেন?
–তাই তো শুনলুম। ফুলশয্যের লোকেরা এসে তাই তো বলছে। বলছে পণ্ডিত মশাই এখানে এসে তো কিছু খাবেন না। তাই আর আসেননি। আর অনেক দূরের রাস্তা। ওরা সবাই বউমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে–
–তা বউমার কাছে নিয়ে যা না ওদের।
নয়নতারা তেমনি করেই চুপ-চাপ বসে ছিল। তার আগেই সাজানো-গোছানো হয়েছে বউকে। নতুন একখানা বেনারসী পরেছে। গা-ভর্তি গয়না। বিপিন আসতেই নয়নতারা চোখ তুলে চাইলে।
জিজ্ঞেস করলে–বাবা আসবে না বিপিন?
বিপিন বললে–না দিদিমণি, তা তুমি ভালো আছে তো? কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো?
সেকথার উত্তর না দিয়ে নয়নতারা বললে–আর মা? মা কেমন আছে?
–মা একটু কান্নাকাটি করছিল। কিন্তু এখন চুপ করেছে। বলছে মেয়ে যখন হয়েছে তখন তো পর হয়ে যাবেই।
নয়নতারা বললে–তুমি গিয়ে মাকে বোল আমি এখানে খুব ভালো আছি, আমার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না। তোমাদের খাওয়া-দাওয়া হয়েছে?
–হ্যাঁ দিদিমণি। খুব খেয়েছি পেট ভরে। বড় বড় মাছ, মাংস, মিষ্টি, দই খুব খেয়েছি। তোমার শাশুড়ী খুব ভালোমানুষ, নিজে দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের খাইয়েছেন। এখানকার সবাই-ই খুব ভালো লোক। সঙ্গে নিয়ে যাবার জন্যে আবার চার হাঁড়ি মিষ্টি দিয়েছেন এঁরা–
কিন্তু বেশিক্ষণ কথা বলবার সময় হলো না। বাইরে ততক্ষণে আবার শানাই বেজে উঠলো। একে একে আবার লোকজন আসতে লাগলো নয়নতারার ঘরে। নবাবগঞ্জ ঝেটিয়ে লোক আসবে আজ। এ তারই সূচনা। সব অচেনা মুখ। তারা এসে ঘর জোড়া করে বসলো। সকলের চোখই নয়নতারার দিকে। নয়নতারা বুঝতে পারলো সবাই তার মুখের দিকেই হাঁ করে দেখছে। আজকে বুঝি সমস্ত সন্ধ্যেটাই এই রকম চলবে। আজকে নয়নতারাই বুঝি এবাড়ির সব চেয়ে বড় আকর্ষণ!
