হঠাৎ যেন তন্দ্রাটা ভেঙে গেল। তন্দ্রাটা ভাঙতেই নয়নতারা ধড়মড় করে চারদিকে চেয়ে দেখলে। একেবারে অন্য পরিবেশ। এখানে কেষ্টনগরের মত দেরি করে ঘুম থেকে উঠলে চলবে না। পাশের দিকে চেয়ে দেখলে জায়গাটা খালি। শাশুড়ী কখন বিছানা ছেড়ে উঠে চলে গেছে টের পায় নি। আর দেরি করলে না সে। বিছানা ছেড়ে উঠলো। হঠাৎ মনে পড়লো ঘোমটা দিতে হবে। আগের মত আর মাথা খালি রাখলে চলবে না।
–ওমা, তুমি উঠেছ?
গৌরী পিসী চুপি চুপি ঘরে উঁকি মেরে দেখতে এসেছিল বউ উঠেছে কিনা। উঠেছে দেখে বললে–ঘুম হয়েছিল তো বউমা? চা খাবে? চা খাওয়া অভ্যেস আছে তোমার?
নয়নতারা বললে–না–
–অভ্যেস নেই? অভ্যেস থাকলে বলল। বলতে লজ্জা করো না। আমাদের এখানে চা হয়। চা খাওয়ার লোক আছে এখানে। তোমার যে মামা-শ্বশুরকে দেখেছো, তোমাকে কেষ্টনগর থেকে এখানে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন, উনি চা খান, চা না হলে ওঁর একদণ্ড চলে না–
বাড়িটাতে তখন আবার লোকজনের গোলমাল শুরু হয়ে গেছে। আজ বউভাত। বিকেলের পর থেকেই লোকজনের আসা শুরু হবে। তার জন্যে চারদিকে ম্যারাপ বাঁধা হয়ে গেছে। তারপর কেষ্টনগর থেকে বাবা ফুলশয্যের তত্ত্ব পাঠাবে। বিপিন আসবে। তার কাছ থেকেই মা-বাবার খবর পাওয়া যাবে। হয়ত মা-বাবা আসতেও পারে। এখন থেকে সারা দিন আর বিশ্রাম নেই কারো।
–নাও নাও বউমা, কুয়োপাড়ে জল দিয়েছে, কাপড়-চোপড় নিয়ে যাও, চান করতে হবে। চলো আমি দেখে দিচ্ছি কোন্ শাড়িটা পরবে তুমি–
সকাল বেলা এবাড়িটার আবার অন্য চেহারা। কাল রাত্রে এখানকার অন্য চেহারা দেখেছে সে। তখন চারদিকের এই গাছপালাবাগান-পুকুর দেখে কেমন যেন জঙ্গল জঙ্গল মনে হয়েছিল তার কাছে। আর আজ রোদ ওঠবার পর সব যেন ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। সব কিছু যেন তার কাছে ভালো লাগতে লাগলো।
ততক্ষণে গ্রাম থেকে আরো কজন বউ-ঝি তাকে দেখতে এসেছে। কাল সন্ধ্যেবেলা যারা আসতে পারে নি তারা আজ দিনের আলোয় নতুন বউকে দেখবে। গরীব গ্রামের বউ-ঝি সব। খালি গা, খালি পা। জমিদার বাড়ির নতুন বউকে তারা দূর থেকে একবার শুধু দেখে যাবে। আর তারপর সন্ধ্যেবেলা এসে পাতা পেতে পেট ভরে খাবে আর ছাঁদা বেঁধে নিয়ে যাবে।
হঠাৎ কে যেন একজন দৌড়তে দৌড়তে ভেতরে এল।
–খুড়ীমা, পুলিস এসেছে বার বাড়িতে–
–পুলিস? পুলিসকে আবার কে নেমন্তন্ন করতে গেল রে? পুলিস কী করতে এল রে আবার? বউ দেখবে নাকি?
কথাটা তখন চারদিকেই রটে গেছে। পুলিস-দারোগা কী করতে আসে এখানে! কোনও চুরি ডাকাতি হয়েছে নাকি! না খুনখারাবি!
খবর এল–দারোগাবাবু ওপরে কর্তাবাবুর ঘরে বসে কথা বলছে–
–তাহলে উনি কোথায়? তোদের চৌধুরী মশাই?
–ছোটবাবুও তো সঙ্গে রয়েছেন।
–আর প্রকাশ? প্রকাশ কোথায় গেল। তাকে একবার আমার কাছে ডেকে আন তো বাবা–
সঙ্গে সঙ্গে একজন দৌড়লো শালাবাবুকে ডাকতে। নয়নতারার কানে সব কথাই যাচ্ছিল। তারও কেমন অবাক লাগলো। চুরি! ডাকাতি! খুন! কে কী চুরি করলো! আর যদি খুনই হয় তো কে-ই বা কাকে খুন করলো!
ছেলেটা আবার দৌড়তে-দৌড়তে ভেতরে এল। শাশুড়ী জিজ্ঞেস করলে–কী রে শালাবাবু কী বললে? আসছে?
–হ্যাঁ খুড়ীমা, শুনলাম কে নাকি এখেনে খুন হয়েছে, তাই পুলিস এয়েছে–
–খুন!
নয়নতারার মাথাটা এক মুহূর্তে যেন বোঁ-বোঁ করে ঘুরে উঠলো। খুন! খুন এখানে কখন হলো! কে খুন হলো! কে খুন করলো! কাকে খুন করলো!
নতুন জায়গায় এসে নতুন পরিবেশে কেমন যেন ভয় করতে লাগলো নয়নতারার। এ কেমন বাড়িতে তার বিয়ে হলো! বিয়ের পরের দিনই খুন! গৌরী পিসী সামনে দিয়ে যেতেই নয়নতারা তাকে ডাকলে–পিসীমা, পুলিস এসেছে শুনলুম, শুনলুম কে নাকি খুন হয়েছে?
গৌরী পিসী কথাটা হেসে উড়িয়ে দিলে। বললে–কে জানে বৌমা কে খুন হয়েছে, কার কপাল পুড়েছে–
নয়নতারা তবু ছাড়লে না। বললে–ওই যে কে এসে বলে গেল, তুমি শোন নি?
গৌরী পিসী বললে–আমার কি শোনবার সময় আছে বৌমা, যত ঝক্কি সব আমার ঘাড়ে চাপিয়েছে সবাই। তুমি ও-নিয়ে মাথা ঘামিও না বৌমা, ও-সব ভাববার অনেক লোক আছে এবাড়িতে। খানিক পরেই ফুলশয্যের তত্ত্ব আসবে, তাদের খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে, তারপর গাঁ-সুদ্ধ নেমন্তন্ন হয়েছে, তাদের ঝামেলা সমস্ত আমাকে পোয়াতে হবে–
বলতে বলতে আবার কোন্ দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল গৌরী পিসী।
বাড়ির ভেতরে তখন তুমুল কাজের ব্যস্ততা। কারোর যেন সময় নেই। শুধু কয়েকজন গ্রামের বউ-ঝি গিন্নীবান্নী মানুষ তার মুখের দিকে হাঁ করে চেয়ে আছে। যেন এক আজব বস্তুর সন্ধান পেয়েছে তারা নয়নতারার মধ্যে! যেন নয়নতারা তাদের মত মেয়েমানুষ নয়! যেন নয়নতারা অন্য জগতের জীব! তারা তার শাড়ি দেখছে, গয়না দেখছে, গায়ের রং দেখছে। মাথার খোঁপা দেখছে, চোখে চোখ রেখে যেন নয়নতারাকে গিলতে চাইছে সবাই।
হঠাৎ সেই মানুষটার গলা শোনা গেল আবার–মা, মা, মা কোথায়?
নয়নতারা মাথার ঘোমটাটা আরো বড় করে নিচের দিকে টেনে দিলে।
.
জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর একটা সহজ সম্পর্ক থাকেই। আমরা তা স্বীকার করি আর না-ই করি। একদিন সদানন্দর জন্ম হয়েছিল এই বাড়িতে। সেদিন এখানে উৎসব হয়েছিল বেশ ঘটা করে। ওই দাদুই সেদিন একটা সোনার হার দিয়ে নাকি নাতির মুখ দেখেছিল! রাণাঘাট থেকে মামলার শুনানী ছেড়ে নবাবগঞ্জে চলে এসেছিল। ভেবেছিল এই জন্ম এই আবির্ভাব এক শুভ-সূচনা। নিজের বংশকে চিরকালের মত সুপ্রতিষ্ঠিত করতেই এই জন্ম। কিন্তু সেদিনকার সেই শুভ-সূচনাকে এই এতদিন পরে এই হত্যা দিয়ে এই মৃত্যু দিয়ে কেন অভিষিক্ত করতে হলো। এও কি সদানন্দর জীবনের ক্রমবিকাশের পক্ষে এতই অপরিহার্য ছিল? কে জানে? নইলে হয়ত সদানন্দর জীবন এমন হতো না। সদানন্দ হয়ত আর পাঁচজনের মত এই নবাবগঞ্জের বংশধর হয়ে দাদু আর চৌধুরী মশাই-এর মত প্রজা খাতক আর সেরেস্তার কাগজপত্রের মধ্যেই জীবন কাটিয়ে দিত।
