বলতে বলতে কালীকান্ত ভট্টাচার্য এসে পড়লেন। বললেন–এই যে, এখানে বাবাজীবনও আছে দেখছি। তা সিগারেট-টিগারেট সব পাচ্ছেন তো বেয়াই মশাই?
প্রকাশমামার মুখে তখন সিগারেট জ্বলছিল। সুতরাং উত্তর আর তাকে দিতে হলো না। শুধু বললে–এবার যাত্রার বন্দোবস্ত করুন বেয়াই মশাই, আমি বর-কনেকে একবার নবাবগঞ্জে পৌঁছিয়ে দিতে পারলেই আমার ছুটি। তারপর আপনার ভাগ্য আর আপনার মেয়ের হাতযশ–
তা প্রকাশমামা করিতকর্মা লোকই বটে। করিতকর্মা লোক না হলে কি এ বিয়ে হত নাকি? বিয়ে তো প্রায় আটকেই গিয়েছিল কাল সকালবেলা। বাড়িময় সোরগোল উঠেছিল। নবাবগঞ্জে কথাটা প্রায় ছড়িয়েই গিয়েছিল। সবাই-ই জানতে পেরেছিল যে চৌধুরী মশাই এর ছেলে পালিয়ে গিয়েছে। তাকে আর কেউ খুঁজে পাচ্ছে না। একে গ্রাম-দেশ তার ওপর ছোট গ্রাম নবাবগঞ্জ। কার বাড়িতে জামাই এসেছে, কার বাড়ির মেয়ে কার সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করেছে, তা আর কারো জানতে বাকি থাকে! তা ছাড়া নেমন্তন্ন হয়েছে মোটামুটি সব বাড়িতেই। তারা কদিন ধরেই খাবে। শুধু খাবে না, একেবারে গণ্ডেপিণ্ডে খাবে। তার ওপর ছাঁদা বেঁধে নিয়ে যাবে। ক’দিন আগে থেকেই তারা বাড়িতে কম খেয়ে খেয়ে চালাচ্ছে, যাতে খাবার জন্যে পেটে কিছু জায়গা খালি থাকে। কিন্তু সদানন্দর পালিয়ে যাবার খবর পাওয়ার পর তাদের সব উৎসাহে যেন ভাঁটা পড়লো। তাহলে? তাহলে খাওয়াটা কি মাটি হলো?
বারোয়ারিতলায় নিতাই হালদারের দোকানের মাচার ওপর রীতিমত সভা বসলো।
পরমেশ মৌলিক তখন সবে খবরটা নিয়ে এসেছে। খবরটা শুনে সকলের মুখই ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। বললে–তাহলে খুড়ো মশাই, আজকে কি খাওয়া হবে না?
পরমেশ মৌলিক বললে–কী জানি হে কপালে কী আছে! মাছ-দই-মিষ্টি সব কিছুর বন্দোবস্ত হয়ে গেছে।
–কী কী কী মিষ্টি হয়েছিল? শুনলুম নাকি কেষ্টনগর থেকে সরভাজার অর্ডার দেওয়া হয়েছিল?
শুধু সরভাজা নয়। কদিন থেকেই খাওয়ার আইটেমগুলো নিয়ে আলোচনা করে করে সকলের সব মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। মাছ, মাংস, মাছের মুড়িঘণ্ট, ধোকার ডালনা, বেগুন ভাজা, নিরামিষ আর আমিষ দু’রকম চপ, দই, রসগোল্লা, পানতুয়া আরো অনেক কিছু।
এমন সময়ে দেখা গেল হন্তদন্ত হয়ে শালাবাবু আসছে। সবাই হাঁ করে চেয়ে রইল সেদিকে। কাছাকাছি আসতেই সবাই এগিয়ে গেল।
–শালাবাবু কী খবর? পেলেন সদাকে?
শালাবাবুর মুখটা গম্ভীর। বললে–না হে, পেলুম না, দেখি একবার কালীগঞ্জের দিকে গিয়ে–
কালীগঞ্জে? কালীগঞ্জে সদা কী করতে যাবে?
শালাবাবু বললে–রাণাঘাট-ফানাঘাট, রেলবাজার, নবাবপুর, সব তো দেখে এলুম, এবার কালীগঞ্জের দিকটাই বা বাকি থাকে কেন?
বলে আর দাঁড়াল না। হন্ হন্ করে সামনের দিকে চলতে লাগলো।
কেদারের হঠাৎ কথাটা মনে পড়ে গেল। এতক্ষণ খেয়াল ছিল না। আসল কথাটা জিজ্ঞেস করতে ভুল হয়ে গেল। বললে–ওই যাঃ, আসল কথাটাই তো জিজ্ঞেস করতে ভুল হয়ে গেল–
নিতাই জিজ্ঞেস করলে–কী কথা?
–খাওয়ার কথা?
বলে দৌড়তে লাগলো। শালাবাবু তখন অনেক দূর চলে গেছে। কেদার দৌড়তে দৌড়তে গিয়ে ডাকলে–ও শালাবাবু, শালাবাবু–
শালাবাবু পেছন ফিরে তাকালো। ভাবলে হয়ত সদাকে পাওয়া গেছে, সদার সন্ধান দিতে আসছে কেদার। বললে–কী রে, সদাকে পেইছিস?
কেদার কাছে গিয়ে হাঁপাচ্ছিল। হঠাৎ কথা বেরোল না মুখ দিয়ে। তারপর বললে– না, সদার কথা নয়, নেমন্তন্নর কথা বলছি। আমাদের নেমন্তন্নটার তাহলে কী হবে? সেটাও মারা যাবে নাকি?
কেদারের কথা শুনে শালাবাবুর পিত্তি জ্বলে গেল। বললে–দূর হ, ভোর রাত থেকে সদাকে খুঁজে খুঁজে আমার পায়ের রং-খিল গেল আর উনি এসেছেন নেমন্তন্নর খবর নিতে–দূর হ, দূর হ–
বলে রাগে গর গর করতে করতে শালাবাবু আরো জোর পায়ে এগোতে লাগলো। সভার সবাই খুব ম্রিয়মান হয়ে গেল কথা শুনে। বরকে না পাওয়া যাক, কিন্তু খাওয়াটা বন্ধ হবার কথা ভেবে সবাই যেন কেমন নিঝুম হয়ে গেল। এ ক’দিন অনেক ছিলিম তামা পুড়েছে, অনেক সময় তর্কাতর্কি করেছে। রেলবাজারের গৌরের দোকানের রসগোল্লা ভালো না রাণাঘাটের হরিহরের দোকানের রসগোল্লা ভালো তাই নিয়ে তর্ক করে কতদিন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে, কতদিন সেই তর্ক করতে করতে শেষকালে সেটা মারামারিতে পরিণত হয়েছে, তবু তর্কের মীমাংসা হয় নি। সকলেই ওই বিয়ের তারিখটার দিকে চোখ রেখে এতদিন জীবন-যাপন করে এসেছে, হঠাৎ সেই পরম লক্ষ্য ভ্রষ্ট হওয়াতে সবাই বিমর্য হয়ে রইল।
কিন্তু বিকেল পড়বার আগেই সবাই আবার চাঙ্গা হয়ে উঠলো। কেদারই খবর পেয়েছিল প্রথমে। সে দৌড়তে দৌড়তে এসে খবর দিলে গোপাল ষাটকে। গোপাল ষাট তখন গোয়াল ঘরে গরুকে জানা দিচ্ছে। কেদারের গলা শুনেই চেঁচিয়ে উঠলো–কী রে, কী খবর রে?
কেদার রাস্তা থেকেই চেঁচিয়ে উঠলো–ওরে, সদাকে পাওয়া গেছে–আর ভয় নেই—
গোপাল ষাট বললে–পাওয়া গেছে? তাহলে খাওয়া?
-–খাওয়া হবে।
বলে আর দাঁড়ালো না। অন্য দিকে চলে গেল। বললে–যাই নিতাইকে খবরটা দিয়ে আসি, সে খুব মনমরা হয়ে গেছে–
কথাটা শুনে পর্যন্ত গোপাল ষাটের বুক থেকে যেন একখানা ভারি পাথর নেমে গেল। গরুর জানা দেওয়া ফেলে রেখে তাড়াতাড়ি কোঁচার খুঁটটা গায়ে দিয়ে রাস্তায় বেরোল। এতক্ষণে সবাই-ই নিশ্চয় জেনে গেছে। সোজা বারোয়ারি তলার দিকে পা বাড়ালো। কিন্তু সেখানে তখন আগেই সভা বসে গেছে। নিতাই, কেদার সবাই হাজির। সবার মুখেই উত্তেজনা। নেমন্তন্ন খাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে সবাই-ই যেন বেশ ধাতস্থ। সবাই-ই জেনে গেছে সদাকে পাওয়া গেছে। কালীগঞ্জ থেকেই শালাবাবু নাকি তার ভাগ্নেকে ধরে এনেছে।
