কিন্তু বংশী তারই মধ্যে আবার এসে হাজির হয়েছে তখন।
–এখানে কি করছো খোকাবাবু?
–ঘরের ভেতরে কী বংশী? গোঙ্গাচ্ছে কে?
বংশী ঢালী সেকথার উত্তর না দিয়ে বললে–কর্তাবাবু তোমাকে ডাকছে খোকাবাবু, লোক এসেছে, তাড়াতাড়ি ডেকেছে–
–আমাকে? আমাকে ডেকেছে?
বংশী ঢালী বললে–হ্যাঁ–এখুনি দেখা করে এসো–
–কিন্তু তোমার এই ঘরের মধ্যে কে?
বংশী ঢালী বললে–ঘরের মধ্যে আবার কে থাকবে? আমি তো তালা-চাবি দিয়ে রেখেছিলাম। খুললে কে? বলে ট্যাঁকের ঘুনসী থেকে একটা চাবি বার করে বোধ হয় তালাটা আবার বন্ধ করবার চেষ্টা করতে লাগলো।
–কিন্তু ঘরের মধ্যে কার গলার আওয়াজ শুনলুম, ওখানে কে আছে বলো তো? বলো ওখানে কি হয়েছে? কে আছে ওখানে?
কিন্তু বংশী ঢালী অত সহজে ভাঙবার পাত্র নয়। বললে–তুমি ভূত দেখেছ খোকাবাবু, ভূতের ভয় লেগেছে তোমার নিশ্চয়।
সদানন্দ বললে–বাজে কথা রাখো, বলো ভেতরে কী হয়েছে? বলো ভেতরে কে আছে? তুমি নিশ্চয় কালীগঞ্জের বউকে ভেতরে আটকে দিয়েছ–এখনও বলল কে ওখানে?
বংশী ততক্ষণে দরজায় বেশ করে তালাচাবি বন্ধ করে আবার চলে যাচ্ছিল। সদানন্দ ছাড়লে না, বললে–বলো, কে ওখানে আছে? কাকে তালাচাবি বন্ধ করে রেখেছ?
বলতে বলতে বংশীর পেছন-পেছন একেবারে সদরের বার বাড়ির কাছে এসে পড়েছিল। প্রকাশ মামা দেখতে পেয়েছে। বললে–এ কী রে, তোর গেঞ্জিতে এত রক্ত কেন?
.
এসব অনেক দিন আগেকার ঘটনা। তবু এতকাল পরে চৌবেড়িয়া থেকে বেরিয়ে নবাবগঞ্জের পথে যেতে যেতে সেইদিনকার সেই সব কথাগুলোর যেন নতুন মানে করবার চেষ্টা করতে লাগলো সদানন্দ। এতকাল পরে নবাবগঞ্জে গেলে সেখানে কী দেখবে কে জানে! সেই নবাবগঞ্জ কি আর সেরকম আছে! ইতিহাসের কষ্টিপাথরে যখন সব জিনিসেরই আসল নকল যাচাই হয়ে যায় তখন নবাবগঞ্জেরও হয়ত একটা নতুন যাচাই হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। সেই ফুলশয্যার আগের রাত্রের সেই দুর্ঘটনার কথা আজ সে ছাড়া কি আর কারো মনে আছে! আর মনে থাকলেও তার জীবনে এ ঘটনার তাৎপর্য যেমন করে ছায়াপাত করেছে তেমন করে আর কার জীবনে ছায়াপাত করবে? শুধু নবাবগঞ্জ কেন, পৃথিবীতে কোনও দুর্ঘটনাই তো কাউকে চিরকালের মত এমন অভিভূত করে রাখে না। সংসারে বোধ হয় তাই সে-ই একমাত্র ব্যতিক্রম। সে তো আর সকলের মত সুখে-স্বচ্ছন্দে স্ত্রী-পুত্র-সংসার নিয়ে আপোস করে চললেই পারতো! কেন তবে সব থাকতে সে এই চৌবেড়িয়ার অতিথিশালায় অজ্ঞাতবাসের দুর্ভোগ সইছে!
পরের দিন কেষ্টগঞ্জ থেকে পুলিস এসে সেই কথাই জিজ্ঞেস করেছিল।
বলেছিল–আপনি কেমন করে বুঝলেন যে এখানে খুন হয়েছিল? খুন হলে তো রক্তের দাগ থাকবে!
সদানন্দ বলেছিল–কিন্তু আমার গেঞ্জিতে রক্তের দাগ লেগে রয়েছে, আমার কাপড়ে রক্তের দাগ লেগে রয়েছে, আমার হাতেও তখন রক্তের দাগ লেগে ছিল। সে দাগ সবাই দেখেছে–
পুলিসের দারোগাবাবু তার আগেই কর্তাবাবুর সঙ্গে দরজা বন্ধ ঘরের মধ্যে আধ ঘণ্টারও বেশি কথাবার্তা বলেছে। সদানন্দ জানতো না ফয়সালা যা হবার তা সেখানেই সব কিছু হয়ে গেছে। এসব ব্যাপারে ফয়সালার জন্যে কর্তাবাবুর সিন্দুকের ভেতরে সব সময়েই মশলা মজুদ থাকে। সেই মশলা দিয়েই নরনারায়ণ চৌধুরী এতদিন রাজত্ব করে আসছেন। প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা প্রতাপ সব কিছু কায়েম করে সকলের মাথার ওপরে বসে আছেন। শুধু পুলিসের দারোগা কেন কোর্টের জজ থেকে শুরু করে আদালতের পেয়াদা পর্যন্ত ওই মশলার জোরে তাঁর কাছে মাথা নীচু করেছে।
তাই কেষ্টগঞ্জের দারোগার কানে সেদিন সদানন্দর কথাগুলো ভালো লাগে নি।
দারোগাবাবু জিজ্ঞেস করেছিল–কিন্তু কাকে খুন করা হয়েছে?
সদানন্দ বলেছিল–কালীগঞ্জের বউকে। কালীগঞ্জের জমিদারের বিধবা স্ত্রী–
–কিন্তু তাঁকে তো নেমন্তন্ন করা হয় নি। তিনি কেন ফুলশয্যার আগের দিন বিনা নিমন্ত্রণে আসতে যাবেন?
সদানন্দ বলেছিল–তাই যদি হয় তাহলে তিনি গেলেন কোথায়? কালীগঞ্জেও তো তিনি নেই। তিনি তো কালীগঞ্জেও ফিরে যান নি। তার পালকি-বেহারাদেরও তো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমন কি তার পালকিটাও তো কোথাও নেই।
সত্যিই এ বড় আশ্চর্য কাণ্ড! কালকে যে মানুষটাকে সবাই দেখেছিল, একখানা শাড়ি নিয়ে এসে নতুন বউকে আশীর্বাদ করে গেছে, সে মানুষটা এমন করে অদৃশ্য হলোই বা কী করে! এমন কি তার পালকিটা পর্যন্ত রাতারাতি অদৃশ্য হয়ে গেল কী করে!
কিন্তু সাক্ষ্য দেবার সময় সবাই বললে–কই, আমি তো পালকি দেখি নি!
দারোগাবাবু বারবার সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন–আপনারা কেউই দেখেন নি কালীগঞ্জের বউকে?
সবাই একবাক্যে বললে–আজ্ঞে না, আমাদের কাজকর্ম ছিল, কারো দিকে দেখবার মত সময় ছিল না তখন।
–আর আপনি? আপনি দেখেছেন? আপনিই তো সদরে দাঁড়িয়ে শামিয়ানা খাটাচ্ছিলেন। সবাই বললে।
প্রকাশ মামার কাজের তখনও শেষ হয় নি। পুলিস দেখে তার পিত্তি জ্বলে গিয়েছিল। বললে–আমি? আমাকে বলছেন দারোগাবাবু? আমার কি মরবার ফুরসৎ আছে? যতক্ষণ না ফুলশয্যা কাটে ততক্ষণ আমার মরবার পর্যন্ত ফুরসৎ নেই
সদানন্দ মাঝখানে বলে উঠলো–কিন্তু মামা তুমি তো কালীগঞ্জের বউকে পালকি থেকে নামতে দেখেছ, তুমিই তো বেয়ারাদের সদর থেকে পালকি সরিয়ে নিয়ে যেতে বলছে! এখন তুমি সব বেমালুম ভুলে গেলে?
