তাই সেদিন যখন চৌধুরীবাড়িতে সবাই বৌভাতের উৎসব-অনুষ্ঠানের আয়োজনে হিম সিম খেয়ে মরছে তখন সদানন্দ একবার কালীগঞ্জ আর একবার থানা-পুলিস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে আকাশ-পাতাল পরিশ্রম করে বেড়াচ্ছিল।
কিন্তু দারোগাবাবু কোথাও কিছু খুঁত পেলে না। আতা গাছের তলায় চণ্ডীমণ্ডপের পেছনে বংশী ঢালীর যে আস্তানা ছিল সেখানেও সরেজমিনে তদন্ত করলে। কিন্তু সেখানে সব কিছুই স্বাভাবিক। কোথাও কিছু ব্যতিক্রম নেই।
অথচ এখানেই কাল মেয়েমানুষের গলার আর্তনাদ শুনতে পেয়েছিল সদানন্দ। অন্ধকারের মধ্যে অবশ্য স্পষ্ট কিছু দেখতে পাওয়া যায়নি। কিন্তু তার মনে হয়েছিল যেন কেউ কাউকে সেখানে খুন করে ফেলে রেখে গেছে। তখন যেন মানুষটা পুরোপুরি জ্ঞান হারায়নি। তখনও যেন চেষ্টা করলে তাকে বাঁচানো যায়। আর সেখানেই তার হাতে আর গেঞ্জিতে রক্তের ছাপ লেগেছিল।
দারোগাবাবু বললে–কিন্তু আমি তো কিছু অস্বাভাবিক দেখছি না এখানে–
বংশী ঢালীকেও জেরা করলো দারোগাবাবু। বংশী ঢালী বললে–হুজুর, আমি তো রাত্তিরে এখানেই শুয়েছি, আমার হাতে পায়ে তো রক্তের দাগ লাগেনি–
–তাহলে সদানন্দবাবুর গেঞ্জিতে রক্তের দাগ কোত্থেকে এলো?
–তা আমি কী করে জানবো হুজুর।
–বাড়িতে আর কোথাও কি মাছ মাংস কাটা হচ্ছিল?
–হ্যাঁ হুজুর, বাড়িতে অনেক লোক খাবে, খোকাবাবু সেখানে গিয়েছিলেন, হয়ত সেখানেই রক্ত লেগে থাকবে–
–শুধু বংশী ঢালী নয়, প্রকাশ মামাও সেই একই কথা বললে—
সদানন্দ বললে–তাই-ই যদি হবে দারোগাবাবু, তাহলে কালীগঞ্জের বউ গেল কোথায়? কালীগঞ্জে আমি কাল রাত্তিরেই গিয়েছিলুম, সেখানে তো তিনি ফিরে যাননি। সঙ্গের পালকি বেহারারাও ফিরে যায়নি কেউ। তারা তাহলে সবাই গেল কোথায়?
দারোগাবাবু বললে–সে এনকোয়ারি করবে কালীগঞ্জের দারোগা। কালীগঞ্জ আমার এক্তিয়ারের বাইরে।
–তাহলে? তাহলে একটা লোক খুন হয়ে যাবে আর আপনারা কেউ তার কোনও প্রতিকারই করবেন না? একজন নির্দোষ মানুষ অকারণে তার প্রাণ হারাবে? আপনি তাহলে একবার নিজে কালীগঞ্জে চলুন। নিজে সেখানে গিয়ে একবার একোয়ারি করুন–
কিন্তু সদানন্দ তখন জানতো না যে পাপেরও শেকড় থাকে। গাছের শেকড়ের মত পাপের শেকড়ও সারা দেশময় সারা পৃথিবীময় শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখে। আরো জানতো না যে দারোগা নবাবগঞ্জের খুনের তদন্ত করতে এসে কোনও খুঁত পায় না, কালীগঞ্জের দারোগার চরিত্রেও এই দারোগার পাপের রক্ত তার শেকড়ের শাখা বিস্তার করে রেখে দিয়েছে। বংশী ঢালীদের পাপ আবিষ্কার করে এমন সাধ্য শুধু নবাবগঞ্জের দারোগার কেন পৃথিবীর কোনও গঞ্জের দারোগারই বুঝি নেই।
কিন্তু তবু হাল ছাড়বার পাত্র নয় সদানন্দ। তবু সদানন্দ বললে–না, আমি তাহলে কালীগঞ্জের দারোগার থানায় যাই–
প্রকাশ মামা বললে–আরে তুই কি সত্যিই পাগল হলি সদা?
সদানন্দ বললে–পাগল আমি, না তোমরা? তোমরা সবাই পাগল। শুধু পাগল নয়, তোমরা শয়তান….
কথাটা বলে সদানন্দ বাইরে বেরিয়ে চলে যাচ্ছিল। প্রকাশ মামা তাকে ধরে ফেললে। বললে–কোথায় চললি তুই?
সদানন্দ বললে—কালীগঞ্জে–
প্রকাশ মামা বলে উঠলো-কালীগঞ্জে যাবি? কিন্তু বাড়িতে যে আজ তোর বৌভাত রে? তোর ফুলশয্যে
–বৌভাত ফুলশয্যা তো আমার কী?
–তার মানে? তোর বৌভাত তোর ফুলশয্যা, তোর জন্যেই তো এই সব কিছু! আমি যে এই খেটে মরছি, এ কার জন্যে? তোর জন্যেই তো! এই যে হাজার হাজার টাকা খরচ হচ্ছে, এ সবই তো তোর জন্যে আর তোর বউ-এর জন্যে! তুই-ই তো মজা মারবি, আর আমরা তো শুধু বুড়ো আঙুল চুষবো–
সদানন্দ বললে–কিন্তু আমার জন্যেই যদি এত সব, তাহলে আমার টাকা দিলে না কেন তোমরা?
–টাকা?
–হ্যাঁ, কালীগঞ্জের বৌকে যে দশ হাজার টাকা দেবার কথা ছিল তা দিলে না কেন দাদু? টাকা দিলে তো কোনও গণ্ডগোলই হতো না আর! তাহলে আমিও কিছু বলতুম না। টাকা তো দিলেই না, তার ওপর পাছে টাকা দিতে হয় তাই কালীগঞ্জের বৌকে খুন পর্যন্ত করলে বংশী ঢালীকে দিয়ে–
প্রকাশ মামা বললে–খুন? খুন হলে তুই বলতে চাস পুলিস-দারোগা টের পেত না? খুন বললেই ওমনি খুন করা যায়? তুই যা-তা বলছিস কেন?
সদানন্দর চোখ দিয়ে ততক্ষণে জল গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।
প্রকাশ মামা সদানন্দর চোখে জল দেখে থমকে গেল। বললে–এ কি রে, তুই কাঁদছিস? আজকে এত বড় একটা শুভদিনে তুই চোখের জল ফেলছিস! ছিঃ…
সদানন্দর তখন আর কথা বলবার ক্ষমতা নেই যেন। বললে–আমাকে ছাড়ো তুমি মামা, আমাকে ছাড়ো–-ছেড়ে দাও–
প্রকাশ মামা তখন আরো জোরে জাপটে ধরলে সদানন্দকে। বললে–পাগলামি করিস নে সদা, ছেলেমানুষি করবার তোর বয়েস নেই আর। এ সব জিনিস দশ বছর আগে করলে তখন মানাতো। এখন লোকে নিন্দে করবে তোর। তা ছাড়া এখুনি ফুলশয্যের তত্ত্ব আসবে। কেষ্টনগর থেকে, তারপর তোর শ্বশুর-শাশুড়ী আসবে–তারপর গা-সুষ্টু লোককে নেমন্তন্ন করা হয়েছে, তারা সব শুনে কী ভাববে বল তো…
হঠাৎ কীর্তিপদবাবু সেখান দিয়ে যেতে গিয়ে ঘটনাটা দেখে অবাক হলেন। প্রকাশ তার নাতিকে অমন করে জাপটে ধরে আছে কেন? সঙ্গে সঙ্গে কাছে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন–কী রে প্রকাশ, খোকাকে অমন করে ধরে কী করছিস? ও কী করেছে?
