বললে–কী হুকুম কর্তাবাবু?
কর্তাবাবু কৈলাস গোমস্তার দিকে চাইলেন। বললেন–কৈলাস, তুমি একবার বাইরে যাও তো। বংশীর সঙ্গে আমার একটা কাজের কথা আছে–দেখো, যেন এ সময়ে আমার ঘরে কেউ না ঢোকে—
কৈলাস গোমস্তা বাইরে চলে যেতেই কর্তাবাবু বংশীর দিকে চেয়ে বললেন–একটু কাছে সরে আয়, আমার মুখের কাছে–
বংশী কর্তাবাবুর মুখের কাছে মুখ নিয়ে গেল।
–একটা কাজ করতে পারবি বংশী? মোটা বখশিশ পাবি। কালীগঞ্জের বউ এসেছে, দেখেছিস তো? তাকে সরাতে হবে। পারবি? হবে তোর দ্বারা?
–পারবো হুজুর।
–কিন্তু দেখিস। খুব সাবধান, কেউ যেন জানতে না পারে! পারবি তো?
বংশী ঢালীকে এ-প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা অবান্তর। তবু ঘটনার গুরত্বটা বোঝানোর জন্যেই বোধ হয় এই প্রশ্ন করলেন কর্তাবাবু।
বংশী ঢালী শুধু কর্তাবাবুরই নয়, এককালে কালীগঞ্জের জমিদারের লোক ছিল। কর্তাবাবু যখন এখানে এই নবাবগঞ্জে আসেন তখন বংশী ঢালীও তার সঙ্গে এসেছিল। এইটেই তার পেশা, এইটেই তার নেশা। তাই এ ধরনের কোনও কাজে না বলার অভ্যেস তার নেই। বরং কাজ না পেলেই যেন সে অখুশী হয়। তখন তার শরীর ভালো থাকে না, হজম হয় না, ঘুম হয় না, গা ম্যাজম্যাজ করে।
এবার এতদিন পরে কর্তাবাবুর মুখে কাজের কথা শুনে বংশী বেশ সতেজ হয়ে উঠলো। বললে–বলুন কর্তাবাবু কী কাজ, নিজের জান দিয়ে আপনার কাজ করে দেব–
কর্তাবাবু বললেন–খুব সাবধানে করতে হবে কিন্তু, কেউ যেন জানতে না পারে।
কথাটা শুনে বংশীর যেন অপমান বোধ হলো। বললে–আগে কি কখনও অসাবধান হয়েছি যে আপনি ওকথা বলছেন?
কর্তাবাবু নিজেকে শুধরে নিলেন। সত্যিই তো, বংশী ঢালীকেই যদি তিনি অবিশ্বাস করেন তাহলে তো তার নিজেকেই অবিশ্বাস করতে হয়। বললেন–ওরে, তা বলছি নে। বলছি আবার একটা ঝামেলা হয়েছে, সেই ঝামেলাটা তোকে কাটাতে হবে–
–বলুন না কাকে খতম করতে হবে?
কর্তাবাবু বললেন–এই এখখুনি খবর পেলাম কালীগঞ্জের বৌ নাকি এসেছে–
–তা যাচ্ছি আমি, এখুনি খতম করে দিচ্ছি–
–কী করে খতম করবি? সবাই যে জানতে পারবে। আজ যে কুটুমবাড়ির লোকজন এসেছে সব–
বংশী ঢালীর মুখটা একটা পৈশাচিক আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। মাথায় লাল কাপড়ে বাঁধা পাগড়িটা খুলে আর একবার জমপেশ করে বেঁধে নিলে। তারপর এক লাফে ঘরের বাইরে চলে গেল।
২.৩ নবাবগঞ্জের ইতিহাস
এই নবাবগঞ্জের ইতিহাসে এ এক মর্মান্তিক কাহিনী। জমিদারি উঠে গেছে ইণ্ডিয়া থেকে। সেই ১৯৫৮ সালের আইনে জমিদারি রাখা এখন বেআইনী হয়ে গেছে। কিন্তু নবাবগঞ্জ থেকে বুঝি তা তখনও নিঃশেষ হয় নি। নিঃশেষ হয় নি সেই জমিদারির দাপট। জমি আর তখন জমিদারের নয়, সরকারের। সরকারের বিনা অনুমতিতে বেশি জমি রাখা নিষিদ্ধ। কিন্তু আইন যেমন আছে আইনের ফাঁকও তো আছে তেমনি। সেই আইনের ফাঁক দিয়ে কোনও জমিদারের কোনও জমিই হাতছাড়া হয় নি। শুধু জমির মালিকের নাম বদলিয়েছে। আগে যেখানে ছিল নরনারায়ণ চৌধুরীর নাম সেখানে বসেছে কুল-বিগ্রহের নাম। বাড়িতে কুল বিগ্রহও আবার একটা নয়, একশোটা। একশোটা কুল-বিগ্রহের নাম বসেছে মালিকানার খতিয়ানে। সব কুল-বিগ্রহের প্রত্যেকের ভাগে পড়েছে পঁচাত্তর বিঘে জমি। অর্থাৎ জমির মালিক সেই মালিকই আছে, শুধু দাখলে কাটা হয় বেনামে। কুল-বিগ্রহরা পাথরের ঠাকুর। ঠাকুরের না আছে পেট না আছে ক্ষিধে। এমন কি খাবার হজম করবার ক্ষমতাও নেই কোনও ঠাকুরের। কিন্তু বেনামদার যারা তাদের মোটা মোটা পেট আছে, বাঘের মত ক্ষিধেও আছে। আর আছে হজম করবার অমানুষিক ক্ষমতা।
একদিন নরনারায়ণ চৌধুরী তিন পুরুষ আগে যখন এখানে এই সম্পত্তির পত্তন করেন তখন কল্পনাও করেন নি যে, একদিন আবার এই সম্পত্তি-বিলোপ আইন হবে। কিন্তু আইনটা যখন হলো তখন প্রথমে একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তবে কি গভর্নমেন্ট সব জমি গ্রাস করে নেবে নাকি?
কিন্তু অভয় দিলেন উকিলবাবু। উকিলবাবু হাসলেন–গভর্নমেন্ট আইন করলেই বা, আমরা আছি কী করতে কর্তাবাবু? আইন তৈরি করা যেমন গভর্মেন্টের কাজ, আমাদের কাজ তেমনি আইন ভাঙার রাস্তা বাতলে দেওয়া–
কর্তাবাবু বললেন–তাহলে আইন বাতলে দিন–
উকিলবাবু হাসতে হাসতে বললেন–আমাকে কত দেবেন বলুন? আমার পাওনাটা?
কর্তাবাবু বললেন–যা চাইবেন তাই-ই দিতে হবে। শতকরা পাঁচ টাকা খরচ না-হয় দেব আপনাকে–
তা সেই ব্যবস্থাই হলো। উকিলবাবুই বুদ্ধি দিলেন–তাড়াতাড়ি কিছু মন্দির আর ঠাকুর তৈরি করে ফেলুন কর্তাবাবু। মাটির ঠাকুর করলে তেমন কিছু খরচ হবে না। রোজ বাড়িতে ঠাকুর-সেবা আরম্ভ করে দিন। পুরুত রাখুন আলাদা আলাদা–আর তারপর সেই সব ঠাকুরের নামে পঁচাত্তর বিঘে করে জমি-জমার দলিল করে ফেলুন। দেখি, গর্ভমেন্ট কী করে। আর তখন আমি তো আছিই–
তা চৌধুরীবাড়িতে আগে থেকেই কুল-বিগ্রহ ছিল। পরে তাদের সংখ্যা বেড়ে একশো হলো। শেষ পর্যন্ত আইন যখন চালু হলো দেখা গেল মাত্র পঁচাত্তর বিঘে জমি-জমার মালিক হলেন নরনারায়ণ চৌধুরী আর বাকি ছেলে, পুত্রবধূ আর ঠাকুরদের নামে এমনভাবে জমি জমা ভাগ হলো যাতে এক তিল জমি সরকারের ভাগে না পড়ে।
সুতরাং কাগজে-কলমে জমিদারি-প্রথা বিলোপ হয়ে গেল বটে, কিন্তু জমিদার যেমন ছিল তেমনিই রয়ে গেল। রয়ে গেল আগেকার সেই আয়-আদায় আর সঙ্গে সঙ্গে রয়ে গেল তাদের দাপট। আর তার সঙ্গে রয়ে গেল বংশী ঢালীরাও।
