বংশী ঢালীদের কাজ কিছু থাকুক আর না-থাকুক তাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করতে হয়, মাসোহারা দিয়ে যেতে হয়। কাজ দিলাম তো ভালো আর যখন কাজ দিলাম না তখন বসে থাকো।
এমনি অনেকবার অনেক কাজের ভারই পড়েছে বংশী ঢালীর ওপর।
বড় বিশ্বাসী কর্মচারী বংশী ঢালীরা। সুখ-শান্তির দিনে তারা খেতে পাচ্ছে কি না তা দেখবার দায় নেই কর্তাবাবুদের। কিন্তু বিপদের দিনে তারাই ভরসা। তারাই বুক দিয়ে বাঁচায় কর্তাবাবুদের।
আজ এতদিন পরে আবার ডাক পড়েছে সেই বংশী ঢালীর।
বাড়িতে যখন সবাই কাজে ব্যস্ত তখন কেবল তারই কাজ ছিল না। এখন যেন সেও একটা কাজ পেলে। এতক্ষণ শুধু বাড়ির শোভা হয়ে সে ঘুরে বেড়িয়েছে। কাজের লোক যে সে চুপ করে থাকেই বা কী করে!
কর্তাবাবুর ঘর থেকে বেরিয়ে সে নিচেয় এল। চারিদিকে হৈ চৈ। লোকজনের আনাগোনায় সমস্ত বাড়িটা তখন গমগম করছে। কিন্তু তাতে তার কিছু আসে যায় না। তার কাজ সকলের চোখের আড়ালে। সে কাজ কেউ দেখতে পাবে না। জানতে পারবে না তার বাহাদুরি। জানবে শুধু সে আর তার সাকরেদরা। আর জানতে পারবে তার অন্নদাতা মালিক। যে জানলে তার খাওয়া-পরা জুটবে, তার চাকরি বজায় থাকবে।
নিচেয় নেমেই আর দাঁড়াল না সেখানে বংশী ঢালী। একেবারে সোজা গিয়ে হাজির হলো বার বাড়িতে। বার বাড়িতে পালকি থেকে নেমে কালীগঞ্জের বউ তখন মাথার ঘোমটাটা ভালো করে টেনে দিলে।
প্রকাশ মামা সামনে গিয়ে অভ্যর্থনা করলে–আসুন আসুন মা জননী–
কালীগঞ্জের বউ-এর পরনে একটা গরদের পাটভাঙা থান। আজকে একটা বিশেষ দিন বলে বিশেষ ভাবেই সেজেগুজে এসেছে। আসবার তার ইচ্ছে ছিল না তেমন। কিন্তু আবার না এসেও থাকতে পারে নি। একবার মনে হয়েছিল বিনা নিমন্ত্রণে যাওয়াটা ঠিক হবে কি। কিন্তু কে তাকে নেমন্তন্ন করবে! নারায়ণ তার নাতির বিয়েতে তাকে নেমন্তন্ন করবে। এটা আশা করাও অন্যায়। কালীগঞ্জের বাজার থেকে একটা শাড়ি কিনে নিয়ে এসেছিল নতুন বউকে দেবার জন্যে। পনেরো টাকা দাম নিয়েছে শাড়িটার।
কালীগঞ্জের বউ-এর তেমন পছন্দ হয় নি শাড়িটা। বলেছিল–হ্যাঁ রে দুলাল, এর থেকে ভালো শাড়ি একটা পেলিনে?
দুলাল বললে–এর চেয়ে ভালো শাড়ি আর দিতে হবে না মা, কেউ তো আপনাকে এ বিয়েতে নেমন্তন্নও করে নি–
কালীগঞ্জের বউ বলেছিল–নেমন্তন্ন না-করলেই বা, নায়েব মশাই না-হয় আমাকে নেমন্তন্ন করে নি, কিন্তু তার নাত-বৌ কী দোষ করলো, বল্? সে তো এর মধ্যে নেই। তাকে কেন খারাপ শাড়ি দিতে যাবো?
তা তখন আর সে-শাড়ি বদলাবার সময়ও ছিল না বলতে গেলে। তাড়াতাড়ি সেই শাড়িখানাই একটা কাগজে মুড়ে নিয়ে চলে এসেছিল। পালকির ভেতরে আসতে আসতে কালীগঞ্জের বউ-এর কেবল মনে পড়ছিল খোকার সেই কথাগুলো–তোমার টাকা আমি ফেরত দেবই কালীগঞ্জের বউ, তোমার টাকা না দিলে আমি বিয়েই করতে যাবো না–
আহা! ঠাকুর্দা যাই হোক, তার নাতিটা তো কোন দোষ করে নি।
পালকির ভেতরে বসেই কালীগঞ্জের বউ বলেছিল–তোরা একটু পা চালিয়ে চল দুলাল, নতুন বউ বিকেল বেলা নবাবগঞ্জে আসবে, তাকে শাড়িটা দিয়ে সন্ধ্যের আগেই ফিরে আসতে চাই–
সত্যিই সন্ধ্যের আগেই ফিরে আসতে চেয়েছিল কালীগঞ্জের বউ। হয়ত মন বলছিল সন্ধ্যের আগে ফিরে না এলেই বুঝি কোনও বিপদ ঘটবে। কিন্তু কে জানত সে-বিপদ এমন ভয়াবহ বিপদ হয়ে উঠবে! কে জানতো সে-বিপদ এমনই বিপদ যে এ-জন্মের মত তা কাটিয়ে তার কালীগঞ্জে ফিরে আসা হবে না। আর কে-ই বা জানতো কালীগঞ্জের সেই বিপদই নবাবগঞ্জের চৌধুরী-বংশের বিপদ হয়ে এমন করে সমস্ত কিছু ধ্বংস করে দেবে!
সত্যিই, এমনি করেই হয়ত ইতিহাস তার আপন গতিপথ পরিবর্তন করে। নইলে একদিন যে-সূর্য কালীগঞ্জের আকাশে উদয় হয়ে কালীগঞ্জেই অস্ত গিয়েছিল তা যে আবার একদিন নবাবগঞ্জের আকাশকেও অন্ধকার করে দেবে তা-ই বা কে ভাবতে পেরেছিল। নইলে হর্ষনাথ চক্রবর্তী হয়ত যাবার আগে তাঁর স্ত্রীকে সাবধান করে দিয়ে যেতেন। যাবার সময় হয়ত সহধর্মিণীকে বলে যেতেন–ওগো, ওই আমার নায়েবকে তুমি বিশ্বাস কোর না। নায়েব নরনারায়ণ চৌধুরীকে বিশ্বাস করলে একদিন তোমার সর্বস্ব নিঃশেষ হয়ে যাবে। বলে যেতেন–সম্পত্তি রক্ষা করতে গেলে কাউকেই বিশ্বাস করতে নেই। বলে যেতেন–আত্মবিশ্বাসের চেয়ে বড় বিশ্বাস আর কিছু নেই। আরো বলে যেতেন–সম্পত্তি এমনই জিনিস যা শুধু নায়েব কেন নিজের ছেলেকেও বিশ্বাসহন্তা করে তোলে।
কিন্তু সেদিন হর্ষনাথ চক্রবর্তীর গৃহিণী বড় সহজ সরল মানুষ ছিল। সংসারে যে তাকে একদিন এমন করে একলা হয়ে যেতে হবে তাও কখনও কল্পনা করতে পারে নি সে। কর্তা ছিলেন মহাপ্রাণ মানুষ। গৃহিণীও তাই। নদীতে যখন স্নান করতে যেতেন তিনি সঙ্গে লোক যেত মাথায় ছাতি ধরে। যেন রোদ না লাগে কর্তার শরীরে। কোঁচানো কাপড় যেত স্নান করে উঠে পরবার জন্যে। আর যেত কাঁসার বাটিতে আধ সের তেল।
গৃহিণী দেখতে পেয়ে একদিন বলেছিল–অত তেল কি তোমার নিজের গায়ে মাখো নাকি?
কর্তা শুনে হাসতেন। বলতেন–না গো, ঘাটে যারা আসে তারা বড় গরীব মানুষ, তাদের তেল কেনবার পয়সা নেই। আমি তেল মাখি, তারাও মাখে–
শুধু তেল নয়। একবার গৃহিণীর ব্রত উদ্যাপন উপলক্ষে গ্রামের সব লোককে খেতে নেমন্তন্ন করা হয়েছিল। খেতে যাবার আগে হঠাৎ কর্তার নজরে পড়লো গামলা-ভর্তি রসগোল্লা ভাসছে। বললেন–দেখি দেখি, খেয়ে দেখি একটা কেমন পাক হয়েছে—
