নায়েব নরনারায়ণ সঙ্গে চলেছেন। চলতে চলতে একদিন নবদ্বীপ শহরে এসে পৌঁছুলো।
কর্তা বললেন–চলো, আমাকে রাধামাধবের আশ্রমে নিয়ে চলো।
তাঁর কথামত সেই রাধামাধবের আশ্রমেই তাঁকে তোলা হলো। কিন্তু সেখানেও বেশি দিন তাঁকে থাকতে হলো না। দুদিন পরেই কর্তা বললেন–এবার আমার সময় হয়েছে নরনারায়ণ, আমাকে গঙ্গায় নিয়ে চলো
নায়েব নরনারায়ণ তাকে গঙ্গার ধারে নিয়ে গেলেন। কর্তা সিঁড়ি দিয়ে গঙ্গার জলে নামলেন। প্রথমে হাঁটু-জল। তারপর কোমর। তারপর বুক। সেই বুক-জলেই দাঁড়ালেন কর্তা।
সত্যিই, এ-সব কথা আজ এই বিয়েবাড়ির উৎসবের মধ্যে ভাবা অন্যায়। ওই ওপরের দোতলায় যে পঙ্গু মানুষটি লোহার সিন্দুক আঁকড়ে ধরে জীবন কাটাচ্ছেন তারও এ-সব কথা ভাবতে নেই। ভাবলে আজ এই তার নাতির বিয়ে পণ্ড হয়ে যাবে। এই অতিথি-অভ্যাগতে ভরা জমজমাট ঐশ্বর্যের ওপর কালো ছায়া পড়বে। জীবনের সার সত্য মোক্ষ নয়, শান্তি নয়, ত্যাগও নয়। আসল সত্য হলো এই ঐশ্বর্য, এই জাঁকজমক আর এই সিন্দুক। কালীগঞ্জের হর্ষনাথ চক্রবর্তী নির্বোধ ছিলেন তাই তিনি আসক্তি ত্যাগ করেছিলেন। নবদ্বীপের গঙ্গার ঘাটে গিয়ে নিজের মুক্তি চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি ত্যাগে বিশ্বাস করি না, মুক্তিতে বিশ্বাস করি না, অনাশক্তিতেও বিশ্বাস করি না। আমি বাঁচতে চাই। এই জমি-জমা জাঁকজমক-ঐশ্বর্য-বিলাস সব কিছুর মধ্যে জড়িয়ে থেকে বাঁচতে চাই। আমি বাঁচতে চাই আমার আমির মধ্যে দিয়ে। বাঁচতে চাই আমার সন্তানের মধ্যে দিয়ে। আমি বাঁচতে চাই আমার বংশ-পরম্পরার উত্তরাধিকারের মধ্যে দিয়ে। যে সেই বাঁচার পথে অন্তরায় হবে তাকে আমি নিপাত করবো, নিঃশেষ করবো। আমার বংশী ঢালী সেই নিঃশেষ করার পথে আমাকে সাহায্য করবে। সেই জন্যেই তো আমি তাকে মাসোহারা দিয়ে রেখেছি।
বংশী ঢালী যখন বার বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালো, তখন কালীগঞ্জের বউ সেখানে নেই। এমন কি তার সেই পালকিটারও চিহ্ন নেই সেখানে।
প্রকাশ মামা মা-জননীকে নিয়ে তখন একেবারে ভেতর-বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে। কালীগঞ্জের বউ সম্বন্ধে চৌধুরীবাড়িতে যত অশ্রদ্ধাই থাক, তার সঙ্গে চৌধুরী বংশের ঐশ্বর্যের ক্ষীণ সূত্রটার কথা জানতে কারো বাকি ছিল না। অন্ততঃ আর কেউ না-জানুক চৌধুরী বাড়ির গিন্নী সে কথা জানে।
–কোথায় গো, বৌমা কোথায়?
কালীগঞ্জের বৌ এতবার এবাড়িতে এসেছে টাকার তাগাদা করতে কিন্তু এমনি করে কখনও অন্দরমহলের চৌহদ্দির মধ্যে আসে নি।
বৌমা ব্যস্ততার মধ্যেও চিনতে পেরেছে। বললে–আসুন আসুন মা–
–কালীগঞ্জের বৌ বললে–আমাকে তুমি চিনতে পারবে না বৌমা। আমার নাত-বৌ এসেছে বাড়িতে তাই আশীর্বাদ করতে এলুম। তুমি আমাকে তাড়িয়ে দেবে না তো বৌমা?
–ওমা, তাড়িয়ে দেব কেন আপনাকে!
কালীগঞ্জের বৌ বললে–না, আমাকে তো আসতে কেউ নেমন্তন্ন করে নি বৌমা, আমি এমনিই এসেছি, আমাকে তুমি এত খাতির কোর না। আমি শুধু নাতবউকে আশীর্বাদ করেই চলে যাবো…কই, নাত-বউ কোথায়?
নয়নতারা তখন একটা ঘরের মধ্যে ঘোমটা দিয়ে চুপ করে বসে ছিল। আশেপাশে আরো ক’জন পাড়ার বৌ-ঝি বসে আছে।
গৌরী পিসী সঙ্গে করে নিয়ে গেল। বললে–বৌমা, এঁকে প্রণাম করো, ইনি হচ্ছেন কালীগঞ্জের জমিদারের বৌ, তোমার গুরুজন–
কালীগঞ্জের বৌ হাতের পাট করা শাড়িখানা এগিয়ে দিতেই নয়নতারা সেখানা হাত বাড়িয়ে নিলে। তারপর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলে।
–থাক্ থাক্ মা, আশীর্বাদ করি সুখী হও, শ্বশুর-শাশুড়ী-স্বামী-ছেলেমেয়ে নিয়ে সুখে সংসার করো–
বলে আর দাঁড়ালো না সেখানে। যেন চলে আসতে পারলেই বাঁচে। যেন সকলের চোখের আড়ালে চলে যেতে পারলেই তৃপ্তি পায়। মুখ নিচু করে যেমন এসেছিল তেমনি আবার বার বাড়ির দিকে চলে গেল।
গৌরী পিসি বাইরে আসতেই প্রীতি জিজ্ঞেস করলে–কী রে, মাগী চলে গেছে?
গৌরী পিসী বললে–হ্যাঁ, বিদেয় হয়েছে–
–কী দিয়ে বৌ-এর মুখ দেখলে রে?
–সে আর বলো না বৌদি। একটা বাঁদি-পোতার গামছা–
–সে কী রে? গামছা? গামছা দিয়ে আমার ছেলের বৌ-এর মুখ দেখলে?
গৌরী বললে–তা সে গামছাই একরকম বলতে পারো। আমাদের বিবিগঞ্জের হাটে জোলাদের হাতে বোনা যেমন শাড়ি পাওয়া যায় তেমনি।
–কত দাম হবে?
–তা তিন টাকাও হতে পারে, পাঁচ টাকাও হতে পারে—
প্রীতি বললে–ঢং, ঢং দেখে আর বাঁচিনে, তবু যদি নেমন্তন্ন করে ডেকে আনা হতো তো তাও বুঝতুম–
গৌরী বললে–অথচ মাগীর দেমাক দেখ না, কর্তাবাবুকে সেবার কত গালাগালি দিয়ে গেল, এখন আবার এসেছে ভাব-ভালবাসা দেখাতে–লজ্জাও করে না মা, ছিঃ!
প্রীতির সেসব মনে ছিল না। বললে–গালাগালি দিয়েছিল? কর্তাবাবুকে? কী গালাগালি দিয়েছিল রে?
–ওমা তোমার মনে নেই, ওই বার বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে সেবার বলে নি–তুমি নিব্বংশ হবে নারাণ, আমি বামুনের মেয়ে হয়ে তোমাকে শাপমন্যি দিয়ে গেলুম তোমার বংশ থাকবে না–কত কী কথা বলে যায় নি?
প্রীতি বললে–ওমা, তুই আমাকে আগে মনে করিয়ে দিলিনে কেন? আমি তাহলে আজ ঝাটা ঘষে দিতুম মাগীর মুখে?
তা বটে। গৌরীও সেই কথাই বললে। কালীগঞ্জের বউ-এর মুখে খ্যাংরা ঝাঁটা ঘষে দিলেই বুঝি ভালো হতো! এই সদানন্দর বিয়ের ব্যাপারেই কি কম বাগড়া দিয়েছে কালীগঞ্জের বউ? যাতে বিয়ে ভেঙে যায় সেই জন্যে খোকাকে পর্যন্ত নিজের বাড়িতে সমস্ত রাত আটকে রেখেছিল। এখন লজ্জা নেই তাই আবার ঢং করে একটা তিন টাকা দামের গামছা দিয়ে বৌ-এর মুখ দেখতে এসেছে।
