দারোগাবাবু বললে–আপনি থামুন, আমি যাকে জিজ্ঞেস করছি তিনিই উত্তর দেবেন।
তারপর প্রকাশ মামার দিকে চেয়ে দারোগাবাবু আবার বলতে লাগল–তারপর কখন আপনার শামিয়ানা খাটানো শেষ হলো?
প্রকাশ মামা বললে–ধরুন তখন মাঝ-রাততির–
–তখনও কি কিছু সন্দেহ করেছিলেন যে এ বাড়িতে কেউ খুন হয়েছে?
প্রকাশ মামা বললে–রাম, সে সন্দেহ করতে যাবো কেন? ওই আমার, ভাগ্নেই কেবল সকলকে বলে বেড়াতে লাগলো কালীগঞ্জের বউ কোথায় গেল, কালীগঞ্জের বউ কোথায় গেল! তা আমি বললুম কালীগঞ্জের বউ কোথায় আবার যাবে? কালীগঞ্জেই আছে কিন্তু ও কিছুতেই তা শুনবে না। শেষ পর্যন্ত সেই রাত্তিরে আমার ভাগ্নে কালীগঞ্জে গেল। গিয়ে যখন ফিরে এল তখন আমার ঘড়িতে রাত প্রায় একটা। সেখানেও নেই। তখন পাগলের মতন ছটফট করতে লাগলো। তখন আমি বললুম–এতই যদি তোর সন্দেহ তাহলে পুলিসে খবর দে! আমার কথাতে তখন ও আপনার কাছে গেল–
–আপনি তাহলে বলতে চান এ বাড়িতে কেউই খুন হয় নি?
প্রকাশ মামা বললে–তা হলে তো আমিই আগে জানতে পারতুম। তখন সকলের আগে আমিই আপনাকে গিয়ে খবর দিতুম।
পুলিসের কাজ বড় নিখুঁত। বিশেষ করে কেষ্টগঞ্জের পুলিসের। তারা নবাবগঞ্জের নরনারায়ণ চৌধুরীর কোনও কাজেই কোনও দিনই খুঁত পায় নি। এর আগে নবাবগঞ্জে যতবার লাঠিবাজি হয়েছে, জমি দখল হয়েছে, বিশেষ করে সেই যেবার বারোয়ারিতলার অশ্বথ গাছের ডালে কপিল পায়রাপোড়া গলায় দড়ি দিয়েছিল, কোনও বারেই কেষ্টগঞ্জের দারোগারা কোথাও কোনও খুঁত পায় নি। প্রত্যেকবারই নবাবগঞ্জে এসেছে, এসে কর্তাবাবুর দোতলার দরজা বন্ধ ঘরে বসে বসে নিরিবিলিতে সব মামলার ফয়সালা হয়ে গেছে, কোর্ট পর্যন্ত আর সে-সব গড়ায় নি।
আর আশ্চর্য ওই বংশী ঢালীর দল! তাদের যেন কোনও যুগেই শাস্তি হতে নেই। তারা যেমন সেই ইতিহাসের আদি যুগেও ছিল, তেমনি এখনও আছে, আবার সুদূর ভবিষ্যতেও তারা থাকেবে। তাদের জন্যে পেনাল-কোড তৈরী হয়েছে, থানাপুলিস, কোট-কাছারির ব্যবস্থা হয়েছে, জজ-ম্যাজিস্ট্রেটদের মোটা মাইনে দিয়ে পোষা হয়েছে। তবু তারা নিঃশেষ হয় নি। তাদের বংশ বেড়েই চলেছে বরাবর। এ যে কেমন করে সম্ভব হয় তা হয়ত ওই নরনারায়ণ চৌধুরীরাই একমাত্র বলতে পারেন, আর বলতে পারে তাদের সিন্দুকের টাকা। আর টাকা তো মানুষ নয়, আর টাকার মুখও নেই, তাই হয়ত সে মুখের ভাষাও নেই। যদি ভাষা থাকতো তা হলে বলতো–আমিই সব, আমিই সৃষ্টি, আমিই স্থিতি, আবার আমিই প্রলয়। একাধারে আমিই নরনারায়ণ চৌধুরী, আমিই বংশী ঢালী আবার আমিই পুলিস। উকিল-জজ-আসামী-ফরিয়াদী সব কিছুই আমি। সুতরাং আমাকেই তোমরা মনে-প্রাণে ভজনা করো।
সেইজন্যেই সেদিন বংশী ঢালীর ভয় ছিল না। খোকাবাবু যখন কালীগঞ্জের বউকে সারা বাড়ির ভেতরে খুঁজে বেড়াচ্ছে তখন বংশী ঢালীরা গা-ঢাকা দিয়ে আতা গাছের অন্ধকারে চণ্ডীমণ্ডপের দরজার তালা আবার খুলেছে। তাদের সব কাজ পাকা হাতের কাজ। আগের বারে তাড়াতাড়িতে কাজটা কেঁচে গিয়েছিল। তাই খোকাবাবুর গেঞ্জিতে-ধুতিতে রক্ত লেগে গিয়েছিল। এবার আর তা নয়। এবার সমস্ত ঘরের মেঝে, দেয়াল, দরজা-জানলা জল দিয়ে ধুয়ে একেবারে সাফ করে ফেললে। তারপর সেই চণ্ডীমণ্ডপের খিড়কী দিয়ে লাশটা নিয়ে উধাও হয়ে গেল একদল। আর গেল পালকি বেহারাদের অদৃশ্য করে দিতে। বেহারারা তখনও সদরের সামনে মা-জননীর জন্যে হা-পিত্যেশ করে দাঁড়িয়ে ছিল।
একজন কাছে গিয়ে বললে–হ্যাঁ গো, কালীগঞ্জের লোক এখানে কারা?
দুলাল বললে–আমরা গো বাবু, আমরা–
লোকটা বললে–আরে, তোমাদেরই তো খোঁজাখুঁজি হচ্ছে। এতক্ষণ তোমাদের খুঁজে খুঁজে হয়রান। তোমরা বার বাড়ির উঠোনে ছিলে, তোমাদের আবার বাইরে আসতে কে বললে?
–আজ্ঞে, একজন বাবুমশায় তো আমাদের এখেনেই দাঁড়াতে বললে। আমাদের জন্যে তাঁর কাজের অসুবিধে হচ্ছিল।
–কী মুশকিল দেখ দিকিনি। আর এদিকে মা-জননী তোমাদের খুঁজে খুঁজে মরছে। খুব লোক যা’হোক তোমরা।
–তা মা জননী কোথায়?
–আরে, তিনিই তো ডেকে পাঠিয়েছে তোমাদের। এসো, আমার সঙ্গে এসো, পালকি তুলে নিয়ে এসো–
–কিন্তু কোথায় মা-জননী? কোন দিকে?
তখন চৌধুরীবাড়িতে হ্যাজাগবাতি জ্বলে উঠেছে। পুকুরপাড়ে মিষ্টির ভিয়েন বসেছে, তারও ও-পাশে আলোর ব্যবস্থা হয়েছে। মাছ-মাংস কাটা হচ্ছে। আর একদিকে লোহার কড়ায় গরম ঘিয়ের ওপর ময়দার লুচিগুলো ফোস্কার মত ফুলে ফুলে উঠছে। বাড়ির লোকজন খাবে, খাবে বাড়ির কর্তা-গিন্নিকুটুম। তার সঙ্গে খাবে নতুন বউ।
নয়নতারা বিকেল থেকে এসে ঘরের মধ্যে এক জায়গায় বসে আছে। আগের রাতে বাসর-ঘরে ঘুমোতে পারে নি। তারপর সকাল বেলা কাঁদতে কাঁদতে ট্রেনে উঠেছে। তখন থেকে ঘোমটা দেওয়া অবস্থায় সমস্ত রাস্তাটা কাটিয়েছে। এ বাড়িতে এসে যে বেশি করে যত্ন করেছে সে হলো গৌরী পিসী।
গৌরী পিসীরই যেন যত জ্বালা। বললে–ওলো, তোরা একটু সর তো বাছা, বউমাকে একটু হাঁফ ছাড়তে দে। সর বাছা তোরা সব–এখন তোরা যার-যার বাড়ি যা, কালকে আবার বউ দেখতে আসিস–
তারপর নয়নতারার হাতখানা ধরলে।
বললে–এসো বউমা এসো, মুখ-হাত-পা ধুয়ে নাও, কুয়ো-পাড়ে চলো—
তা ব্যবস্থা ভালোই করেছিল। কুয়োর কাছে একপাশে খানিকটা জায়গা চাটাই দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছিল নতুন বউ-এর জন্যে। একটু আড়াল হবে। নতুন বউ তো আর আমাদের মত গা খুলে চান করতে পারবে না। তার জন্যে আড়াল চাই। চান করবে, সাবান মাখবে, গা ডলবে।
