–কিন্তু পালিয়েছিল কেন? কিছু বলছে না সদা?
কথাটা সবাইকে ভাবিয়ে তুললো। বিয়ের নামে কেউ পালায়? সদাকে ছোট্টবেলা থেকেই দেখে এসেছে। কিন্তু তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে পারেনি কেউ কখনও। ইস্কুল থেকে ফেরবার পথে এই বারোয়ারিতলা দিয়েই সে বাড়ি ফিরেছে। হাটের দিনেও অনেক সময় হাটে এসেছে সে। কিন্তু কেমন যেন ভুলো-ভুলো মন সব সময়ে। আর বেশির ভাগই শালাবাবু সঙ্গে থাকতো। চৌধুরী মশাই অনেকদিন ছেলেকে এনে চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়েছেন। বলেছেন–একদিন তো তোমাকে কাজকর্ম বই দেখতে হবে, এখন একটু জেনে-শুনে নাও–
অতি সুবোধ বালকের মত সদানন্দ চুপচাপ শুনে গেছে বাবার কথা।
চৌধুরী মশাই বলতেন–এই দেখ, এইগুলোর নাম পরচা, এই হচ্ছে দাখলে, আর এই হলো নকশা। এই নকশার ওপর নম্বর দেওয়া রয়েছে। এইগুলো হচ্ছে দাগনম্বর–
এক এক করে চৌধুরী মশাই সেরেস্তার নথিপত্র সব বোঝাতেন। কীসের কী মানে, কীসের কী গুরুত্ব। এককালে যখন দাদু থাকবে না, বাবা-মা কেউই থাকবে না, তখন তাকে নিজেকেই তো এই সব দেখতে হবে। নায়েব-গোমস্তার ওপর ভরসা করে আর যা-ই করা যাক জমিদারি সেরেস্তার কাজ চলে না। তোমার নিজের জিনিস, তোমাকে নিজের হাতেই সব করতে হবে। উকিল তোমাকে ঠকাতে চাইলেও তুমি কেন ঠকবে? মামলা-মকর্দমার সময় তোমাকে নিজেকে কাছারিতে যেতে হবে। কাঠগড়ায় সাক্ষী হয়ে দাঁড়াতে হবে। এ রকম চুপ করে থাকলে চলবে না। উকিলের জেরায় ভয় পেলে চলবে না। নিজের স্বার্থ কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নিতে শিখবে। আর প্রজা ঠ্যাঙাতে যদি না পারো তো জমিদারি কোর না। এ ভালোমানুষির কাজ নয়, বুঝলে?
এত যে উপদেশ, এত যে পাখি-পড়ানো, সব কিন্তু বৃথা হয়েছিল।
চৌধুরী মশাই বলতেন–কিছু বুঝলে? কথার জবাব দিচ্ছ না কেন? বুঝলে কিছু?
সদানন্দ বলতো–না–
চৌধুরী মশাই চটে যেতেন। বলতেন–কেন? এতে না-বোঝবার কী আছে? লেখাপড়া শিখেছ তুমি, তোমার কাছে এ-সব কথা তো শক্ত হবার কথা নয়। ওই কৈলাস গোমস্তাকে দেখ তো, ও তো লেখা পড়ার কিছুই জানে না, কিন্তু আমাদের কত নম্বর পরচায় কত বিঘে কত ছটাক জমি আছে সব ওর মুখস্থ, ও ম্যাট্রিক পাসও নয়, আই-এ পাসও নয়, তোমার মত বি-এ পাস ছেলে যদি এ-সব বুঝতে না পারে তো এতগুলো পয়সা নষ্ট করে কী লাভ হলো?
তারপর যেন চৌধুরী মশাই-এর খেয়াল হতে খোকা কিছুই শুনছে না, অন্য দিকে চেয়ে আছে। তারপর ছেলের দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখলেন চণ্ডীমণ্ডপের উঠোনে রজব আলি তাঁদের গোরুটাকে জোরে জোরে মারছে।
চৌধরী মশাই ধমকে উঠতেন–ওদিকে কী দেখছো? আমি কাজের কথা বলে যাচ্ছি। আর তুমি রজব আলিকে দেখছো! রজব আলির দিকে দেখে তোমার কী লাভ?
কিন্তু না, তার লাভ ছিল। রজব আলিকে দেখেও তার লাভ ছিল। কথা নেই বার্তা নেই সেই অবস্থাতেই সদানন্দ সেখান থেকে উঠে গেল। উঠে রজব আলির হাত থেকে লাঠিটা এক মিনিটের মধ্যে কেড়ে নিলে। বললে–মারছিস কেন গরুটাকে? কী করেছে গোরুটা?
রজব আলি তো ভয়ে অস্থির। গাড়ির গোরুকে মেরেছে তাতে এমন কী কসুর করেছে সে যে খোকাবাবু তার পাঁচন-বাড়ি কেড়ে নিলে!
কিন্তু ব্যাপার বুঝে চৌধুরী মশাই সেখানে এসে হাজির হলেন।
বললেন–এ কী করছো? এ কী করছো?
সদানন্দ বলল–ও গোরুটাকে মারছে কেন? গোরুটা কী করেছে ওর?
চৌধুরী মশাই বললেন–তা দরকার হলে গোরুকে মারবে না? বদমায়েসি করেছে তাই মেরেছে। তুমি ও নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছো কেন?
সদানন্দ বললে–তাহলে আমিও রজবকে মারবো, ও-ও তো বদমায়েসি করেছে–
চৌধুরী মশাই ছেলের বেয়াড়া বুদ্ধি দেখে অবাক হয়ে গেলেন। তাঁর ছেলে হয়ে এ রকম বেয়াড়া বুদ্ধি কেন হলো? এমন বুদ্ধি হলে এত সম্পত্তি রাখবে কী করে? চিরকাল তো আর তিনি থাকছেন না। একদিন তো এই ছেলের হাতে এই সমস্ত সম্পত্তি তুলে দিয়ে তাঁকে চলে যেতে হবে। তখন?
সেইদিন থেকেই চৌধুরী মশাই-এর আর এক ভাবনা শুরু হলো। সেইদিন থেকেই তিনি ছেলেকে নিজের কাছে কাছে রাখবার চেষ্টা করতে লাগলেন। চণ্ডীমণ্ডপে নিজের কাছে বসিয়ে সব কিছু দেখাতে বোঝাতে লাগলেন। সদানন্দ কিছুক্ষণ কাছে বসে থাকতো বটে, কিন্তু তার মন কোথায় পড়ে থাকতো কে জানে।
খানিকক্ষণ পরেই বলতো–আমি যাই—
চৌধুরী মশাই বলতেন–কোথায় যাবে আবার?
সদানন্দ বলতো–আমার ভালো লাগছে না–
–ভালো লাগছে না তো যাবে কোথায়?
সদানন্দ বলতো-বাইরে–
–বাইরে কোথায় তা বলবে তো?
কিন্তু সদানন্দ বাইরে যে কোথায় যাবে তা সে নিজে জানলে তবে তো বলবে! রাত্রে চৌধুরী মশাই গৃহিণীকে বলতেন–খোকা কি এখনও প্রকাশের সঙ্গে মেশে নাকি? গৃহিণী অবাক হয়ে যেতেন। বলতেন–প্রকাশের সঙ্গে মিশলে কী হয়েছে?
চৌধুরী মশাই বলতেন–না, প্রকাশের সঙ্গে যেন বেশি মেলা-মেশা না করে খোকা। এই তোমাকে সাবধান করে দিলুম।
প্রীতিলতাও জমিদারের মেয়ে। বাপের বাড়ির লোকের নিন্দে সহ্য করবার মত মেয়ে সে নয়।
বলতো–তুমি তো প্রকাশকে দেখতে পারবেই না। তা সে তোমার কী ক্ষতি করেছে শুনি?
চৌধুরী মশাই একটু নরম হয়ে বলতেন–না, আমি তা বলছি না। চিরকাল ওই রকম আড্ডা দিয়ে বেড়ালেই চলবে? সেরেস্তার কাজকর্মও তো একটু-একটু করে রপ্ত করে নিতে হবে! আমি আর ক’দিন–
এর পরে এ-প্রসঙ্গ আর বেশিক্ষণ চলতো না। কিন্তু চৌধুরী মশাই মনে মনে অস্বস্তি বোধ করতেন সদানন্দকে নিয়ে। ঠিক যেমন ছেলে তিনি চেয়েছিলেন সদানন্দ তেমন ছেলে হলো না। বাবার কাছে আসতেই যেন তার অনিচ্ছে। বাবার চোখে পড়বার ভয়ে সে যেন কোথাও লুকিয়ে থাকে। তাঁর দৃষ্টির আড়ালে সে ঘুরে বেড়াতে পারলে যেন বাঁচে।
