–তা কলেজে তো বি-এ পড়ছিল, পাস-টাস করেছে?
–পাস করলে কী হবে, বুদ্ধিসুদ্ধি ভালো হয় নি। বাড়ির কাজকর্ম এখন থেকে বুঝে নেওয়া উচিত, তা সেদিকেও মন নেই। টাকা-পয়সার দিকেও কোনও টান নেই।
কীর্তিপদবাবু মেয়ের কথা শুনে নিশ্চিন্ত হলেন। বললেন–ও কিছু না, ও নিয়ে তুই ভাবিস নি। ওর মতন বয়েসে সবাই ওই রকমই থাকে। তারপর এই এখন বিয়ে হচ্ছে, দেখবি কাঁধে জোয়াল পড়লেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ছোটবেলায় আমিও ওই তোর খোকার মতন ছিলুম–
বলে হাসতে লাগলেন। কিন্তু মেয়ের তখন বাবার সঙ্গে কথা বলবারও সময় ছিল না। ভাঁড়ারের চাবি যার শাড়ির আঁচলে তাকে সব দিকে নজর দিতে হয়। যাবার আগে বাবার থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে অন্য কাজে মন দিতে হলো। খোকা যখন বিয়ে করতে গেল সেদিনও গণ্ডগোলের সৃষ্টি হলো। প্রকাশকে কাছে ডাকলেন কীর্তিপদবাবু। জিজ্ঞেস করলেন–গোলমালটা কীসের প্রকাশ? খোকা কোথায় ছিল?
প্রকাশও তখন অনেক কাজে ব্যস্ত। কালীগঞ্জ থেকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে সদানন্দকে বাড়িতে নিয়ে এসেছে কোনও রকমে। তারপর বেলা করে গায়ে-হলুদ হয়েছে, যাত্রার জন্যে সবাই তৈরী হচ্ছে।
বললে–সে-সব আপনাকে পরে সব বলবো পিসেমশাই, সে অনেক কাণ্ড–এখন বলবার সময় নেই–
–অনেক কাণ্ড মানে?
প্রকাশ বললে–সদানন্দ এখন বায়না ধরেছে টাকা দিতে হবে, দশ হাজার টাকা দিলে তবে সে বিয়ে করতে যাবে–
দশ হাজার টাকা? দশ হাজার টাকা কাকে দেবে? নিজে নেবে?
–না।
–তবে কাকে দেবে?
–কালীগঞ্জের বউকে।
কীর্তিপদবাবু কিছুই বুঝতে পারলেন না। কালীগঞ্জের বউ আবার কে? খোকার বিয়ের সঙ্গে কালীগঞ্জের বউ-এর কীসের সম্পর্ক?
প্রকাশ বললে–পরে আপনাকে সব বুঝিয়ে বলবো, এখন আমার সময় নেই, দেরি হয়ে গেছে, আর দেরি হলে ট্রেন মিস করবো–
বলে প্রকাশ চলে গেল। তারপর শাঁখের শব্দ শোনা গেল। মেয়েদের উলু দেওয়ার শব্দ শোনা গেল। বর বিয়ে করতে চলে গেল। কীর্তিপদবাবু সবই দেখলেন, সবই শুনলেন।
এসব গতকালের ঘটনা। তারপর আজ নতুন বউ এসেছে। এসে নরনারায়ণ চৌধুরীর ঘরে গিয়ে তাঁকে প্রণাম করে এসেছে। কীর্তিপদবাবুকেও প্রণাম করেছে। বাড়িতে অনেক লোকজনের ভিড়। বাইরে শামিয়ানা খাটানো হচ্ছে। প্রীতির বিয়ের সময় ভাগলপুরে এমনি হয়েছিল। এমনি করেই হয়ত এক পুরুষ থেকে আর এক পুরুষে বংশের ধারা গড়িয়ে চলে।
হঠাৎ বেয়াই মশাই-এর ঘর থেকে চেঁচামেচি-চিৎকারের শব্দ হতেই তিনি যেন চমকে উঠলেন। বাইরে বেরিয়ে এলেন। কাউকে কোথাও দেখতে পেলেন না। কাকে জিজ্ঞেস করবেন বুঝতে পারলেন না। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হচ্ছে। সবাই নতুন বউকে দেখতেই ব্যস্ত। কিন্তু তখনও ওপরে চেঁচামেচি চলছে।
চৌধুরী মশাই বললেন–আমি কথা দিচ্ছি ফুলশয্যা মিটে গেলেই কালীগঞ্জের বউকে টাকা দিয়ে দেওয়া হবে। আমি নিজে তোমাকে কথা দিচ্ছি–
প্রকাশ মামা বললে–এবার হলো তো, এবার তাহলে তোর আর বলবার কিছু রইল না–তুই আর গোলমাল করিস নি—
নরনারায়ণ চৌধুরী অনেক কথা বলার পর ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন।
বললেন–তোমরা সবাই এখন যাও এখান থেকে আমার শরীর খারাপ লাগছে–
প্রকাশ মামা সদার দিকে চেয়ে বললে–চল্ চল্ এখান থেকে, দাদুকে আর বিরক্ত করিস নে। এখন তোর সব বায়না মিটলো তো।
সদানন্দ বললে–কিন্তু দাদু আগেও তো বলছিল টাকা দেবে, সে কথা কি রেখেছে?
–এবার ঠিক দেবে, আর একবার দ্যাখ। এবার না দিলে তোর যা ইচ্ছে তাই করিস।
সদানন্দর চোখ দিয়ে তখন কান্না বেরিয়ে আসছিল। ঘরের বাইরে যেতে যেতে বলতে লাগলো–জানো প্রাকাশ মামা, ও টাকা না দিতে পারলে আমি কালীগঞ্জের বউ এর কাছে মুখ দেখাতে পারবো না।
প্রকাশ মামা বললে–তা কালীগঞ্জের বউ-এর কাছে তোকে মুখ দেখাতে কে বলেছে? আর সে বুড়িই বা ক’দিন বাঁচবে? তারও তো আর বেশিদিন নেই।
সদানন্দ বললে–কিন্তু আমি? আমি নিজেকে কী বলে বোঝাব? আমার নিজের কাছেও তো আমার একটা দায়-দায়িত্ব আছে–
–তোর নিজের কাছে আবার কীসের দায়-দায়িত্ব? তুই বলছিস কী? এখন তুই বিয়ে করলি এখন যে কদিন বাঁচিস ফুর্তি করে যা! যতদিন তোর টাকা আছে কেবল পেট ভরে ফুর্তি করে যা। আমার যদি তোর মতন টাকা থাকতো দেখতিস আমি ফুর্তির ঘোড়দৌড় ছুটিয়ে দিতুম–
–না প্রকাশ মামা, তুমি জানো না, আমার দাদুর যত টাকা আছে, সব পাপের টাকা –
–পাপের টাকা? কী যা-তা বলছিস তুই?
সদানন্দ বললে–হাঁ, জানতে আমার কিছু বাকি নেই। কপিল পায়রাপোড়া গলায় দড়ি দিয়ে যে পাপ করছে, সে পাপ দাদুর। কালীগঞ্জের বউ-এর সর্বনাশ করেছে দাদু। মাখন ঘোষ, ফটিক প্রামাণিক, তাদেরও দাদু খুন করেছে। এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত না করতে আমারও সুখ-ভোগ করবার কোনও অধিকার নেই
প্রকাশ মামা সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলল–তোর দেখছি লেখাপড়া শিখে মাথাটার একেবারে বারোটা বেজে গেছে। আমরা তোর জন্যে ভেবে ভেবে মরছি, কালকে লোকজনকে কেমনভাবে খাতির-যত্ন করবো সেই ভাবনায় আমরা সবাই অস্থির হয়ে যাচ্ছি, আর তুই কি না যত আবোল-তাবোল কথা নিয়ে মাথা খারাপ করছিস–
সদানন্দ বললেন,–না, তুমি জানো না প্রকাশ মামা, তোমরা কেউই বুঝতে পারবে না, আমি যা বলছি তা সকলের ভালোর জন্যেই বলছি–এতে তোমাদের সকলের ভালো হবে। কালীগঞ্জের বউকে টাকাটা না দিলে বরং আমাদের ক্ষতি–
