কিন্তু ততক্ষণে সদানন্দ সেখান থেকে চলে গিয়েছে। তারপরে আরো রাত হলো। মেয়েদের ভিড়ের মধ্যে বসে বসে আরো অনেক মেয়েলী কথা কানে এল। সবাই তার রূপ দেখে প্রশংসা করছে। সবাই বলছে এমন বউ নাকি হয় না। কথাগুলো শুনতে খুব ভালো লাগলো নয়নতারার। নিজের রূপের প্রশংসা আগেও সে অনেক শুনেছে। বাপের বাড়ির লোকেরা বলতো এ মেয়ে যে বাড়িতে যাবে সে বাড়ি আলো করে রাখবে। বলতো যার সঙ্গে এ মেয়ের বিয়ে হবে সে নাকি বড় ভাগ্যবান। তাহলে এমন রাগারাগি কেন করলে তার সামনে? আর চব্বিশ ঘণ্টা পরেই তো ওই মানুষটার সঙ্গে তাকে একটা বিছানায় এক ঘরে কাটাতে হবে? তাহলে তারই সামনে মার সঙ্গে কেন অত রাগারাগি করতে গেল? তার রূপ দেখে তো তার ভুলে যাওয়া উচিত ছিল! একটা দিনের জন্যেও সে তার রাগ সামলাতে পারলে না? তাহলে কীরকম চরিত্রের মানুষ ও!
তারপর সবাই খেতে বসলো। তাদের মধ্যে নয়নতারাও খেতে বসেছে। খেতে খেতে কত লোকের কত কথা তার কানে এল। কত হাসাহাসি, কত গল্প। সকলেরই নজর নতুন বউ-এর দিকে। ভালো ভালো জিনিস তার পাতে দিয়েছে শাশুড়ী। নয়নতারার মনে হলো শাশুড়ী মানুষটা কিন্তু ভালো।
একবার শাশুড়ী বললে–কই বউমা, তুমি তো কিছু খাচ্ছো না? খাও, এরকম না খেলে চলবে কেন? মাছ খাচ্ছো না যে, ঝাল হয়েছে বুঝি? তুমি বুঝি ঝাল খাও না?
নয়নতারা ঘাড় নেড়ে ইঙ্গিতে জানালে সে ঝাল খায়। আর তা ছাড়া ঝাল সে খাক আর নাই খাক, সব জিনিস ‘হ্যাঁ’ বলতেই সে শিক্ষা পেয়েছে মার কাছে।
মা বলতো–শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে শাশুড়ী যা বলে তাই শুনবে মা, ‘না’ বোল না যেন।
–ঝাল খাও? তা হলে আর একখানা মাছ দেব, খাবে?
গৌরী পিসী বললে–জিজ্ঞেস করছো কেন বউদি, দাও না আর একখানা মাছ।
খেতে খেতে কেবল মার কথাই মনে পড়তে লাগলো নয়নতারার। এমন করে মাও তাকে খাওয়াতো আর বকতো। বলতো–কোথায় কাদের বাড়িতে পড়বি তখন হয়ত পেটই ভরবে না তোর। এখন দিচ্ছি খেয়ে নে। মেয়েমানুষ হয়ে যখন জন্মেছ তখন সব রকম অবস্থার জন্যে তোমাকে তৈরি হয়ে থাকতে হবে মা। বিয়ের আগে আমার কত বায়নাক্কা ছিল, এখন সে-সব কোথায় চলে গেল মনেও পড়ে না আর–
অচেনা মুখ অজানা দেশ, অদেখা পরিবেশ। তাই মার কথাগুলোই বারবার মনে পড়তে লাগলো নয়নতারার।
গৌরী পিসী হঠাৎ ভাবনার মাঝখানে বললে–চলো বউমা। শোবে চলো—
একটা বড় খাট। শ্বশুরের শোবার ঘর। সেখানেই সেদিনকার মত নয়নতারার শোবার ব্যবস্থা হয়েছে। একপাশে শাশুড়ী আর তার পাশে নতুন বউ। বাপের বাড়িতেও বয়েস হবার সঙ্গে সঙ্গে মা তাকে পাশে নিয়ে শুতো। আজই প্রথম অন্য বিছানায় অন্য লোকের পাশে শোওয়া। কাল থেকে আবার আর একজনের পাশে শুতে হবে তাকে।
আস্তে আস্তে চারদিকের সমস্ত শব্দ থেমে এল। রাত বাড়ছে। একটা পাতলা তন্দ্রার মধ্যে মনে হোল যেন কেষ্টনগরে মাও তাকে ভাবছে। মারও তার মতন একলা শুয়ে শুয়ে ঘুম আসছে না হয়ত। মারও যেন মনে হচ্ছে খুকুর কথা। খুকু সেখানে খেলে কিনা, খুকুর চোখে ঘুম এল কিনা। খুকু সেখানে এতক্ষণে হয়ত শাশুড়ীর পাশে শুয়ে মার কথা ভাবছে। আশ্চর্য, মেয়েমানুষের জীবনটাই ভগবান এক আশ্চর্য ধাতুতে গড়েছে! ছোটবেলা থেকে খাইয়ে-পরিয়ে মানুষ করে অন্য লোকের হাতে তুলে দিতে হয়। তারপর সেখানেই সে থাকবে। চিরকালের মত থাকবে। বাবা মার কথা আর ভাববে না। তখন তার নতুন সংসার নিয়েই মেতে থাকবে। তার সেই সংসারকেই সে নিজের সংসার বলে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে থাকবে। এই-ই নিয়ম। সংসারে আদিকাল থেকে বুঝি এই নিয়মই চলে আসছে মানুষের জীবনে।
–কই বউমা, তোমার ঘুম আসছে না বুঝি?
নয়নতারা একটু নড়তেই শাশুড়ী বোধ হয় বুঝতে পেরেছে।
শাশুড়ী বললে–নতুন জায়গা তো, তাই অসুবিধে হচ্ছে। দুদিন বাদে তখন আবার সব অভ্যেস হয়ে যাবে। ঘুমোও, ঘুমোতে চেষ্টা করো। কাল আবার বউভাত, সকাল থেকেই হই-চই শুরু হয়ে যাবে। তখন আর এক দণ্ডের জন্যে দু’চোখ এক করতে পারবে না। যতটুকু এখন পারো একটু ঘুমিয়ে নিতে চেষ্টা করো—
নয়নতারা দু’চোখ বুজে মার কথাগুলোই আবার ভাবতে শুরু করলে। মার কথা ভাবলেই মনটা কেমন আনন্দে ভরে যায়। সেই অন্ধকারের মধ্যে মার কথা ভাবতেই তার ভালো লাগলো তখন। সঙ্গে সঙ্গে নয়নতারার দু’চোখ যেন কখন ঘুমে জড়িয়ে এল।
নয়নতারা স্বপ্ন দেখতে লাগলো। ঠিক স্বপ্ন নয়, অথচ যেন স্বপ্নই! মন খারাপ দেখে বাবা যেন সান্ত্বনা দিচ্ছে–খুকুর কথা ভেবো না তুমি, সে খুব ভালো জায়গায় পড়েছে গো, সে কত বড় বাড়ি, কত জমি-জমা তাদের। তার সেখানে কোনও কষ্ট নেই, সে খুব আরামে আছে, তুমি তার কথা ভেবে মন খারাপ করো না
আসবার সময় মা নয়নতারাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়েছিল। বলেছিল–জন্ম এয়োস্ত্রী হয়ে থাকো মা, স্বামীর মন যুগিয়ে চলো, আশীর্বাদ করি হাতের শাঁখা সিঁথির সিঁদুর যেন তোমার অক্ষয় হয়…।
কথাগুলো বলছিল বটে মা কিন্তু মেয়েও যত কাঁদছিল মাও তত কাঁদছিল। তাদের দেখাদেখি আশেপাশে যারা দেখছিল তাদের চোখও আর শুকনো ছিল না। তারপর ট্রেনের টাইম হয়ে যাচ্ছিল। ঘন ঘন তাগাদা দিচ্ছিল বরকর্তা–কই বেয়াই মশাই, এত দেরি হচ্ছে কেন, ওদিকে যে ট্রেন ছেড়ে দেবে–মা-লক্ষ্মীকে একটু তাড়াতাড়ি করতে বলুন—
