চৌধুরী মশাই প্রায়ই গৃহিনীকে প্রশ্ন করতেন–খোকা কোথায় গেল?
প্রীতিলতা বলতো–গেছে নিশ্চয়ই কোথাও—
চৌধুরী মশাই বলতেন–কিন্তু কোথায় গেছে সেটা বলবে তো?
প্রীতিলতা বলতো কিন্তু কোথায় গেছে তা আমি কী করে বলবো? তার বয়েস হয়েছে, সে নিজের খুশীমতো যেখানে ইচ্ছে ঘুরে বেড়াবে। আমাকে সে বলে যাবে নাকি?
এর জবাবে চৌধুরী মশাই কী আর বলবেন! নিজের অভিলাষের অপূর্ণতার দুঃখটা নিজের মনেই হজম করবার চেষ্টা করতেন। কিন্তু এমনি করে আর বেশিদিন চললো না। শেষকালে সমস্ত রোগের একমাত্র উপশম হিসেবে যখন খোকার বিয়ের প্রসঙ্গটা উঠলো, তিনি এক কথাতেই রাজি হয়ে গেলেন। ভাবলেন, হয়ত বিয়ের পরই সব কিছু সহজ স্বাভাবিক হয়ে যাবে। যেমন সবার হয়ে থাকে।
কিন্তু সেই বিয়ের দিনেই যে খোকা এমন কাণ্ড করে বসবে তা কে কল্পনা করতে পেরেছিল! প্রকাশই বিয়ের সম্বন্ধ করেছিল সুতরাং তারই যত দায়িত্ব। সে-ই ছুটলো চারিদিকে। চারিদিকে সকলকে নেমন্তন্ন করা হয়েছে, দই, মাছ, মিষ্টি সব কিছু তৈরি। অধিবাস নিয়ে কুটুমবাড়ি থেকে লোক এসে গেছে অথচ বর নেই। নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে হলো চৌধুরী মশাই-এর। কুটুমবাড়ির লোককে কী জবাব দেওয়া হবে!
কিন্তু না, প্রকাশ করিতকর্মা লোক বটে। বেলা তখন দ্বিতীয় প্রহর উৎরে গেছে। হঠাৎ খোকাকে নিয়ে এসে হাজির!
চৌধুরী মশাই খবর পেয়েই দৌড়ে নিচেয় গেছেন।
গিয়ে বললেন–কী হলো, কোথায় পেলে ওকে?
প্রকাশ বললে–সে সব কথা এখন থাক জামাইবাবু, সে অনেক কাণ্ড!
–অনেক কাণ্ড? অনেক কাণ্ড মানে কী, খুলে বলো! বেলা তিনটেয় বাড়ি থেকে বর নিয়ে বেরোতে হবে। হাতেও আর সময় নেই। এদিকে কুটুমবাড়ি থেকে লোক এল, অধিবাসের তত্ত্ব নিয়ে যারা এসেছিল তারা দেখে গেছে যে বরের গায়ে-হলুদ হয়নি
প্রকাশ বললে–তাদের বললেন কেন যে গায়ে-হলুদ হয়নি?
চৌধুরী মশাই বললেন বলতে হবে কেন? তাদের চোখ নেই? তারা তো সবই দেখতে পেলে–
প্রকাশ তাতেও ভয় পাবার লোক নয়। তার হাতে যখন সব কিছুর ভার দেওয়া হয়েছে তখন সেটা তারই দায়। বললে–ঠিক আছে, কুছ পরোয়া নেই, আমি বরকে কাঁটায় কাঁটায় ঠিক সময়ে হাজির করবোই, আমার ওপর ভর দিয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন–
দিদিও খবর শুনে কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। বললে–হ্যাঁ রে প্রকাশ, খোকাকে কোথায় পেলি তুই শেষ পর্যন্ত?
প্রকাশ বললে–তুমি এখন কথা বলতে বসো না দিদি, তুমি গায়ে-হলুদের যোগাড় করো গে, বিকেল তিনটেয় আমরা বর নিয়ে যাত্রা করবো। নইলে ট্রেন ধরতে পারবো না। আমার একটা জরুরী কথা আছে জামাইবাবুর সঙ্গে, তুমি এখান থেকে যাও–
তারপর চৌধুরী মশাইকে একপাশে ডেকে নিয়ে গেল প্রকাশ।
বললে–একটা কথা আছে জামাইবাবু, সদাকে পেয়েছি কোথায় জানেন, কাউকে যেন বলবেন না, পেয়েছি কালীগঞ্জে-
কালীগঞ্জে?
–হ্যাঁ, কালীগঞ্জের বউ-এর কাছে গিয়ে উঠেছিল সদা। জানি না কালীগঞ্জের বউ সদাকে কী ফুস মন্তর দিয়েছে, দশ হাজার টাকা না দিলে সদা বিয়ে করতে যাবে না–
–দশ হাজার টাকা? কালীগঞ্জের বউকে দিতে হবে?
–হ্যাঁ, তা না দিলে সদা বিয়ে করতেই যাবে না। ওর দাদু কালীগঞ্জের বউকে কথা দিয়েছিল। সেই কথা এখন রাখতে হবে!
চৌধুরী মশাই-এর বিস্ময়ের ঘোর যেন তখনও কাটেনি। বললেন–সে সব তো অনেক কাল আগেকার কথা। ওই কালীগঞ্জের বউ-ই তো আমাদের নামে মামলা করছিল। তখন বাবা কথা দিয়েছিল দশ হাজার টাকা দিয়ে সব মিটিয়ে নেবে–তা খোকা এ সব জানলে কী করে?
প্রকাশ বললে–কী জানি কী করে জানলে। সেখান থেকে তো সদা কিছুতেই আসতে চায় না, শেষে আমি বললুম যেনবাবগঞ্জে গিয়ে তোকে টাকা দেওয়া হবে, তবে এলো। এখন টাকাটার একটা বন্দোবস্ত করুন–
চৌধুরী মশাই বললেন–এখনই টাকা দিতে হবে?
প্রকাশ বললে—হ্যাঁ–
–টাকা না দিলে?
–টাকা না দিলে ও বিয়ে করতে যাবে না।
–তা টাকা পরে দিলে চলবে না? বিয়ে-টিয়ে আগে মিটে যাক তারপর না হয় ভেবে চিন্তে টাকা দেওয়া যাবে।
প্রকাশ বললে–তা বোধ হয় শুনবে না সদা, ও যা বেয়াড়া ছেলে আপনার। একবার যখন গোঁ ধরেছে তখন টাকা না দিলে ছাড়বেই না।
মহা ভাবনায় পড়লেন চৌধুরী মশাই। ওদিকে বেশি ভাববারও সময় নেই। বেলা তিনটেয় ট্রেন, সেই ট্রেন ধরে রাণাঘাটে যেতে হবে। সেখান থেকে আবার কেষ্টনগর।
শেষকালে আর কিছু না ভেবে পেয়ে বললেন–দেখি, একবার বাবাকে গিয়ে বলে আসি–
বলে চৌধুরী মশাই ওপরে চলে গেলেন।
প্রকাশ মামা সদানন্দর কাছে এল। সদানন্দ জিজ্ঞেস করলে–কী হলো?
প্রকাশ মামা বললে–হচ্ছে, টাকার ব্যবস্থা হচ্ছে। জামাইবাবু তোর দাদুর কাছে টাকা আনতে গেছে। তুই কিচ্ছু ভাবিস নি, তোর টাকা পেলেই তো হলো। তোর দাদুর কি টাকার অভাব? দশ হাজার টাকা তোর দাদুর হাতের ময়লা–
সদানন্দ বললে–ঠিক আছে, দাদু যদি টাকা দেয় তো ভালো, কিন্তু টাকা না দিলে আমি কিন্তু বিয়ে করতে যাবো না, এ আমি তোমায় জানিয়ে রাখছি–ততক্ষণে ওপর থেকে ডাক এলো। ওপরে যেতে হবে দু’জনকে।
সদানন্দ আগে আগে পেছন-পেছন প্রকাশ মামা। দাদুর ঘরে তখন কৈলাস গোমস্তা আর চৌধুরী মশাই রয়েছে। বিছানার ওপর আধ-শোওয়া অবস্থায় দাদু।
সদানন্দকে দেখেই দাদু বললেন–কী সব পাগলামির কথা শুনছি তোমার? তোমার না বয়েস হয়েছে? এই বয়সে কি তোমার ছেলেমানুষী এখনও গেল না?
