রসগোল্লা খেলেন একটা।
কিন্তু রসগোল্লাটা মুখে দিয়েই থু-থু করে ফেলে দিলেন।
বললেন–না, এ মিষ্টি কাউকে খেতে দিতে পারবে না, এ বাসি মিষ্টি, টক হয়ে গিয়েছে। ফেলে দাও–
শুধু ফেলে দেওয়া নয়। পাছে কাক-পক্ষীতেও খায় সেই জন্যে মাটিতে গর্ত করে সেই আড়াই মণ ছানার তৈরি রসগোল্লা সব পুঁতে ফেলা হলো। তারপর আবার রাতারাতি নতুন করে তৈরি হলো রসগোল্লা। তবে সকলেরই পাতে মিষ্টি পরিবেশন করা হলো।
এ-সব ঘটনা কালীগঞ্জের লোক যেমন জানে, এই নরনারায়ণ চৌধুরীও তেমনি জানেন। অথচ সেই চক্রবর্তী মশাই-এর গৃহিণীর এমন সর্বনাশ করতে তাঁরও কিনা বাধলো না।
শেষ সময়ে নরনারায়ণকেই ডেকেছিলেন সেদিন হর্ষনাথ চক্রবর্তী। বলেছিলেন–এবার আমার যাবার বন্দোবস্ত করো নারায়ণ
নরনারায়ণ যাওয়ার কথা শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন–কোথায় যাবেন খুঁজুর?
হর্ষনাথ বলেছিলেন–নবদ্বীপ—
নবদ্বীপের কথা শুনে নরনারায়ণ সেদিন একটু অবাকই হয়ে গিয়েছিলেন।
বলেছিলেন–নবদ্বীপে যাবেন কেন হুজুর?
হর্ষনাথ বলেছিলেন–যা বলছি তাই করো, গাড়ি যুততে বলো–
তাই সেই ব্যবস্থাই হয়েছিল। কর্তা নবদ্বীপে যাবেন হুকুম হয়েছে। কর্তার হুকুমের আর নড়চড় নেই। গাড়ি চললো। সমস্ত দিন চলে সন্ধ্যেবেলা একটা নদীর ধারে এসে গাড়ি পৌঁছুল। জিজ্ঞেস করলেন–এ কোথায় এলাম?
নরনারায়ণ বললেন–আজ্ঞে কেষ্টগঞ্জ—
কর্তা বললেন–আমি তামাক খাবো–আমার কলকে গড়গড়া নিয়ে এসো–
সঙ্গের লোক আবার ছুটলো কালীগঞ্জে। কর্তার তামাক খাবার ইচ্ছে হয়েছে। তার নিজের গড়গড়া, ফরসি, সব কিছু আনা চাই। তিনি সেই কেষ্টগঞ্জের নদীর ঘাটেই আস্তানা গাড়লেন। পরের দিন সব কিছু এসে হাজির হলো। তখন সেই নিজের অভ্যস্ত গড়াগড়ার ওপর কলকে বসিয়ে তামাক খেলেন। দুচার টান দিলেন গড়গড়ায়। ধোঁয়া বেরোল। আর তারপর সেটা নরনারায়ণের হাতে দিলেন। বললেন–আর না, আমার এইটুকু আসক্তি ছিল, এবার তাও গেল, এখন চলো–
তখন গাড়ি আবার চললো নবদ্বীপের পথে—
কিন্তু এসব কথা আজকে আর কে শুনবে? কাকে শোনাবে কালীগঞ্জের বউ? একজন যে এসব ঘটনার সাক্ষী ছিল সেও আজ সব ভুলে বসে আছে। সেদিনকার সেই নায়েব আজ আর সেদিনকার সেই মনিবকে মনে রাখতে চায় নি। মনে রাখলে নবাবগঞ্জের সেই সব কিছু সম্পত্তি সোজা কালীগঞ্জের বউ-এর কাছেই ফিরিয়ে দিতে হয়। কিন্তু তা তো আর সম্ভব নয়। তাই কালীগঞ্জের বউকে দেখলেই তার মেজাজটা বিগড়ে যায়। বলে–যা যা দীনু, বল্ আমার শরীরটা খারাপ, আমার সঙ্গে দেখা হবে না–
আর তা ছাড়া নিজের সৌভাগ্যের দিনে কে আর অতীতের সেই অন্ধকার দাসত্বের দিনগুলোর কথা মনে রাখে! কালীগঞ্জের বউ-এর নাম শুনলেই যেন কেবল মনে পড়ে যায় সেই পনেরো টাকা মাইনের চাকরিটার কথাগুলো। কে যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চায় তার পুরানো চোহারাটাকে। বলে–ওই দ্যাখ, ওকে চিনতে পারিস!
নরনারায়ণ চৌধুরী চিৎকার করে ওঠেন–কৈলাস–কৈলাস—
কৈলাস গোমস্তা বলে–আজ্ঞে, এই তো আমি, আমি তো আপনার পাশেই রয়েছি–
–ও–বলে যেন শান্ত হন। যেন আবার তিনি বাস্তব জগতে ফিরে আসেন। বলেন–দেখ কৈলাস, আজকাল কেবল আমার এই রকম হয়। মনে হয় যেন আমার কাছে কেউ নেই। তুমি আমার কাছে কাছে থাকবে সব সময়–
কিন্তু সেদিন বংশী ঢালী ঘরের বাইরে চলে যাবার পরই কর্তাবাবু আবার ডাকলেন—কৈলাস–
কৈলাস বাইরেই দাঁড়িয়েছিল। ডাক পেয়েই ভেতরে এল। বললে–আমাকে ডাকছিলেন?
–হ্যাঁ, তুমি কোথায় যাও? আমি তোমাকে বলেছি না সব সময় তুমি আমার কাছে কাছে থাকবে?
কৈলাস বললে–আজ্ঞে, আপনি যে এখুনি আমাকে বাইরে যেতে বললেন
কর্তাবাবু বললেন–দেখ কৈলাস তক্কো কোর না, তোমার ওই বড় দোষ, তুমি বড় মুখে মুখে তক্কো করো। তোমাকে আমি বারবার বলেছি আমার কাছাকাছি থাকবে। দেখছো, আমার সিন্দুকটা পাশে রয়েছে, এতে টাকাকড়ি আছে, কখন কে আসে তার ঠিক নেই– তুমি…….
তারপর হঠাৎ থেমে গিয়ে কী যেন কান পেতে শুনতে লাগলেন।
বললেন–একটা কীসের যেন শব্দ হলো না কৈলাস
কৈলাস গোমস্তাও শব্দটা শুনতে চেষ্টা করলে। বললে–হ্যাঁ, ও তো মেয়েরা শাঁক বাজাচ্ছে নিচেয়–
কর্তাবাবু ধমকে উঠলেন–মেয়েরা শাঁখ বাজাচ্ছে সে তো আমিও শুনতে পাচ্ছি। সে শব্দ নয়, আর একটা শব্দ শুনতে পেলে না?
কৈলাস গোমস্তা বললে–আজ্ঞে না।
কর্তাবাবু বললেন–তুমি দেখছি দিন-দিন কানে কালা হয়ে যাচ্ছে। যাও, শুনে এসো কীসের শব্দ হলো ওখানে–
কৈলাস গোমস্তা তাড়াতাড়ি উঠে নিচেয় চলে যাচ্ছিল, কিন্তু কর্তাবাবু ধমক দিলেন। বললেন–তুমি আবার কোথায় যাচ্ছো?
–আজ্ঞে নিচেয়।
–আজ্ঞে নিচেয়! তোমাকে বলেছি না তুমি সব সময় আমার কাছে কাছে থাকবে। আমার কাছে সিন্দুকে টাকা রয়েছে, বলেছি না তোমাকে?
কৈলাস গোমস্তা কথাটা শুনে আবার তার নিজের জায়গায় এসে বসলো। কিন্তু ওদিকে হর্ষনাথ চক্রবর্তী মশাই তখন নবদ্বীপে চলেছেন। তাঁর জীবনের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। তাঁর আর কোনও আসক্তি নেই তখন। নাবালক ছেলে দু’জন রইলো, গৃহিণী রইলো। আর রইলো- নায়েব নরনারায়ণ! জমি-জমাও রইল অনেক। অনেক কিছুই তিনি রেখে গেলেন। কিন্তু যাবার সময় কিছুই সঙ্গে নিলেন না। যাবার সময় কারো সঙ্গে কিছু থাকেও না। একলাই এসেছিলেন সংসারে, সেই সংসার ফেলে একলাই আবার চলে যাচ্ছেন। আসক্তি নেই, কামনা নেই, আকাঙ্খাও আর নেই। একমাত্র আসক্তি ছিল তাঁর ওই তামাকটার ওপর। তা সেটাও গেল। সেটাও তিনি ত্যাগ করলেন। এবার মুক্তি। এবার আর কোনও কিছুই তাঁকে আকর্ষণ করতে পারবে না।
