প্রকাশ মামার এসে পর্যন্ত সময় নেই, পরশু থেকে নাইবার খাবার সময় ছিল না। দু’রাত নাগাড়ে জাগা। তার ওপর কেষ্টনগর থেকে বর কনে নিয়ে আসার পর দেখেছে যোগাড় যন্তর কিছুই হয় নি, অথচ রাত পোহালে সব লোকজন এসে হবে। তারপর আছে সদানন্দকে নিয়ে ভাবনা। সে কোথায় কখন কী করে বসে তার ঠিক নেই। রাস্তায় আসতে আসতে সদানন্দ অনেকবার জিজ্ঞেস করেছে–টাকা পাওয়া যাবে তো ঠিক, প্রকাশ মামা?
প্রকাশ মামা বলেছে–তুই অত ভাবছিস কেন? তোর দাদু তো নিজের মুখে তোকে বলেছে টাকা দেবে, তাহলে আর তোর এত ভাবনা কীসের?
সদানন্দ বলেছে–না, কথা না রাখলে কিন্তু আমি দেখে নেব, তা বলে রাখছি
প্রকাশ মামা বলেছে টাকা না দিলে তুই কী করবি?
সদানন্দ বলেছে–কী করবো তা আমিই জানি–
–কী করবি তুই বল্ না। এখন তো বিয়ে তোর হয়েই গেছে। এখন তো আর তা বলে বউকে ফেলে দিতে পারবি না–
–সে আমি যা করবো, তুমি তা দেখতেই পাবে।
প্রকাশ মামা ভাগ্নের কথা শুনে হেসেছে। বলেছে–ওরে, প্রথমে সবাই ওরকম বলে রে! তারপর বউ-এর মুখ দেখে সবাই ভুলে যায়। আর এ তোর যে-সে বউ নয়। এ বউকে তুই ফেলতে পারবি? এই রকম সুন্দরী বউকে?
উত্তরে সদানন্দ কিছু কথা বলে নি। কিন্তু প্রকাশ মামা বুঝেছে বউ-এর মুখ দেখে তার ভাগ্নে গলে গেছে। এক রাত্রের মধ্যেই ভাগ্নের মুখের চেহারা বদলে গেছে। তার পরে ফুলশয্যার রাতটা একবার কাবার হোক তখন আবার সদানন্দ অন্য মানুষ হয়ে যাবে। তখন আর বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতেই চাইবে না। প্রকাশ মামা পাকা লোক। অনেক পুরুষ অনেক মেয়েমানুষকেই চরিয়েছে। সুতরাং সদানন্দ যা-কিছু টাকা-টাকা করেছে একটা রাত কাটলেই সব থিতিয়ে আসবে, এ সম্বন্ধে প্রকাশ মামার আর কিছু সন্দেহ ছিল না।
রাস্তায় ট্রেনের কামরায় প্রকাশ মামা ভাগ্নের কানের কাছে মুখ নিয়ে গেল।
বললে–কী রে, কী ভাবছিস?
সদানন্দ বললে–ভাবছি দাদু টাকাটা দেবে তো ঠিক?
প্রকাশ মামা বললে–তুই দেখছি আস্ত পাগল! কালীগঞ্জের বউ তোর কে শুনি যে তার টাকার জন্যে তুই মাথা ঘামচ্ছিস? আর বুড়িটা ক’দিনই বা বাঁচবে? ও টাকা পেলেই বা কী আর না পেলেই বা কী! তোর এমন বিয়ে হয়েছে, তুই এখন বিয়ের কথা ভাব। তুই এখন ভাব ফুলশয্যার রাত্তিরে বউ-এর সঙ্গে প্রথমে কী কথা বলবি–
সদানন্দ এ কথার কোনও উত্তর দিলে না।
প্রকাশ মামা বললে–দ্যাখ, তুই তো একটা আনাড়ির ডিম। তোকে আমি অনেক চেষ্টা করেও তো মানুষ করতে পারলুম না। রাধার ঘরে তোকে নিয়ে গিয়েই আমি তা বুঝেছি। মেয়েমানুষ দেখলে তুই অত ঘাবড়ে যাস কেন? কাল ফুলশয্যার রাত্তিরে যেন ঘাবড়ে যাস নি, বুঝলি?
সদানন্দ সে কথারও কিছু উত্তর দিলে না।
প্রকাশ মামা বললে–কী রে, কথা বলছিস না যে, ফুলশয্যার রাত্তিরে বউ-এর সঙ্গে প্রথমে কী কথা বলবি সব ভেবে রেখেছিস তো?
তবু সদানন্দর মুখে কোনও জবাব নেই।
প্রকাশ মামা তবু ছাড়লে না। বললে–কী রে, বুঝলি কিছু? কি বলছি তা বুঝতে পারলি?
সদানন্দ বললে—না–
–আরে, এই সোজা কথাটাও বুঝতে পারলি নে? জীবনে একটা অচেনা মেয়ের সঙ্গে প্রথম কথা বলবার আগে একটু ভেবে-চিন্তে নিতে হয়, বুঝলি? কিছু ভেবেছিস তুই?
সদানন্দ বললে–ভাববো আবার কী?
প্রকাশ মামা বললে–এই মরেছে! তুই দেখছি এখনও আনাড়ি আছিস! শোন, তোকে আমি বুঝিয়ে দিই, প্রথমে তো ঘরে ঢুকবি। ঢুকে দরজার খিল দিয়ে দিবি। তোর বউ যদি তখন চুপ করে খাটের বাজু ধরে দাঁড়িয়ে থাকে তো তুই আস্তে আস্তে তার কাছে গিয়ে…..
সদানন্দ হঠাৎ বলে উঠলো–কিন্তু একটা কথা প্রকাশ মামা, তোমার কথাতেই কিন্তু আমি বিয়ে করেছি, তা মনে থাকে যেন
অন্য প্রসঙ্গ আসতে প্রকাশ মামা বিরক্ত হয়ে উঠলো, বললে–তার মানে?
সদানন্দ বললে–তার মানে তুমি ভালো করেই জানো, দুবার করে তা আর শুনতে চেয়ো না। আমার কিন্তু দশ হাজার টাকা চাই।
প্রকাশ মামা বললে–দশ হাজার টাকা আমি কোথায় পাবো? তোর দাদু সে-টাকা দেবে।
–হ্যাঁ, আমি বাড়ি ফিরে গিয়েই টাকা চাইবো। তখন দাদু টাকা না দিলে কিন্তু তোমাকে সেটা পাইয়ে দিতে হবে। তোমার দায়িত্ব সেটা। শেষকালে যেন বোল না তোমার কোনও দায়িত্ব নেই–
–আরে, তুই দেখছি সেই যাকে বলে মালে ভুল তালে ঠিক।
সদানন্দ বললে–সে তুমি যাই বলো, আমি কিন্তু তখন তোমাকে ছাড়বো না। তখন যেন বলো না যে তুমি কিছু জানো না!
প্রকাশ মামা বলে উঠলো–দ্যাখ দিকিন, এখন কি ও সব কথা ভাববার সময়? কোথায় তুই বউ-র ঘোমটার ভেতর উঁকি মেরে দেখবার চেষ্টা করবি, কোথায় ফুলশয্যার রাত্তিরে কী কথা বলবি সেই কথা ভাববি, তা নয় যত সব…
ট্রেনের কামরার মধ্যে নতুন বর-কনে চলেছে তখন। অন্য প্যাসেঞ্জাররা নতুন কনের ঘোমটার ফাঁক দিয়ে তার মুখ দেখবার চেষ্টা করছে। হু-হু করে চলেছে ট্রেনটা। তারপর একসময় এসে থামলো রেলবাজারে। রজব আলি গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের সঙ্গে পালকীর বন্দোবস্তও ছিল। এর পরে আর কোনও গণ্ডগোল হয় নি। নবাবগঞ্জে বর কনেকে দিদির হেপাজতে রেখে ভিয়েন আর শামিয়ানা নিয়ে পড়েছিল। যেদিকে প্রকাশ মামা না দেখবে সেই দিকেই তো চিত্তির!
হঠাৎ কৈলাস গোমস্তা এসে ডাকলে–শালাবাবু, ছোটবাবু একবার ডাকছেন আপনাকে–
–ছোটবাবু? কেন? কোথায়?
