সদানন্দ বললে–ভাবুক গে, আমার কী? আমি যাব না, আমি এখানে থাকবো–
প্রকাশমামা বললে–ইয়ারকি করার আর জায়গা পাসনি–
বলে সদানন্দর হাত ধরে টান দিলে একটা। টেনে বাইরের রাস্তার দিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করতে লাগলো।
সদানন্দ হাত ছাড়িয়ে নিলে। বললে–তুমি কি আমাকে ছেলেমানুষ পেয়েছ প্রকাশমামা? অমি যাবো না তোমার সঙ্গে কী করবে তুমি?
কালীগঞ্জের বউ বললে–আমি কাল থেকে ওই কথা ওকে বোঝাচ্ছি বাবা যে বিয়ের ব্যাপারে এমন করতে নেই। এখন সব যোগাড় যন্তর হয়ে গেছে। এখন লোক-হাসাহাসির ব্যাপার করা উচিত নয়। তা….
প্রকাশমামা ধমক দিয়ে উঠলো। বললে–তুমি থামো, আমি তোমার সব মতলব ফাঁস করে দেব, দাঁড়াও, আগে বিয়েটা হয়ে যাক্, তখন যা করতে হয় আমি করবো–সে আমার মনেই আছে–
কালীগঞ্জের বউ বললে–তা আমি কী করলুম বাবা? আমার কী দোষ হলো?
–বলছি তুমি থামো, তবু আবার কথা বলছো? ভেবেছিলে আমার ভাগ্নেকে নিজের বাড়িতে ফুসলে এনে বিয়েটা ভেঙে দেবে? এত শয়তানি বুদ্ধি তোমার?
সদানন্দ কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বলে উঠলো-খবরদার বলছি প্রকাশমামা, কালীগঞ্জের বউকে তুমি অমন করে যা-তা বলতে পারবে না। তা হলে কিন্তু আমিও সব ফাঁস করে দেব।
প্রকাশমামা বললে–তার মানে?
–তার মানে তুমি জানো না? তুমি জানো না এই কালীগঞ্জের বউ-এর কত সম্পত্তি দাদু গ্রাস করেছে? জানো, এই কালীগঞ্জের বউ এককালে কত সম্পত্তির মালিক ছিল? কে তার সম্পত্তি ঠকিয়ে নিয়েছে, কে-তাকে পথের ভিখিরি করেছে, আমি সে-সব কথা জানি না বলতে চাও?
প্রকাশমামা কথাগুলো শুনে প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেল। তারপর একটু দম নিয়ে বললে–এই সব কথা তোকে বুড়ি বলেছে বুঝি? এই সব ফুসমন্তর বুঝি ঢুকিয়ে দিয়েছে তোর মাথায়?
–আমাকে ফুসমন্তর দিতে হবে না প্রকাশমামা। বোঝবার মত যথেষ্ট বয়েসও হয়েছে আমার। বরং তুমি একটু বোঝ। যার পয়সায় তুমি এতদিন বাবুয়ানি করছে, জেনো সেটা তোমার ভগ্নিপতির পয়সা নয়, সে-সব এই কালীগঞ্জের বউ-এর–
প্রকাশমামা বললে–দ্যাখ, এসব কথার জবাব দেবার সময় নেই এখন, ওদিকে কুটুমবাড়ির লোক বসে আছে, তারপরে বিকেল বেলার ট্রেন ধরে আবার কেষ্টনগরে বিয়ে করতে যেতে হবে। পরে আমরা তোর এসব কথার জবাব দেব–
সদানন্দ বললে–না, জবাব দিলে এখনি জবাব দিতে হবে। আগে এর জবাব চাই তবে আমি তোমার সঙ্গে যাবো–
–তা কীসের জবাব চাস্ তুই বল? কবেকার পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটবার এই কি সময়? এ সব কাসুন্দি তো পরে ঘাঁটলেও চলতো।
–না চলতো না। আগে আমি এর জবাব চাই। আগে তুমি বলো, আগে তুমি কথা দাও, দাদু এই কালীগঞ্জের বউ-এর পাওনা দশ হাজার টাকা মিটিয়ে দেবে?
–দশ হাজার টাকা?
–হ্যাঁ, দাদু পনেরো বছর আগে কথা দিয়েছিল দশ হাজার টাকা দিয়ে সাহায্য করবে এই কালীগঞ্জের বউকে। এখনও কেবল ঘোরাচ্ছে। এখন দাদু এই কালীগঞ্জের বউ-এর সঙ্গে একবার দেখাও করে না। আগে তুমি কথা দাও সেই টাকা মিটিয়ে দেবে?
প্রকাশমামা বললে–তোর দাদু টাকা মেটাবে কি না তার কথা আমি দেব কি করে? আমি নিজে কি টাকা নিয়েছি যে কথা দেব?
সদানন্দ বললে–তা হলে আমিও বিয়ে করতে যাবো না–
প্রকাশমামা বললে–ঠিক আছে, তা হলে তুই বাড়ি চল, বাড়ি গিয়ে তোর দাদুকে সব বল্ গিয়ে। দাদু যদি তখন টাকা দিতে রাজী না হয় তখন না-হয় বিয়ে করতে যাস্ নি। আমাকে বাপু তুই এই দায় থেকে বাঁচা–
কালীগঞ্জের বউ এতক্ষণে কথা বললে। সদানন্দর দিকে চেয়ে বললে–সেই ভালো কথা বাবা। তোমার মামা তো ঠিক কথাই বলেছে। আর আমার টাকা? আমার তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে, এখন আমার টাকা দিলেও যা, না-দিলেও তাই। ও টাকার পিত্যেশ আর আমি করি না। কিন্তু তুমি বাবা আর দেরি করো না, যাও, তোমার গায়ে-হলুদের দেরি হয়ে যাবে–
সদানন্দ এতক্ষণে রাজী হলো। বললে—চলো—
তারপরে কালীগঞ্জের বউ-এর পায়ের কাছে মাথা নিচু করে প্রণাম করে বললে–তোমার টাকা আমি নিজের হাতে দিয়ে যাবো কালীগঞ্জের বউ, তুমি কিছু ভেবো না। টাকা না দিলে আমি বিয়ে করতেই যাবো না–
মনে আছে সদানন্দর মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করতে গিয়ে কালীগঞ্জের বউ-এর দু’চোখ জলে ভরে উঠেছিল। সদানন্দর চোখের সামনেই আঁচল দিয়ে চোখ-মুখ ঢেকে ফেলেছিল।
.
কেষ্টনগরে বিয়েবাড়ির একান্তে একটা ঘরের ভেতরে প্রকাশমামা সেই কথাটাই জিজ্ঞেস করলে। বললে–কীরে, তুই কালীগঞ্জের বউয়ের ব্যাপারটা বাসরঘরে সকলকে বলে দিস নি তো? নিরঞ্জন বলছিল–
সদানন্দ গম্ভীর মুখে বললে–না, বলি নি।
প্রকাশমামা সাবধান করে দিলে। বললে–না, বলিস, নি।
সদানন্দ বললে–কিন্তু কালীগঞ্জের বউ-এর সেই দশ হাজার টাকা? সেটা কিন্তু এখনও দাদু দিলে না, তুমি কথা দিয়েছিলে কিন্তু–
প্রকাশমামা বললে–তুই মিছিমিছি ও-সব নিয়ে ভাবছিস কেন? তোর দাদুর কাছে দশ হাজার তো হাতের ময়লা রে, দেবে যখন কথা দিয়েছে তখন নিশ্চয়ই দেবে। দশ হাজার টাকা মেরে দিয়ে কি তোর দাদু বড়লোক হবে? নিশ্চয়ই দেবে, আমি তো সাক্ষী আছি–
সদানন্দ বললে–কিন্তু কালীগঞ্জের বউ-এর টাকা যদি দাদু না দেয়, তখন কিন্তু সর্বনাশ হবে, এই আমি বলে রাখছি–
ওদিক থেকে কন্যাকর্তার গলা শোনা গেল–কই, বেয়াই মশাই কোথায়? সিগারেট পেয়েছেন তো?
