গৌরী পিসী বললে–তুমি বউমা লজ্জা করো না যেন। খিদে-টিদে পেলে বলবে। এ এখন থেকে তোমারই বাড়ি মনে করে নাও। প্রথম প্রথম বাপ-মায়ের জন্যে একটু মন কেমন করবে বটে, কিন্তু তারপর দেখবে যখন সেয়ামীর ওপর মন বসে যাবে তখন আর কেষ্টনগরে যেতেই মন চাইবে না। সোয়ামী এমন জিনিস গো–
সমস্ত অচেনা পরিবেশের মধ্যে নয়নতারার কাছে তখন সব কিছুই খারাপ লাগছিল। শুধু ভালো লাগছিল গৌরী পিসির কথাগুলো।
গৌরী পিসী বলল–আমি তোমার আপন পিস-শাশুড়ী নই গো, আপন পিস-শাশুড়ী নই! তুমি বুঝি ভাবছো আমি তোমার আপন পিস-শাশুড়ী?
নয়নতারা কী আর উত্তর দেবে! ‘হ্যাঁ’ ‘না’ কিছুই তার মুখ দিয়ে বেরোল না।
গৌরী পিসী বললে–আমার সামনে লজ্জা করো না বউমা, তোমার গায়ের বেলাউজ খুলে ফেল, আমি পিঠে সাবান মাখিয়ে দিই–
তবু নয়তারার কেমন লজ্জা করতে লাগলো।
গৌরী পিসী বললে–খোল খোল, লজ্জা কী, কাক-পক্ষীতে দেখতে পাবে না তোমাকে, তোমার চানের জন্যেই তো এই জায়গা তৈরি হয়েছে–
এবার নয়নতারা প্রথম কথা বলে উঠলো। বললে–আপনারা কোথায় চান করেন?
–আমরা? আমরা সবাই ওই পুকুরে। পুকুরে বাঁধানো ঘাট আছে। তোমার শাশুড়ীও সেখানে চান করে। প্রথম প্রথম তুমি এই কুয়োপাড়ে চান করো। শেষকালে একটু পুরোন হয়ে গেলে তুমিও আমাদের মত পুকুরের ঘাটের পৈঁঠেতে বসে চান করবে–
নয়নতারার পিঠে তখন গৌরী পিসী ঘষ ঘষ করে সাবান ঘষতে আরম্ভ করেছে।
সাবান ঘষতে ঘষতেই গৌরী পিসী বললে–আমাদের এইটুকু জায়গায় চান করে সুখ হয় না মা। তোমার শাশুড়ী আর আমি তো আগে সাঁতার কেটেছি কত…তা তুমি সাঁতার জানো তো বউমা?
–সাঁতার? আমি তো সাঁতার জানি না?
–সাঁতার জানো না? তা তোমাদের কেষ্টনগরে বুঝি বাড়িতে পুকুর-ঘাট নেই?
নয়নতারা বললে–না, আমাদের টিউবওয়েল আছে—
গৌরী বললে–ও আমি দেখেছি, ওই সদার মামার বাড়িতে ওই কল আছে, টিউবকল। ঢেঁকির মত পাড় দিতে হয়, বুঝতে পেরেছি। তা তোমার ভাবনা নেই বউমা, আমি তোমাকে সাঁতার শিখিয়ে দেব। এই দু’চার দিন ঝাঁপাই ঝুড়লেই তোমার রপ্ত হয়ে যাবে, তখন দেখবে জল ছেড়ে আর উঠতে ইচ্ছে করবে না–
তারপর গা-ধোওয়া, ভিজে কাপড় ছেড়ে শুকনো কাপড় বদলানো, মুখে পাউডার মাখা, চুল আঁচড়ে নতুন খোঁপা বাঁধা সবই করিয়ে দিলে গৌরী পিসী। নয়নতারার জন্যে নতুন ঘর। ঘরের ভেতর নতুন খাট, নতুন আলমারি, নতুন গদি-বিছানা।
গৌরী পিসী নয়নতারাকে সেই ঘরের মধ্যে নিয়ে গেল।
বললে–এই দেখ, এই হলো তোমার শোবার ঘর। কালকে এইখানে তোমার ফুলশয্যে হবে–
নয়নতারা দেখলে।
গৌরী পিসী বললে–আজ একটা রাত কোনও রকমে নাক-কান বুঁজে কাটাও, কাল রাত থেকে এখেনে তোমরা দুজনে শোবে।
নয়নতারা এর জবাবেও কিছু বললে–না। শুধু কান দিয়ে কথাটা শুনলো।
কিন্তু বেশিক্ষণ সে ঘরে থাকা হলো না। পেছন থেকে শাশুড়ীর গলা শোনা গেল –ওলো, ও গৌরী, বউমাকে খেতে দিয়েছিস?
সত্যিই খাবার কথা মনে ছিন না গৌরী পিসীর। বললে–চলো বউমা, ওদিকে তোমার শাশুড়ী আবার রাগ করবে, এসো এসো। এখন আর এসব দেখে কী হবে! কাল থেকে তো এখেনেই চিরকাল কাটাতে হবে তোমাকে। তখন দরজায় হুড়কো দিয়ে থাকবে তোমরা, কাউকেই আর ভেতরে ঢুকতে দেবে না। এসো–
ভেতরে জলখাবারের বন্দোবস্ত হয়েছিল। শাশুড়ী বললে–এখন এই মিষ্টি কটা খেয়ে নাও বউমা, তারপরে রাত্তিরের খাওয়া পরে খেও। তখন পেট ভরে লুচি তরকারি মাছ মাংস খেও–গৌরী, ঠাণ্ডা জল দে বাছা বউমাকে–
মিষ্টিগুলোর দিকে চেয়ে নয়নতারা ভাবছিল অত খাবে কী করে! হঠাৎ বাইরে যেন কীসের আওয়াজ হলো। কীসের আওয়াজ! মুখটা তুলতেই হঠাৎ চোখে চোখ পড়ে যাওয়াতে মাথায় ঘোমটা টেনে দিলে। সদানন্দ!
সদানন্দ ভেতরে এসে নয়নতারাকে দেখে প্রথমে একটু দাঁড়ালো। তারপর ডাকলে–মা, মা কোথায়?
মা আসবার আগেই গৌরী পিসীকে দেখে বললে–পিসী, কালীগঞ্জের বউ এখানে এসেছে?
গৌরী পিসী তো অবাক। বললে–হ্যাঁ এসেছিল, কিন্তু সে তো চলে গেছে–
–কোথায় চলে গেছে? কোন দিকে?
ততক্ষণে মা এসে গেছে ভাঁড়ার ঘরের দিক থেকে। বললে–কী রে খোকা? কী চাস?
সদানন্দ বললে–কালীগঞ্জের বউ ভেতরবাড়িতে এসেছিল?
–কেন? তার সঙ্গে তোর কী দরকার?
সদানন্দ বললে–দরকার আছে। তুমি বলো না কোন্ দিকে গেল?
–তা কী দরকার তাই বল না। তাকে তো নেমন্তন্ন করা হয় নি, কিছুই না, তবু সে কেন আসে এ বাড়িতে? আবার বুঝি তোকে টেনে নিয়ে গিয়ে তার বাড়িতে আটকে রাখবে? ভারি তো একটা তিন টাকা দামের বাঁধিপোতার গামছা দিয়ে আদিখ্যেতা করতে এসেছে। যেন আমরা গামছা কিনতে পারি না, আমাদের গামছা কেনবার যেন পয়সা নেই! ঢং, মাগী ঢং দেখাতে এসেছে
সদানন্দ রেগে গেল। বললে–তোমার ওসব কথা শুনতে চাই নি আমি, আমি যা জিজ্ঞেস করছি তারই জবাব দাও তুমি, বলো কালীগঞ্জের বউ ভেতর-বাড়িতে এসেছিল কি না–
মা বললে–তা সে যদি এসেই থাকে তো তোর কী? তোর সঙ্গে তার কীসের সম্পর্ক?
সদানন্দ বললে–আমার সম্পর্কের কথা আমি বুঝবো, আমি যা জিজ্ঞেস করছি আগে তার জবাব দাও তুমি—
নয়নতারা চুপ করে সব শুনছিল। এরই সঙ্গে তার কাল বিয়ে হয়েছে। মানুষটাকে খুব রাগী লোক বলে মনে হলো তার কাছে। কিন্তু কালীগঞ্জের বউ কে! বাসর-ঘরে তো এরই কথা হয়েছিল, এখন মনে পড়লো। অথচ আশ্চর্য, এ যে এত রাগী মানুষ চেহারা দেখে তো তা বোঝা যায় না।
