–ওপরে।
–আচ্ছা, যাচ্ছি,–তুমি যাও—
বলে আর দাঁড়ালো না। কাজকর্ম ফেলে দোতলায় সিঁড়ির দিকে চলতে লাগলো। কিন্তু ওপরে তখন আর এক নাটকের অভিনয় চলছে। চৌধুরী মশাই গিয়ে হাজির হয়েছেন সেখানে। সদানন্দও রয়েছে। প্রকাশ যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছুল তখন কর্তাবাবু বেশ রেগে উঠেছেন। –বলছেন তাহলে তোমার কথাই ঠিক থাকবে? আর আমি কেউ নই? আমার কথার কোনও দাম নেই? আমি তো বলছি ফুল-শয্যা-টয্যা হয়ে যাক তখন টাকার বন্দোবস্ত করবো। হুট করে বললেই কি টাকা বেরোয়? আর অত টাকা কি এক সঙ্গে কেউ ঘরে রাখে? ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলতেও তো সময় চাই?
সদানন্দ বললে–কিন্তু তখন কেন বললেন যে, আমি বিয়ে করে ফিরে এলেই টাকা দেবেন? আপনি তো এতক্ষণে আজকের মধ্যে কাউকে দিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে রাখতে পারতেন!
কর্তাবাবু বললেন–তার কৈফিয়ৎ কি তোমাকে দিতে হবে নাকি?
সদানন্দ বললে–কিন্তু আপনি তো জানতেন আমি বিয়ে করে ফিরে এসেই টাকাটা চাইবো।
কর্তাবাবু বললেন–গুরুজনদের সঙ্গে কেমন করে কথা বলতে হয় তাও দেখছি তুমি শেখো নি–
সদানন্দ বললে–আপনারা গুরুজন বলে কি আপনাদের সাতখুন মাফ? আমি তার প্রতিবাদ করতেও পারবো না?
চৌধুরী মশাই এবারে ছেলের দিকে চাইলেন। বললেন–তুমি চুপ করো। কার সঙ্গে কেমন করে কথা বলতে হয় তাও জানো না। যাও যাও, নিচেয় যাও, এখন আমাদের অনেক কাজকর্ম পড়ে আছে। কালকে আত্মীয়-স্বজন কুটুমরা আসবে, তাদের ব্যবস্থা করতে হবে, এই সময়ে কিনা তুমি দাদুকে এই রকম বিরক্ত করতে এলে, দুদিন সবুর করতে পারলে না? এখন যাও, পরে ওসব ব্যাপার হবে–
সদানন্দ বললে–তুমি এটা কী বলছো বাবা? যখন দাদু কথা দিয়েছিলেন, তখন তুমিও তো শুনেছ! এমন করবে জানলে তো তখন আমি বিয়ে করতেই যেতুম না।
–থামো!
কর্তাবাবু বিছানায় শুয়ে শুয়েই চিৎকার করে উঠলেন–থামো, থামো, বেয়াদপিরও একটা সীমা আছে।
বেয়াদপি আমি করছি না আপনি করছেন? আপনি কেন এমন করে একজন বিধবার সর্বনাশ করলেন? কেন তার সর্বস্ব কেড়ে নিলেন? কেন তাকে কথা দিয়ে কথা রাখলেন না?
হঠাৎ সমস্ত বাড়ির লোকজন বেশ সচকিত হয়ে উঠলো। কর্তাবাবুর ঘরের ভেতরে একটা গোলমালের আওয়াজ হতেই সবাই কান পেতে গোলমালের কারণটা জানতে চাইল। গৌরী পিসী সিঁড়ির তলা দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ চমকে উঠলো। কীসের আওয়াজ? ভেতরে বাড়ির ঘরে তখন নতুন বউকে ঘিরে অনেক অভ্যাগতের ভিড়। কাছে গিয়ে ডাকলে–বউদি ও বউদি–
সদানন্দর মা ব্যস্ত ছিল। বললে–কী? কী বলছিস?
গৌরী বললে–কর্তাবাবুর ঘরে অত চেঁচামেছি হচ্ছে কীসের বলো তো?
–চেঁচামেচি হচ্ছে কীসের তা আমি কী করে জানবো?
গৌরী বললে–না, মনে হলো খোকার গলা শুনতে পেলাম। খোকাবাবুর সঙ্গে কর্তাবাবুর যেন কথা কাটাকাটি হচ্ছে–
–তাই নাকি?
এই এক ঘণ্টা আগে যে নতুন বউকে বিয়ে করে ঘরে নিয়ে এসেছে সে কী নিয়ে ঠাকুরদাদার সঙ্গে চেঁচামেচি করবে। সাধারণত সদানন্দ তো কারো সঙ্গে চেঁচিয়ে কথা বলে না। সে তো বরাবর চুপচাপই থাকে। সাধারণত কেউ তার মুখই দেখতে পায় না। সে যে কখন কোথায় থাকে কী করে কেউই তা জানতে পারে না। খেতে হয় তাই খায়। তারপর তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়েই আবার কোথায় বেরিয়ে যায় তাও কেউ জানতে পারে না। সে কেন গোলমাল করবে বাড়ির ভেতরে।
কিন্তু তখন ও-সব ভাবনা ভাববার সময় নেই বাড়ির গিন্নীর। প্রীতি বাড়ির গিন্নী। এই সমস্ত অন্দরমহলের মানুষগুলোর দায়িত্ব সমস্ত তার ওপর। কে খেতে পাচ্ছে, আর কে খেতে পাচ্ছে না তাও ভাবা তার দায়িত্ব। এতদিন পরে তার বাবা এসেছে ভাগলপুর থেকে। তিনি বুড়ো মানুষ। তাঁর একমাত্র নাতির আজ বিয়ে। এই প্রথম আর এই-ই বোধ হয় শেষ। কীর্তিপদবাবু সুলতানপুরে একলা পড়ে থাকেন। তারও অনেক সম্পত্তি। সেই সম্পত্তি দেখা-শোনার কাজেই তাঁর দিন কেটে যায়। অথচ তিনি চলে যাবার পর ওই সমস্ত সম্পত্তি তাঁরই মেয়ে-জামাই-নাতি পাবে। তখন এই নাতিকে যেমন নবাবগঞ্জের সম্পত্তি দেখতে হবে, তেমনি দেখতে হবে সুলতানপুরের সম্পত্তিও। তিনি যা কিছু করছেন সবই এদের জন্যে–এই মেয়ে জামাই আর নাতি! তাই নাতির বিয়ের সময় নবাবগঞ্জে না এসে পারেন নি।
এসেই মেয়ের সঙ্গে দেখা করেছেন। অনেকদিন পরে দেখা।
কীর্তিপদবাবু বললেন–কেমন আছিস রে প্রীতি? সব খবর ভালো তো?
প্রীতি বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালো। বললে–তুমি কত রোগা হয়ে গেছ বাবা–
কীর্তিপদবাবু বললেন–রোগা তো হবোই, বুড়ো হচ্ছি না? এখন তোদের রেখে যেতে পারলেই তো হয় রে–
প্রীতি জিজ্ঞেস করলে–আসতে তোমার কোনও কষ্ট হয় নি তো বাবা?
কীর্তিপদবাবু বললেন–আমার কষ্টর কথা রাখ। কুটুম কেমন হলো তাই বল? মেয়ে দেখতে-শুনতে ভালো তো?
প্রীতি বললে–শুনেছি তো মেয়ে দেখতে-শুনতে ভালো। আমি তো টাকা চাই নি। একটা পয়সা নেওয়া হয় নি, শুধু দেখতে-শুনতে সুন্দরী আর স্বভাব-চরিত্রটা ভালো হবে এই-ই চেয়েছিলুম। এখন কালকে বউ আসবে তখন বুঝবো।
খোকা কোথায়? তাকে তো দেখছি নে?
প্রীতি বললে–তার কথা আর বোল না।
কীর্তিপদবাবু জিজ্ঞেস করলেন–কেন? তার আবার কি হলো?
প্রীতি বললে–তাকে তো আমি চোখেই দেখতে পাই না। কখন সে থাকে, কখন থাকে, কোথায় যায়, কী করে, কেউ জানতে পারে না।
