কিন্তু ভেতর বাড়িতে যখন এসব মন্তব্য চলেছে কালীগঞ্জের বউ তখন সোজা বার বাড়ির উঠোনে গিয়ে দুলালকে খুঁজছে। কোথায়, দুলালরা কোথায় গেল! তাদের পালকি! পালকিটাই বা গেল কোথায়?
প্রকাশ মামা বাইরে শামিয়ানা খাটানো নিয়ে ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ পালকিটা দেখতে পেয়ে বললে–তোমরা এখেনে কেন হে? এখানে পালকি রেখে আমার জায়গা আটকে রেখেছে। কেন? যাও যাও, বাইরে যাও
দুলালরা পালকি সরিয়ে নিয়ে একেবারে রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। আর ভেতরের দিকে চেয়ে দেখছিল। মা-জননী এখনও আসছে না কেন? কালীগঞ্জে ফিরে যেতে যে রাত পুইয়ে যাবে!
সদানন্দ সামনে দিয়ে যেতে গিয়েই পালকিটা তার নজরে পড়লো। এ তো চেনা পালকি!
বললে–হ্যাঁ গো, এ পালকি কার? কালীগঞ্জের বউ এসেছে নাকি?
দুলাল বললে–আজ্ঞে হ্যাঁ, মা-জননী এসেছে–
–তা কোথায় তিনি?
–ভেতরে গেছেন–
সদানন্দ আর দাঁড়াল না। এক দৌড়ে ওপরে দাদুর ঘরে চলে গেল। কালীগঞ্জের বৌ এখানে এসেছে নাকি কৈলাস কাকা?
কৈলাস গোমস্তা কী বলবে ভেবে পেলে না। তারপর বললে–আমি তো ঠিক জানি নে খোকাবাবু–
কর্তাবাবুর কানেও কথাটা গিয়েছিল। বললেন–কে? কে কথা বললে–কৈলাস? খোকা না?
কিন্তু সদানন্দ আর সেখানে দাঁড়ালো না। তাহলে নিশ্চয় ভেতর-বাড়িতে গেছে।
–মা!
–কী রে খোকা?
–হ্যাঁ মা কালীগঞ্জের বউ এসেছে বুঝি? কোথায়?
–এই তো এখুনি বউর মুখ দেখে চলে গেল।
সদানন্দ বললে–কিন্তু এখানেই কোথাও আছে, পালকি যে বাইরে রয়েছে দেখলুম–
বলে তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে গেল আবার। কীর্তিপদবাবু তার ঘরের মধ্যে বসে তামাক খাচ্ছিলেন। নাতিকে দেখে বললেন–এই যে খোকা, কোথায় গিয়েছিলে?
কিন্তু ও-সব বাজে কথা বলবার তখন সময় ছিল না সদানন্দর। সেখান থেকে সোজা বার বাড়িতে গিয়ে একেবারে প্রকাশ মামার সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড়ালো।
–মামা, কালীগঞ্জের বৌ এসেছে বুঝি?
–হ্যাঁ, দেখলাম তো তাই।
–কিন্তু গেল কোথায়? কোথাও তো দেখতে পাচ্ছিনা–বাবার কাছে চণ্ডীমণ্ডপে আছে নাকি?
সেখান থেকে চণ্ডীমণ্ডপে। সদানন্দর মনে হলো এক মুহূর্ত দেরি হলে যেন আর কালীগঞ্জের বউকে দেখতে পাবে না সে। কিন্তু বিয়েবাড়িতে তো আসবার কথা ছিল না কালীগঞ্জের বউ-এর। তবে কি দাদুর কাছে টাকা চাইতে এসেছে? দাদু কি টাকা দিয়েছে তাহলে? দাদু কি তাহলে কথা রেখেছে? সেই দশ হাজার টাকা!
ভাবতে ভাবতে সমস্ত বাড়িটা চষে ফেলতে লাগলো সদানন্দ। এত ভিড় চার দিকে! সমস্ত লোকের মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে খুঁজতে লাগলো তার সেই আসল লক্ষ্যবস্তুটাকে। কই, কোথায় গেল কালীগঞ্জের বউ? পালকি থাকতে তো হেঁটে ফিরে যাবে না এখান থেকে।
শেষকালে সে আবার ফিরে এল সদরে। তখনও দুলালরা বার বাড়ির দিকে হা করে চেয়ে আছে।
–কী গো, তোমাদের মা-জননী এসেছে?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, আমরা তো মা-জননীর জন্যেই হা-পিত্যেশ করে তখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি। সন্ধ্যের আগেই রওনা দেবার কথা আমাদের–
–তাহলে দেখি, কোথায় গেল—
বলে সদানন্দ আবার ভেতরের দিকে ঢুকলো। হ্যাজাগ বাতি লাগানো হচ্ছে গেটের ওপর। প্রকাশ মামা কোমরে তোয়ালে বেঁধে সেই তদারক করতেই ব্যস্ত। বাজে কাজে সময় নষ্ট করবার অবসর নেই তার। চারিদিকে তীক্ষ্ণ নজর। সদানন্দকে দেখেও যেন দেখলে না প্রকাশ মামা।
কিন্তু বংশী ঢালী তার কাজে কখনও ঢিলে দেয় নি জীবনে। সে যে কখন নিঃশব্দে সকলের চোখের আড়ালে তার ডিউটি শেষ করে বসে আছে তা কেউ জানতে পারে নি। কিন্তু এটাও যে খুব সোজা কাজ তা নয়। কালীগঞ্জে যখন চক্রবর্তী মশাই-এর কাছে সে কাজ করতো তখন সে এই কালীগঞ্জের বউকেই একদিন মা-জননী বলে ডেকেছে। একদিন এরই নিমক খেয়েছে। কিন্তু বংশী ঢালীরা টাকার জন্যে সব করতে পারে। টাকার বদলে তাদের নিমকহারামী করতেও বুঝি বাধে না?
–কে? ওখানে কে?
বংশী ঢালীরা তখন নিঃশব্দে তাদের কাজ সমাধা করে ফেলেছে।
–কে? কে ওখানে?
সদানন্দর মনে হলো চণ্ডীমণ্ডপের পেছনে আতা গাছের ঝোঁপের তলার অন্ধকারে যেন ফিসফিস করে কারা কথা বলছে।
সদানন্দ কাছে যেতেই বংশী ঢালী অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল।
সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে–বংশী, এখানে অন্ধকারে কীসের একটা আওয়াজ হলো না? যেন মেয়েমানুষের গলার মত আওয়াজ পেলাম–
বংশী অবাক হয়ে গেল–মেয়েমানুষের গলার আওয়াজ! এখানে মেয়েমানুষের গলার আওয়াজ কোত্থেকে আসবে খোকাবাবু?
–তা তুমি এখেনে এখন কি করছিলে? সবাই কাজ করছে আর তুমি এই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কী দেখছো?
বংশী বললে–না, এই আমার ঘরে ঢুকেছিলাম, এখন বেরোচ্ছি–
বলে কথা এড়াবার জন্যে তাড়াতাড়ি বার বাড়ির লোকজনের ভিড়ের দিকে চলে গেল। কিন্তু সদানন্দর কেমন সন্দেহ হলো। এ জায়গাটা একেবারে নিচ্ছিদ্র অন্ধকার ঘুরঘুট্টি। বংশী চলে যাবার পর সদানন্দও চলে আসছিল। কিন্তু আবার সেই অন্ধকারের দিকেই ফিরে গেল। বংশীকে দেখলেই কেমন ভয় করতে সদানন্দর। ও এমন সময় এখানে একলা থাকবার লোক তো নয়। আর এদিক থেকেই তো আওয়াজটা এসেছিল। মেয়েমানুষের গলার মত আওয়াজ।
বংশীর ঘরের দরজাটা ঠেলে খুলতে গেল সে। কিন্তু মনে হলো যেন তালা ঝুলছে। অন্ধকারের মধ্যে তালাটায় হাত দিলে। হাত দিয়ে নাড়ালে। আর বোধ হয় তাড়াতাড়িতে ভালো করে তালায় চাবি লাগানো হয় নি। সঙ্গে সঙ্গে সেটা খুলে গেল। সদানন্দ ঘরের মধ্যে চেয়ে দেখবার চেষ্টা করলে। মনে হলো ভেতরে যেন তখনও কার গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে
