তারপর রাণাঘাট থেকে ডাক্তার এল, কবিরাজ মশাই এল। ওষুধের বন্যা বয়ে গেল। ডাক্তার কবিরাজ দুজনেই বলে গেল একেবারে পরিপূর্ণ বিশ্রাম নিতে হবে।
তারপর থেকে নিয়ম হলো কালীগঞ্জের বউ যদি এর পর আসে তো আর তাকে কর্তাবাবুর কাছে যেতে দেওয়া হবে না। কালীগঞ্জের বউ-এর জন্যেই এই বিপর্যয় ঘটলো।
কিন্তু সেই থেকেই সদানন্দের কৌতূহল হলো–ওই কালীগঞ্জের বউ কেন দাদুর কাছে আসে? কীসের টাকা চায়? কার টাকা? দাদু কালীগঞ্জের বউকে টাকা দেয়ই না বা কেন?
এমন প্রশ্নের কেউই ঠিকমত জবাব দিত না।
দীনু বলতো–কালীগঞ্জের বউ খুব দুষ্টু-
সদানন্দ জিজ্ঞেস করতো–কেন, কেন দুষ্টুমি করে কালীগঞ্জের বউ?
দীনু বলতো–যারা দুষ্টু লোক তারা তো কেবল দুষ্টুমিই করে, আর তো কিছু করে না।
–কিন্তু দাদু তার টাকা দেয় না কেন? টাকা না পেলে কালীগঞ্জের বউ চাল কিনবে কী করে? কাপড় কিনবে কী করে?
যত দিন যেতে লাগলো এই সব প্রশ্নই তার মাথায় ঢুকতে লাগলো। তারপর বয়েস হবার সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই সে জানতে পারলো। জানতে পারলো দাদু শুধু কালীগঞ্জের বউকেই ঠকায় নি, কপিল পায়রাপোড়াকেও ঠকিয়েছে, মানিক ঘোষকেও ঠকিয়েছে, ফটিক প্রামাণিককেও ঠকিয়েছে। জানতে পারলো রাণাঘাটের সদরে তাদের উকিল-বাড়ি আছে, সেখানে তাদের উকিলটা কেবল মামলা করে। মামলা করে করে নবাবগঞ্জের লোকদের জমি-জমা নিলেমে ডেকে নেয়, বাকি খাজনার দায়ে প্রজাদের জমি খাস করে নেয়। বংশী ঢালীকে দিয়ে লাঠিবাজি করায়। তারপর চণ্ডীমণ্ডপের পাশের ঘরে অনেককে তালাচাবি বন্ধ করে উপোস করিয়ে মারে। সে-সব কেউ টের পায় না। সদানন্দ অনেক দিন সেই দিকে যেতে চেয়েছে। কিন্তু জায়গাটা ঝোপ-ঝাড়-ঘেরা বলে সন্ধ্যেবেলা যেতে ভয় করতো তার খুব। আর যখন বংশী ঢালীকে ওদিক থেকে আসতে দেখতো তখন সদানন্দরও যেন কেমন গা ছমছম করে উঠতো।
সে বংশী ঢালীকে জিজ্ঞেস করতো–হ্যাঁ গো বংশী, এ-ঘরে থাকতে তোমার ভয় করে না?
বংশী ঢালী হাসতো সনানন্দর কথা শুনে।
বলতো–ভয় করবে কেন খোকাবাবু, ওখানে তো আমি রাত্তিরে ঘুমোই–ওই তো আমার ঘর–।
সদানন্দ আবদার ধরতো–আমি তোমার ঘরে যাবো বংশী–
–আমার ঘরে কী করতে যাবে? আমি গরীব লোক, আমার ঘরে থাকতে তোমার কষ্ট হবে–
বলে ও প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেত। তারপর বলতো—চলো খোকাবাবু, তোমাকে আমি মাছ ধরা দেখতে নিয়ে যাই
বলে বিলের ধারে খ্যাপ্লা জাল দিয়ে মাছ ধরা দেখাতে নিয়ে যেত।
এতদিন পরে কালীগঞ্জের বউ-এর সঙ্গে সদানন্দর সেই সব কথা বলতে বলতেই অনেক রাত হয়ে গেল। কালীগঞ্জের বউ নিজের হাতে রান্না করে খাইয়ে দিলে সদানন্দকে। বললে–এবার বাবা তুমি নবাবগঞ্জে ফিরে যাও–তোমার দাদু এতক্ষণে তোমাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিয়েছে–
–না, আমি আর যাবো না।
কালীগঞ্জের বউ বললে–কিন্তু তুমি যদি না যাও বাবা তো শেষকালে আমার নামেই দোষ পড়বে। সবাই বলবে আমিই তোমাকে আটকে রেখেছি–আর তা ছাড়া কাল তোমার বিয়ে। সকাল-বেলাই গায়ে-হলুদ হবে, তোমার শ্বশুরবাড়ি থেকে অধিবাসের তত্ত্ব আসবে–
সদানন্দ বলল–সে আসুক, কিছুতেই যাবো না, আমি এখানেই শুয়ে রইলুম।
বলে কালীগঞ্জের বউ-এর বিছানাতেই গা এলিয়ে দিলে। একগুঁয়ে পাগল ছেলেকে নিয়ে মহা মুশকিলে পড়লো কালীগঞ্জের বউ। দুলালকে ডেকে তোশক বালিশ পেড়ে আবার তার জন্যে নতুন করে বিছানা করে দিতে হলো।
সে রাতটা একরকম করে কাটলো। কালীগঞ্জের বউ ভাবলে ভোরবেলাই না-হয় দুলালকে দিয়ে নবাবগঞ্জে খবর পাঠিয়ে দেবে যে খোকা এখানে এই কালীগঞ্জে এসে উঠেছে।
দুলালও সেই রকম তৈরি হয়ে ছিল।
কিন্তু সকাল বেলা থেকেই দুলালের নানা কাজ থাকে। সে কাজের মানুষ। ভোররাত্রে উঠে তাকে গরুকে শানি দিতে হয়। তারপর তিন ক্রোশ পথ হেঁটে গিয়ে বাঁশের ক’টা খুঁটি তৈরি করে আনবার কথা ছিল। তখন রাত অনেক। দুলাল ভেবেছিল সকাল হবার আগেই বাঁশ কেটে আবার ফিরে আসতে পারবে। কিন্তু বাঁশঝাড়ের মালিক বাড়ি ছিল না। তিনিও বুঝি কোন জরুরী কাজে রাত থাকতে বেরিয়ে গিয়েছেন। তাঁর জন্যে বসে বসে যখন শেষ পর্যন্ত মালিক এল তখন রোদ উঠে গেছে।
সেই বাঁশ বাছাই করে কেটে যখন দুলাল আবার বাড়িতে ফিরে এল তখন দেখলে বাড়িতে হইচই পড়ে গেছে।
দুলালকে দেখেই গিন্নীমা বলে উঠলো–হ্যাঁ রে দুলাল, তোকে আমি পইপই করে বলেছিলুম নবাবগঞ্জে গিয়ে নায়েব বাড়িতে খবরটা দিয়ে আসবি যে খোকাবাবু এখানে এসেছে। আর তুই কিনা বাঁশ আনতে গিয়েছিলি? আজই তোর বাঁশ আনবার জন্যে এত জরুরী দরকার পড়ে গেল? এখন আমি লোককে কী বলে কৈফিয়ত দেব? নবাবগঞ্জ থেকে যে লোক এসে হাজির হয়েছে সে আমাকেই দুষছে….
সত্যিই, দুলাল দেখলে এক ভদ্রলোক বসে আছে বাড়ির উঠোনে একটা চৌকিতে–
কালীগঞ্জের বউ বললে–এই দেখ বাবা, এই দুলালকে আমি ভোরবেলা নবাবগঞ্জে গিয়ে কর্তাবাবুকে খবর দিতে বলেছিলুম যে খোকাবাবু এখানে আছে তা আমার তো ওই এক দুলাল ভরসা, আর তো কোনও লোক নেই যে তাকে পাঠাবো–
ততক্ষণ সদানন্দ উঠে এসে দাঁড়ালো।
প্রকাশমামা রেগে আগুন।
–কী রে, তুই এখেনে এসে লুকিয়ে আছিস! আজ তোর বিয়ে! অধিবাস নিয়ে কেষ্টনগর থেকে লোক এসে হাজির হয়েছে, গায়ে-হলুদের সব রেডি আর তুই কিনা এই রকম পাগলামি করছিস! চল-চল –আর কথা বলবার সময় নেই আমার। চুড়ান্ত বেইজ্জতি হয়ে গেছে। কুটুমবাড়ির লোক সেখানে গিয়ে কী বলবে বল্ দিকিন, তারা কী ভাববে?
