প্রকাশ সদানন্দকে তেমনি করে জড়িয়ে ধরেই বললে–দেখুন না পিসেমশাই আপনার নাতির কাণ্ড! পালিয়ে যাচ্ছে বাড়ি ছেড়ে–
–পালিয়ে যাচ্ছে মানে? কেন পালাচ্ছে? কোথায় পালাচ্ছে?
প্রকাশ মামা বললে—কালীগঞ্জে–
–কালীগঞ্জে? কালীগঞ্জে কার কাছে? আচ্ছা, ব্যাপারটা কী বল্ তো রে প্রকাশ? কাল থেকে কালীগঞ্জের বৌ-এর কথা শুনছি, কে সে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
প্রকাশ মামা বললে–সে পিসেমশাই পরে আপনাকে সব বুঝিয়ে বলবো, এখন একে ধরে না রাখলে সব কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে–
কীর্তিপদবাবু বললেন–পরে আর তোর সময় হয়েছে। পুলিসের দারোগা কেন এসেছিল তাও তো কেউ কিছু বললি নে। সবাই বলছে এখন সময় নেই, পরে বলবে! আর পরে কখন সময় হবে? আমি মরে গেলে তখন কে শুনতে আসবে–
প্রকাশ মামা সে কথায় কান না দিয়ে চেঁচিয়ে ডাকতে লাগলো–দীনু, ও দীনু–
দীনু আসবার আগে চৌধুরী মশাই-এর কানে গেল প্রকাশের চিৎকারের শব্দ। বারান্দায় মুখ বাড়িয়ে দেখেই বেরিয়ে এলেন। শুধু তিনি একাই নন্। কাণ্ড দেখে অনেকেই এসে জুটলো। বিয়েবাড়ির ভিড়ের মধ্যে এমন কাণ্ড দেখে অনেকেই এসে জটলা করলো।
দীনু দৌড়তে দৌড়তে এসে জিজ্ঞেল করলে–আমায় ডাকছিলেন শালাবাবু–
কিন্তু ততক্ষণে জায়গাটা ভিড়ে ভিড় হয়ে গেছে। সাধারণ লোক যারা কাজকর্ম করতে ব্যস্ত তারাও হাতের কাজ ফেলে এসে কাছে দাঁড়ালো। ওদিকে ভিয়েনের জায়গায় পুরোদমে কাজ চলছিল। মিষ্টিগুলো তৈরি করে গামলায় তুলে এক-এক করে ভাঁড়ারে গিয়ে জমা করে আসছে। আর পুকুরের পাড়ে ময়দা মাখা হচ্ছিল। সন্ধ্যে হবার পর লুচি ভাজতে আরম্ভ করবে। তার আগে ডাল, মাছের কালিয়া, মাংস রান্না করে ভাঁড়ারে তোলা হচ্ছে।
চৌধুরী মশাই বিচক্ষণ লোক। তিনি কোনও দিনই বেশি কথা বলেন না। সামান্য একটুখানি শুনেই বললেন–প্রকাশ, এখান থেকে সরে এসো, বড় লোকের ভিড়–চণ্ডীমণ্ডপে নিয়ে এসো খোকাকে, ওখেনে গিয়ে শুনবো সব–
কীর্তিপদবাবু একবার শুধু বলতে চেষ্টা করলেন ব্যাপারটা কী তাই খুলে বলো না তোমরা, আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না–
চৌধুরী মশাই শ্বশুরের দিকে চেয়ে বললেন–ও কিছু না, ও নিয়ে আপনি কিছু ভাববেন না —
বলে প্রকাশের সঙ্গে চণ্ডীমণ্ডপের দিকে সদানন্দকে নিয়ে চললেন। কিন্তু কীর্তিপদবাবু জামাই-এর কথায় খুশী হলেন না। তিনিও জামাই-এর পেছন পেছন চলতে লাগলেন। বললেন–ভাববো না মানে? সব কাজে তোমরা কেবল আমাকে ভাবতে বারণই করছে, তা আমিও তো একটা মানুষ, না কী? আমি বুড়ো হয়েছি বলে আমায় কিছু জানতে নেই?
কিন্তু কে আর তাঁর মত বুড়ো মানুষের কথায় কান দেয়। তিনি যে এত সম্পত্তি করেছেন, তিনি যে এত টাকার মালিক, তার জন্যেও কেউ তাঁর কোনও মূল্য দিচ্ছে না। তিনিও পেছনে-পেছনে চণ্ডীমণ্ডপে গিয়ে সকলের সামনে দাঁড়ালেন। বললেন–আমাকে তোমরা কেউ কিছু বলছো না কেন? আমি বুড়ো হয়েছি বলে কি তোমাদের কিছু সাহায্যও করতে পারবো না?
চৌধুরী মশাই শ্বশুরের এই অন্যায় কৌতূহল বরদাস্ত করতে পারছিলেন না। বললেন– আপনি বৃদ্ধ হয়েছেন, আপনাকে আমরা এ-সব ব্যাপারের মধ্যে কষ্ট দিতে চাই না। আপনি তামাক খান না নিজের ঘরে বসে–দীনু আপনাকে তামাক সেজে দিচ্ছে–
–তুমি থামো! সব কথায় কেবল আমার বয়েস দেখাও কেন?
কীর্তিপদবাবু রেগে গেলেন এবার। বলতে লাগলেন কী হয়েছে তাই বলো!
তারপর সকলকে অগ্রাহ্য করে একেবারে সোজা সদানন্দকে ধরলেন।
বললেন–কী হয়েছে বলো তো দাদা? তোমার কী হয়েছে? তুমি কাঁদছো কেন? আমি এসে পর্যন্ত দেখছি তুমি যেন কী রকম হয়ে গেছ! গায়ে-হলুদের দিনে তুমি কোথায় লুকিয়ে রইলে। তারপর সকাল বেলা পুলিস-দারোগা এসে কী সব তদন্ত করে গেল। তারপর এখন আবার এই কাণ্ড। বলো তো এসব কী ব্যাপার? আমার কাছে কিছু লুকিও না–
হঠাৎ কৈলাস গোমস্তা এসে হাজির হলো।
বললে–বেয়াই মশাই, আপনাকে কর্তাবাবু একবার ডেকেছেন—
কীর্তিপদবাবু বললেন–দাঁড়াও বাপু, এখন এই ব্যাপারটার একটা ফয়সালা হয়ে যাক্–
ওদিকে ভিড়ের লোকজন আস্তে আস্তে সবাই এসে হাজির হয়েছিল চণ্ডীমণ্ডপের সামনে। প্রকাশ মামার এতক্ষণে সেদিকে নজর পড়েছে। তাদের দিকে চেয়ে তেড়ে গেল–এই, তোরা এখানে কী করতে এসেছিস, যা বেরিয়ে যা এখেন থেকে। কাজকর্ম কিছু নেই তোদের? যা, এখান থেকে ভাগ–
ক্রমে ক্রমে খবরটা বাড়ির ভেতরেও পৌঁছে গেল। খোকা নাকি বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছিল, শালাবাবু তাকে ধরে রেখেছে। ছোটবাবু সকলকে ডেকে নিয়ে গেছে চণ্ডীমণ্ডপে।
প্রীতি ভাঁড়ার ঘরের কাজে ব্যস্ত ছিল।
কথাটা শুনেই বললে–কেন, চলে যাচ্ছিল কেন খোকা? কোথায় যাচ্ছিল?
গৌরী পিসী বললে–চুপ করো বউদি, অত চেঁচিও না। নতুন বউ-এর কানে যাবে শেষকালে, একটু গলা নামিয়ে কথা বলো–
কর্তাবাবু নিজের ঘরে বসে তখন ছটফট করছিলেন। কৈলাস গোমস্তা ফিরে আসতেই বললেন কী হলো? বেয়াই মশাই এলেন না?
–হ্যাঁ, আসছে।
–খোকাকে আটকে রাখতে বলেছো তো? যেন পরশু দিনের মত বেরোতে না পারে!
–হ্যাঁ বলেছি। ছোটবাবু ধরে রেখেছেন খোকাবাবুকে।
–যদি কোনোও ফাঁকে বেরিয়ে যায়? শেষকালে ফুলশয্যার দিন যেন কেলেঙ্কারি করে না বসে।
কৈলাস গোমস্তা বললে–না, সে ব্যবস্থা পাকা হয়ে গেছে। খোকাবাবুকে আর একলা ছাড়া হবে না। বংশীকেও বলে দিয়েছেন ছোটবাবু, যেন তার ওপর নজর রাখে।
