সদানন্দ কিছু উত্তর দিলে না। চুপ করে রইল।
–কথা বলছো না যে? যাও, বিয়ে করতে যাও। শেষকালে কি ট্রেন ফেল করবে নাকি?
সদানন্দ বললে–কিন্তু টাকা?
নরনারায়ণ চৌধুরীও তেমনি লোক। বললেন–টাকা কি হুট বললেই আসে?
তুমি বললে–টাকা দাও আর আমিও অমনি টাকা দিয়ে দিলুম, তাই কখনও হয়, না হয়েছে? টাকা দেওয়া হবেখন। তুমি এখন যা করতে যাচ্ছো তাই করতে যাও–শেষকালে কি লোক হাসাবে নাকি?
সদানন্দর মুখে সেই একই জবাব। বললে–টাকা না দিলে আমি যাবো না–
নরনারায়ণ চৌধুরীর জমিদারি মেজাজ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো–বলছি তো টাকা আমি দেব। আমার কথার একটা দাম নেই? তোমার জিদটাই বজায় থাকবে?
–কিন্তু কখন টাকা দেবেন?
নরনারায়ণ চৌধুরী বললেন–তুমি কাল বিয়ে করে ফিরে এলেই দেব–
–যদি না দেন?
এতক্ষণে চৌধুরী মশাই কথার মধ্যে মুখ খুললেন। বললেন–আর তুমি কথা বাড়িও না খোকা, দাদু যখন বলছেন টাকা দেবেন তখন তার ওপরে আর কথা বলো না। আর এ নিয়ে কথা কাটাকাটি করলে ওদিকে গায়ে-হলুদের দেরি হয়ে যাবে, ট্রেনও ফেল করবো আমরা–
সদানন্দ বোধ হয় এতক্ষণে একটু নরম হলো। বললে–তোমরা সবাই কথা দিচ্ছ তাহলে? আমি এখন যাচ্ছি বটে, কিন্তু তোমরা সাক্ষী রইলে। টাকা না দিলে কিন্তু সর্বনাশ হয়ে যাবে,–এই বলে রাখলুম, চলো–
এতক্ষণে যেন চৌধুরী মশাই নিশ্চিন্তের হাঁফ ছাড়লেন। সব মিটে গেল। কর্তাবাবু ছেলেকে আলাদা করে ডেকে বলে দিলেন–তুমি সঙ্গে যাচ্ছো তো, একটু নজর রেখো, যেন আবার কোনও গণ্ডগোল না করে বসে সেখানে। তুমি কন্যে-কর্তার বাড়িতে রাত্তিরে থেকো
চৌধুরী মশাই বললেন–হ্যাঁ, আমি তো সঙ্গে যাচ্ছিই, রাত্রে সেখানেই থাকবো, সম্প্রদান পর্যন্ত দেখবো, তারপর নিরঞ্জন রইল, প্রকাশ রইল, তাদেরও একটু পাহারা দিতে বলবো–
নরনারায়ণ চৌধুরী বললেন–ছেলেমানুষের মন, কেউ হয়ত নানা রকম মতলব দিয়ে ওর মাথাটা গরম করে দিয়েছে, ও নিয়ে তুমি ভেবো না। ছেলেবয়সে বিয়ের আগে ওরকম সকলেরই মাথা গরম হয়। তারপর বিয়ে-থা হয়ে গেলে আবার যেমন-কে-তেমন, ও-সব আমার অনেক দেখা আছে—
তা এর পর আর কোন গণ্ডগোল হয় নি। তাড়াহুড়ো করে গায়ে-হলুদ হয়েছে সদার, জামা-কাপড় বদলে নিয়ে সবাই দুর্গা দুর্গা বলে যাত্রা করেছে। তারপর বিয়েও হয়েছে, বাসর ঘরও হয়েছে। সদানন্দ কোনও বেয়াড়াপনা করে নি।
একবার শুধু প্রকাশ মামাকে সদানন্দ জিজ্ঞেস করেছে–দাদু টাকা দেবে তো ঠিক প্রকাশ মামা?
প্রকাশ মামা বলেছে–আরে তুই অত ঘাবড়াচ্ছিস কেন? টাকা পেলেই তো তোর হলো?
নতুন বউকে নিয়ে ট্রেনে উঠেছে সবাই। সঙ্গে প্রকাশ মামা আছে। প্রকাশ মামা বরকর্তা। আর আছে নিরঞ্জন। আসবার সময় বেয়াই মশাই-এর চোখ দুটোও জলে ভরে এসেছিল। একমাত্র সন্তান, এই নয়নতারাই ছিল তাঁর সব। মেয়েও যত চোখের জল ফেলেছে, মেয়ের মা বাবাও তত। ট্রেনে ওঠবার সময় কালীকান্ত ভট্টাচার্য আর থাকতে পারেন নি। একেবারে প্রকাশ মামার হাত দুটো জাপটে ধরেছিলেন।
বলেছিলেন–আমার মেয়েকে একটু দেখবেন বেয়াই মশাই, ও-মেয়ে সংসারের কিছুই জানে না, দোষ-ত্রুটি যা-কিছু সব ক্ষমা করে নেবেন।
প্রকাশ মামা বলেছিল–আপনি কিছু ভাববেন না বেয়াই মশাই, আপনার মেয়ের অনেক পুণ্যফলে অমন শ্বশুর-শাশুড়ী পেলে। অমন শ্বশুর-শাশুড়ী কোনও মেয়ে পায় না।
তারপর ট্রেন ছেড়ে দিলে। নয়নতারা অনেকক্ষণ ধরে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে রইল। তারপর যখন বাবাকে আর দেখা গেল না তখন ঘোমটার আড়ালে কান্নায় ভেঙে পড়লো।
তারপর বর-কনে যখন নবাবগঞ্জে এসে পৌঁছুলো তখন বেলা পড়ো-পড়ো। বাড়ির ভেতর থেকে উলুর শব্দ উঠলো, শাঁখ বেজে উঠলো। নতুন বউ এসেছে চৌধুরীবাড়িতে। চৌধুরীবাড়ির প্রথম লক্ষ্মী এসেছে। এ-গ্রাম ও গ্রাম থেকে লোকজন মেয়ে-পুরুষ একবারে ভেঙে পড়লো।
বারোয়ারীতলার নিতাই হালদারের দোকানের মাচায় তখন রীতিমত সভা বসে গেছে।
কেদার বললে–বউ কী রকম দেখলি রে গোপাল?
গোপাল ষাট বললে–আমি আর কখন দেখলুম, আমার বউ গিয়েছিল, বললে–একেবারে জগদ্ধাত্রীর মত রূপ। বড়লোকের ছেলের বউ, আমাদের মতন শাঁকচুন্নী বউ হবে নাকি?
–কেন, তোর বউকে কি খারাপ দেখতে?
গোপাল ষাট বললে–খারাপ বলে খারাপ, একেবারে রক্ষেকালীর বাচ্চা ভাই, যখন আমার সঙ্গে ঝগড়া করে তোরা সে-চেহারা দেখিস নি–
সবাই হেসে উঠলো। নিতাই বলে উঠলো–ওরে তা নয়, আসলে পরের বউকে সকলেরই ভালো লাগে। যার সঙ্গে ঘর করতে হয় সে তো পুরোনো হয়ে যায়–
কেদার বললে–ওরে, এই আমার কথাই ধর না। আমি যখন বিয়ে করেছিলুম তখন সবাই বউ দেখে বললে–পরী। তারপর বছর বছর ছেলে বিইয়ে বিইয়ে চেহারাটা এমন করে ফেললে যে তার দিকে এখন চাইতে ঘেন্না করে আমার বউ তো নয় যেন কাঁঠাল গাছ–
নিতাই বললে–তা কাঁঠাল গাছের কী দোষ, কাঁঠাল গাছের গোড়ায় অত জল ঢাললে ফলন তো হবেই।
কথাটা-শুনে আর এক চোট হাসি উঠলো।
কিন্তু তখন চৌধুরি বাড়ির ভিড় একটু করে পাতলা হয়ে আসছে। প্রকাশ মামাই সকলকে তাড়া দিতে লাগলো। বললে–সরো সরো বাপু তোমরা, একটু ভিড় পাতলা করো, কাল সারা রাত বউ ঘুমোয় নি–সরো, একটু হাঁফ ছাড়তে দাও–
সদানন্দ একটা ফাঁকা জায়গায় খোলা আকাশের নিচেয় গিয়ে দাঁড়ালো। একটা অস্বস্তিকর অবস্থার আবহাওয়া তাকে যেন এতক্ষণ গ্রাস করেছিল। এবার সে মুক্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো।
