-কী ক্ষতি হবে শুনি? ক্ষতিটা কী হবে?
সদানন্দ বললে–টাকাটা না দিলে আমাদের সব কিছু নষ্ট হয়ে যাবে।
–নষ্ট হয়ে যাবে মানে?
–আমাদের চৌধুরীবাড়িটা নষ্ট হয়ে যাবে। আমাদের এই নবাবগঞ্জ নষ্ট হয়ে যাবে। আমাদের এই দেশ আমাদের এই জাত নষ্ট হয়ে যাবে। আমরা সবাই মারা যাবো। তুমি আমি বাবা দাদু মা কাউকেই তাহলে আর বাঁচাতে পারবো না।
প্রকাশ মামা আর থাকতে পারলে না। বললে–তুই থাম দিকিনি। যত সব তোর বাজে কথা। সত্যিই লেখাপড়া শিখে তোর মাথার ব্যানো হয়েছে! তাই-ই যদি হতো তাহলে আর এতদিন পৃথিবী টিকে থাকতো না। জমিদারি চালাতে গেলে লাঠিবাজি খুনখারাবি না করলে চলে? চল, চল ও-সব কথা মাথায় ঢোকাস নি। ওসব যত ভাববি তত মাথাখারাপ হবে। তার চেয়ে চিরকাল সবাই যেমন করে এসেছে তেমনি করে যা, দেখবি তাতে অনেক আরাম। একটা জিনিস জেনে রাখিস ফুর্তির চেয়ে দুনিয়ায় বড় জিনিস আর কিছু নেই—
তখন আর প্রকাশ মামার নিজেরও দাঁড়াবার সময় নেই। সদানন্দ চলে যেতেই চৌধুরী মশাই কাছে এলেন।
বললেন কী হলো প্রকাশ, খোকাকে বোঝালে?
প্রকাশ বললে—হ্যাঁ–
–কী বললে খোকা? বুঝলো?
প্রকাশ মামা বললে–বুঝবে না? আমি সব বললুম বুঝিয়ে। বুঝিয়ে বললুম জমিদারি রাখতে গেলে লাঠিবাজি জালজোচ্চুরি না করলে জমিদারি থাকে? আর জমিদারির কথা না হয় ছেড়েই দিলুম, গভর্নমেন্ট চলে? গভর্নমেন্ট লাঠিবাজি করে না? গভর্নমেন্টও তো বন্দুকবাজি করে। কে না ওসব করে? ক্ষমতা রাখতে গেলে ওসব জালজোচ্চুরি করতেই হবে। আকবর বাদশা থেকে ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট পর্যন্ত সবাই ওই লাঠিবাজি বন্দুকবাজি করে এসেছে। তোর ঠাকুর্দা যা করেছে তোর দাদামশাইও তাই করেছে। না করলে এত সম্পত্তি আর এত জমির মালিক হওয়া যায়?
–তা শুনে কী বললে খোকা?
প্রকাশ বললে–কী আর বলবে? বলবার মুখ রইল না। বোবার মত চুপ করে শুধু শুনলো আমার কথাগুলো।
–তারপর?
প্রকাশ বললে–তারপর যখন বুঝলো তখন মাথা ঠাণ্ডা হলো। আসলে জামাইবাবু, অত লেখাপড়া শিখেই যত গণ্ডগোল হয়েছে। তার চেয়ে আমরা বেশ আছি। আমরা পেট পুরে খেলুম আর নাক ডাকিয়ে ঘুমোলুম। আমি দেখেছি মাথায় একটু বিদ্যে ঢুকলেই সব তালগোল পাকিয়ে যায়–
বলে আর সেখানে দাঁড়ালো না। শামিয়ানা খাটানো তখনও শেষ হয় নি। ওদিকে পুকুরের ধারে ভিয়েন চড়েছে। সেদিকেও তদারকি করতে যেতে হবে। আর একটু চোখের আড়াল হয়েই রসগোল্লা পানতুয়া টপাটপ দু’চারটে মুখে পুরে দেবে বেটারা।
আস্তে আস্তে সন্ধ্যে নেমে আসছিল। অগ্রহায়ণ মাসের বিকেল বেলা ছোট হয়ে আসতে শুরু করেছে। সন্ধ্যে হলেই হ্যাজাগ বাতি জ্বলে উঠবে উঠোনে। সমস্ত বাড়ির সামনে ভেতরে আলোয় আলো হয়ে উঠবে।
প্রকাশ মামারই যেন যত জ্বালা। বিয়ে করবে সদা আর জ্বলেপুড়ে মরবে প্রকাশ মামা। কেন রে বাপু? আমি কে? আমি গরীব মানুষ, আমার বিয়ের সময় এই এত জাঁকও হয় নি, এত জমকও হয় নি। তবু দিদি টাকা দিয়েছে, সেই টাকা দু’হাতে খরচ করার মধ্যেই যা সুখ। পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিলেই হলো। করকরে নোট বেরিয়ে আসবে। সেই টাকার লোভেই সবাই খাতির করছে শালাবাবুকে। সবাই শালাবাবু বলতে অজ্ঞান। কদিন ধরে সবাই-ই একবার করে এসে প্রণাম করে যাচ্ছে। কাছে এসে পায়ে হাত দিয়ে বলছে-পেন্নাম হই শালাবাবু–
হঠাৎ প্রকাশ মামা সদরের দিকে চেয়ে চমকে উঠলো।
কে?
একটা পালকি এসে ঢুকলে সদরের বার বাড়িতে। পালকির চেহারা দেখেই প্রকাশ মামার চক্ষু চড়ক গাছ। কালীগঞ্জের বউ এলো নাকি?
আর কথাবার্তা নেই। প্রকাশ আর দাঁড়ালো না সেখানে। সোজা ভেতর বাড়িতে গিয়ে ঢুকলো। গিয়ে ডাকলে–দীনু, দীনু কোথায়, দীনু–
কাজের বাড়ি। সবাই-ই নাকে দড়ি দিয়ে খাটছে। অনেক ডাকাডাকির পর দীনু হাতের কাজ ফেলে এলো। প্রকাশ মামা বললে–দীনু, সিগগির কর্তাবাবুকে খবর দিয়ে এসো, কালীগঞ্জের বউ এসেছে–
–কালীগঞ্জের বউ?
নামটা শুনে দীনুরও যেন কেমন ভালো লাগলো না। আবার এসেছে মাগী!
–যাও, যাও খবরটা দিয়ে এসো শিগগির। তাড়াতাড়ি বিদেয় করে দেওয়া ভালো।
দীনু গিয়ে ওপরে খবরটা দিতেই কর্তাবাবু উঠে বসলেন। বললেন–কে? কে এসেছে বললি?
যেন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হলো না দীনুর কথাটা।
দীনু আবার বললে–কালীগঞ্জের বউ।
নামটা শুনে নরনারায়ণ চৌধুরীর মুখ দিয়ে কিছুক্ষণ কোনও কথা বেরোল না। তিনি স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। আজ তাঁর নাতির বিয়ে আর আজকেই কিনা কালীগঞ্জের বউকে নবাবগঞ্জে আসতে হয়!
দীনু তখনও দাঁড়িয়ে আছে। কর্তাবাবু তার দিকে চেয়ে বললেন–তুই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিস কী?
দীনু বললে–তাঁকে কী বলবো তাই জিজ্ঞেস করছি–
সেকথার উত্তর না দিয়ে কর্তাবাবু কৈলাস গোমস্তার দিকে চাইলেন। বললেন–কৈলাস, কালীগঞ্জের বৌকে তুমি নেমন্তন্ন করেছিলে নাকি?
কৈলাস গোমস্তা বললে–আজ্ঞে না, আমি কেন নেমন্তন্ন করতে যাবো?
কর্তাবাবু সঙ্গে সঙ্গে দীনুর দিকে চাইলেন। বললেন–দীনু, যা তো একবার বংশী ঢালীকে ডেকে নিয়ে আয় তো, বংশী ঢালী আছে এখানে?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি ডেকে আনছি–
দীনু তাড়াতাড়ি চলে গেল। আর তার পরেই বংশী ঢালী এসে ঘরে ঢুকলো। মাথায় জড়ানো একটা লাল পাগড়ি। কালো কুচকুচে গায়ের রং। পরনের কাপড়টাকে বাসন্তী রং-এ ছুপিয়ে নিয়েছে।
