হঠাৎ একটা আওয়াজ কানে এলো-আরে, তুই এখানে? আর আমি তোকে খুঁজে খুঁজে মরছি–
প্রকাশ মামা কাছে এসে দাঁড়ালো। বললে–তোকে যে সবাই খোঁজাখুঁজি করছে—আর—
সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে–আমাকে কী দরকার, এখন তো বিয়ে হয়ে গেছে।
প্রকাশ মামা বললে–তোর মেজাজ এমন তিরিক্ষে কেন রে? বিয়ে করে এলি সুন্দরী বউ হলো তবু তোমার তিরিক্ষে মেজাজ গেল না, আয় আয়–
সদানন্দ বললে–কিন্তু আমার টাকা?
প্রকাশ মামা বললে–আরে, টাকা কি তোর পালিয়ে যাচ্ছে?
সদানন্দ বললে–না, দাদু বলেছিল আমি বিয়ে করে আসার পর টাকা দেবে। আমি সেই টাকা নিয়ে এখনই কালীগঞ্জের বউকে গিয়ে দিয়ে আসবো–
প্রকাশ মামা বললে–তাহলে তোর দাদুকে গিয়ে তুই বল–দাদু তো বলেই ছিল টাকা দেবে–
সদানন্দ বললে–আমি এখনই যাচ্ছি–
নরনারায়ণ চৌধুরীর মেজাজটা বেশ ঠাণ্ডা ছিল। এমনিতে সম্পত্তির ঝঞ্ঝাটে মেজাজ তাঁর সহজে ঠাণ্ডা থাকে না। নতুন বউ তাঁকে এসে প্রণাম করে গেছে। তিনি তাকে আশীর্বাদ করেছেন। আশীর্বাদ করেছেন যেন সে এবংশের সুখ-সমৃদ্ধি করে। যেন বংশ পরম্পরায় চৌধুরী বংশের অক্ষয়কীর্তি অমর করে রাখে। আর নতুন বউ-এর রূপ দেখেও তিনি খুশী হয়েছিলেন। রূপ বটে! যেমন রূপ তিনি আশা করেছিলেন ঠিক তেমনি। আর শুধু রূপ নয়, লক্ষণও ভালো। তিনি ভালো করে বউ-এর মুখখানা খুঁটিয়ে দেখছিলেন। সুলক্ষণা যাকে বলে ঠিক তাই, এ পারবে। এ তাঁর নাতির বেয়াড়াপনা দূর করবে।
হঠাৎ সামনে যেন ভূত দেখলেন। বললেন–কে?
সদানন্দ বললে–আমি সদানন্দ–
–ও, তা কী চাও?
সদানন্দ বললে–আমার টাকা–
–টাকা?
টাকার কথা শুনে নরনারায়ণ চৌধুরী চমকে উঠলেন। টাকা! যেন কিছুই জানেন না তিনি। যেন কিছুই তার জানবার কথা নয়। যেন কাউকে তিনি টাকা দেবার কথা বলেনও নি। কথাটা শুনে তিনি বাবার মত তাঁর নাতির মুখের দিকে চেয়ে রইলেন।
তারপর বললেন–কিসের টাকা?
সদানন্দ বললে–আপনার মনে নেই আপনি দশ হাজার টাকা দেবেন বলেছিলেন? আপনি বলেছিলেন আমি বিয়ে করে এলেই আপনি কালীগঞ্জের বউকে দশ হাজার টাকা দেবেন
কর্তাবাবুর যেন এতক্ষণে মনে পড়লো। বললেন–তা দেব যখন বলেছি তখন দেব। আমি কি বলেছি দেব না?
সদানন্দ বললে–তাহলে দিন টাকা আমি তাকে দিয়ে আসি–
কর্তাবাবু এতক্ষণে চটে গেলেন। বললেন তুমি কেন দিতে যাবে? তুমি এখন বাড়ি ছেড়ে যাবে কী করে? আর তুমি ছাড়া কি টাকা দিয়ে আসবার লোক নেই? আমি কি লোক দিয়ে টাকা পাঠাতে পারি না?
সদানন্দ বললে–কেন পাঠাতে পারবেন না, কিন্তু আমি জানি আপনি তা পাঠাবেন না। পাঠালে অনেক আগেই তা পাঠাতেন।
কর্তাবাবু নাতির কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এমন সুরে তো সদানন্দ কখনও কথা বলে না। কথার এত তেজ কোথায় পেলে সে? অবশ পা দুটো সামনের দিকে টানবার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি মনে মনে ছটফট করতে লাগলেন। বললেন–তুমি হঠাৎ এত কড়া কড়া কথা বলছো যে? কে তোমাকে এসব কথা শিখিয়েছে?
সদানন্দ বললে–কে আবার শেখাবে? আপনি বলেছিলেন টাকা দেবেন, তাই আপনার কথাই আপনাকে মনে করিয়ে দিতে এসেছি—
কর্তাবাবু বললেন–মনে করিয়ে তোমাকে দিতে হবে না। তুমি তোমার নিজের ধান্দা নিয়ে থাকো। এখন বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন লোকজন এসেছে, তাদের দেখাশোনা করো তাহলেই যথেষ্ট করা হবে। এখন যাও–
সদানন্দ তবু নড়লো না, বললে–কিন্তু আপনি তো আপনার কথা রাখলেন না দাদু, আমি আপনার কথাতেই বিয়ে করতে গিয়েছি, এখন আপনি আপনার কথা রাখুন। টাকা দিন–
–আরে, এ তো মহা মুশকিলে পড়া গেল দেখছি। বাড়িতে নতুন বউ এসেছে, কোথায় সেই নিয়ে সবাই ভাবছে, আর এখন কি না বলে টাকা দাও! অমনি টাকা দিলেই হলো?
তারপর কী করবেন বুঝতে পারলেন না। বললেন–এখন আমি ব্যস্ত আছি, পরে তোমার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলবো, তুমি এখন ভিতরে যাও
–না আমি যাবো না। আগে আমার টাকা চাই—
কর্তাবাবু বললেন–কী বললে–তুমি?
সদানন্দ বললে–আগে আপনি টাকা দেবেন তবে এখেন থেকে নড়বো—
কর্তাবাবু কৈলাসের দিকে চেয়ে বললেন–কৈলাস একবার ছোটবাবুকে ডাকো তো–
কৈলাস গোমস্তা উঠে নিচেয় চলে গেল। সদানন্দও সেই ঘরের মধ্যে কাঠের পুতুলের মত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। সেই ঠিক করেই ফেলেছিল যে সে টাকা না নিয়ে ঘর থেকে আর বেরোবে না। সমস্ত বাড়ি তখন উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজনে মুখর। আজ চৌধুরীবাড়ীতে নতুন বউ এসেছে। মেয়েরা উলু দিয়েছে, শাঁখ বাজিয়েছে। বাড়ির সব লোকজন নতুন কাপড় পেয়েছে। কৈলাস গোমস্তা থেকে শুরু করে রজব আলী পর্যন্ত কেউ বাদ যায় নি। এমন ঘটনা তো রোজ রোজ ঘটে না। আবার কত বছর পরে এ বাড়িতে এমন ঘটনা ঘটবে কে বলতে পারে! বউ আসবার সঙ্গে সঙ্গে পাড়ার সব বউ-ঝিরা এসে– ভিড় করেছে। কেদার, গোপাল ষাট সবাই নিজের নিজের বউদের আগাম পাঠিয়ে দিয়েছে। বউভাতের দিন সবাই তো বউ দেখতে পাবেই। কিন্তু তার তো অনেক দেরি। চব্বিশ ঘণ্টা না গেলে তো আর বউভাত হচ্ছে না। শুধু বউভাতই নয়, ফুলশয্যাও হবে, বাড়ির উঠোন জুড়ে শামিয়ানা খাটানো হয়েছে। যেদিকে পুকুরঘাট সেই দিকটাতেই বসেছে ভিয়েন। সেখানে বড় বড় দশখানা উনুন তৈরি হয়েছে। দুদিন আগে থেকে সেখানে মিষ্টি তৈরি শুরু হয়ে গিয়েছে। রসগোল্লা তৈরি হবার পর গামলায় তুলে রাখতে হবে। সেই সব গামলাও এসে গিয়েছে। সেগুলো সার সার বসানো হয়েছে পুকুরের ধার ঘেঁষে। কিন্তু আসল বড় সামিয়ানাটা খাটানো হয়েছে বাড়ির সামনে। সেখানে বসবে বিশিষ্ট অতিথিরা।
